চিত্রনায়ক সালমান শাহর মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পর তার মৃত্যুর রহস্য উদঘাটনে কবর থেকে দেহাবশেষ উত্তোলনের অনুমতি দিয়েছে আদালত। দেহাবশেষ উত্তোলনের পর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত এবং ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা গত ২৪ মে এ আদেশ দেন। যদিও বিষয়টি বুধবার (১০ জুন) প্রকাশ্যে আসে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক শাহ আলম জানান, তদন্তের স্বার্থে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে দেহাবশেষ উত্তোলন, সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত এবং ময়নাতদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা অপরাধ তদন্ত বিভাগের পরিদর্শক জিয়াউল মোর্শেদ গত ২০ মে আদালতে আবেদন করে বলেন, ঘটনার ২৯ বছর পর আদালতের নির্দেশে রমনা থানায় হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে। মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে সালমান শাহর মরদেহ পুনরায় কবর থেকে উত্তোলন করে সুরতহাল প্রতিবেদন ও ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা এবং প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
তবে এ বিষয়ে জানতে তদন্ত কর্মকর্তা জিয়াউল মোর্শেদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের নতুন অধ্যায়: গত বছরের ২০ অক্টোবর সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে তার ভাই মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম হত্যা মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী সামীরা হকসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়। মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ২৩ জুন দিন নির্ধারণ করা হয়েছে।
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার ইস্কাটনের একটি ফ্ল্যাটে মারা যান তৎকালীন জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহ। তার মৃত্যুর পর প্রথমে একটি অপমৃত্যুর মামলা করা হয়। পরে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী অভিযোগ করেন, তার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে এবং মামলাটিকে হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন করেন।
এরপর আদালতের নির্দেশে বিষয়টি তদন্ত করে অপরাধ তদন্ত বিভাগ। ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সংস্থাটি মত দেয় যে সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছিলেন।
সে প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে সালমান শাহর বাবা রিভিশন আবেদন করেন। পরবর্তীতে ২০০৩ সালের ১৯ মে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠানো হয়। দীর্ঘ ১১ বছর পর ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট জমা দেওয়া বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনেও হত্যার অভিযোগের সমর্থনে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
একাধিক তদন্তেও মেলেনি হত্যার প্রমাণ: সালমান শাহর বাবার মৃত্যুর পর মামলার কার্যক্রম চালিয়ে যান তার মা নীলা চৌধুরী। ২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে আপত্তি জানান এবং ১১ জনের নাম উল্লেখ করে হত্যার অভিযোগ তোলেন।
পরবর্তীতে মামলাটি তদন্ত করে র্যাব। তবে রাষ্ট্রপক্ষের আপত্তির মুখে ২০১৬ সালের ২১ আগস্ট আদালত র্যাবকে তদন্ত কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। পরে তদন্তভার যায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের কাছে।
চার বছর তদন্ত শেষে ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি সংস্থাটি চূড়ান্ত প্রতিবেদনে জানায়, ৫৪ জন সাক্ষীর জবানবন্দি এবং জব্দ করা আলামত বিশ্লেষণ করে হত্যার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক নানা মানসিক চাপে সালমান শাহ আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন।
তবে ওই প্রতিবেদনেও সন্তুষ্ট হননি নীলা চৌধুরী। তিনি আরো তদন্তের আবেদন জানান। পরে ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর আদালত পিবিআইয়ের প্রতিবেদন গ্রহণ করে আসামিদের অব্যাহতি দেন।
এরপর সালমান শাহর পরিবারের পক্ষ থেকে মহানগর দায়রা জজ আদালতে রিভিশন আবেদন করা হয়। ২০২২ সালের ১২ জুন আদালত আবেদনটি গ্রহণ করলেও দীর্ঘদিন শুনানি হয়নি।
অবশেষে গত বছরের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করেন। আদালত সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরীর অভিযোগ এবং রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদের জবানবন্দি সংযুক্ত করে হত্যা মামলা দায়েরের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, এজাহারভুক্ত ও অজ্ঞাতনামা পলাতক আসামিরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে পরস্পরের যোগসাজশে ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সালমান শাহকে হত্যা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সানা/আপ্র/১১/৬/২০২৬