গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

সত্যজিতের সিনেমায় ‘না’, মঞ্চ আর সংসারই ছিল ফেরদৌসীর অগ্রাধিকার

বিনোদন প্রতিবেদক

বিনোদন প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১১:২১ পিএম, ২৭ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ১৫:৪৩ এএম ২০২৬
সত্যজিতের সিনেমায় ‘না’, মঞ্চ আর সংসারই ছিল ফেরদৌসীর অগ্রাধিকার
ছবি

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে ফেরদৌসী মজুমদার ছবি সংগৃহীত

জীবনের প্রতিটি শিল্পীই কোনো না কোনো সময় এমন এক মোড়ে এসে দাঁড়ান, যেখানে সাফল্য আর দায়িত্বের মধ্যে বেছে নিতে হয় একটিকে। কেউ খ্যাতির হাত ধরে এগিয়ে যান, কেউ আবার নীরবে আগলে রাখেন নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ আর সবচেয়ে প্রিয় মঞ্চকে। বাংলাদেশের অভিনয়জগতের কিংবদন্তি ফেরদৌসী মজুমদারের জীবনও তেমনই এক বিরল সিদ্ধান্তের গল্প।

বিশ্ববরেণ্য নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের সিনেমায় অভিনয়ের আহ্বান—যে সুযোগের জন্য অসংখ্য শিল্পী আজীবন অপেক্ষা করেন, সেই সুযোগই একদিন ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। শুধু তাই নয়, বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে থাকা *সূর্য দীঘল বাড়ি* চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘জয়তুন’-এ অভিনয়ের সুযোগও হাতছাড়া করেছিলেন স্বেচ্ছায়। কারণ, তাঁর কাছে তখন সবচেয়ে বড় ছিল সংসার, ছোট্ট সন্তান আর মঞ্চনাটকের প্রতি অটুট দায়বদ্ধতা।

গত শনিবার (২৫ জুলাই) বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে নাট্যদল ‘অনুস্বর’-এর সপ্তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত ‘অনুস্বর সংলাপ’-এর চতুর্থ পর্বে জীবনের সেই না-বলা গল্পগুলোই অকপটে তুলে ধরেন দেশের বরেণ্য এই অভিনেত্রী। প্রায় দুই ঘণ্টার আলাপচারিতায় উঠে আসে তাঁর অভিনয়জীবনের আলো-ছায়া, না-পাওয়ার বেদনা, প্রাপ্তির আনন্দ এবং শিল্পের প্রতি আজীবনের অঙ্গীকার।

স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ফেরদৌসী মজুমদার বলেন, “সত্যজিৎ রায় আমাকে সিনেমায় অভিনয়ের জন্য ডেকেছিলেন। কিন্তু তখন আমার ছোট সন্তান ত্রপা, সংসার আর থিয়েটারের দায়িত্ব ছিল সবচেয়ে বড়। তাই সেই প্রস্তাব গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি।”

একই সময়ে *সূর্য দীঘল বাড়ি* চলচ্চিত্রের ‘জয়তুন’ চরিত্রের জন্যও তাঁকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নিজের পরিবর্তে তিনি অভিনেত্রী ডলি আনোয়ারের নাম সুপারিশ করেন। সময়ের পরিক্রমায় চলচ্চিত্রটি বাংলা সিনেমার এক অনন্য মাইলফলকে পরিণত হলেও, সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে আজও তাঁর কণ্ঠে অনুশোচনার চেয়ে দায়িত্ববোধের সুরই বেশি স্পষ্ট।

“এখন হয়তো ভাবলে কিছুটা আক্ষেপ হয়। কিন্তু তখনকার বাস্তবতায় সংসার আর সন্তানের কথা ভেবে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, সেটাই আমার কাছে সঠিক ছিল,”—বললেন তিনি।

এই স্বীকারোক্তি যেন শুধু একজন অভিনেত্রীর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; এটি এক নারীর জীবনের সেই নীরব অধ্যায়, যেখানে আলোঝলমলে সাফল্যের চেয়ে দায়িত্ব, ভালোবাসা আর আত্মত্যাগই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় অর্জন।

আলাপচারিতায় বর্তমান নাট্যচর্চার কথাও উঠে আসে। ফেরদৌসী মজুমদারের মতে, নাটক মানুষের মনে শুধু বেদনা নয়, আশার আলোও জ্বালাবে। শিল্পের কাজ মানুষকে ভেঙে দেওয়া নয়, বরং নতুন করে ভাবতে শেখানো।

তিনি বলেন, “নাটকে আশা থাকতে হয়, শুধু হতাশা থাকলে চলে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শক্তিশালী পাণ্ডুলিপি। কিন্তু বর্তমানে ভালো নাট্যকারের সংকট স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।”

নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের উদ্দেশে তাঁর বার্তাও ছিল গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। খ্যাতি বা তারকাখ্যাতির মোহে নয়, শিল্পের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা থেকেই মঞ্চে আসতে হবে।

“তারকা হওয়ার জন্য নয়, ভালোবাসা থেকেই থিয়েটার করতে হয়। মঞ্চে দর্শকের চোখের সামনে অভিনয় করার যে অনুভূতি, সরাসরি প্রতিক্রিয়া পাওয়ার যে আনন্দ—তার কোনো বিকল্প নেই,” বলেন তিনি।

অনুষ্ঠানে নিজের অভিনীত কালজয়ী নাটক *কোকিলারা*, *মেরাজ ফকিরের মা* এবং *পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়* থেকে প্রিয় সংলাপ আবৃত্তি করে শোনান এই বরেণ্য অভিনেত্রী। জানান, *কোকিলারা* তাঁর সবচেয়ে প্রিয় নাটক। কারণ এই নাটকের জন্য তাঁকে সবচেয়ে বেশি শ্রম দিতে হয়েছিল।

একই সঙ্গে সৈয়দ শামসুল হক, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং আবদুল্লাহ আল-মামুনের মতো শক্তিমান লেখকদের নাটকে অভিনয়ের সুযোগ পাওয়াকে নিজের শিল্পীজীবনের অন্যতম বড় সৌভাগ্য বলে উল্লেখ করেন তিনি।

আলাপচারিতায় উঠে আসে প্রয়াত অভিনেতা হুমায়ূন ফরীদির স্মৃতিও। *সংসপ্তক* নাটকের শুটিংয়ের অভিজ্ঞতা স্মরণ করে ফেরদৌসী বলেন, ফরীদির প্রতিভার পাশাপাশি তাঁর সৌজন্যবোধ ছিল অসাধারণ। জ্যেষ্ঠ শিল্পীদের প্রতি তাঁর সম্মান ও আন্তরিকতা আজও মনে গভীর রেখাপাত করে। পাশাপাশি সুবর্ণা মুস্তফার সঙ্গে *বরফগলা নদী* নাটকের শুটিংয়ের স্মৃতিও ভাগ করে নেন তিনি।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ‘অনুস্বর’-এর প্রধান সম্পাদক মোহাম্মদ বারী। শুরুতে ফেরদৌসী মজুমদারের জীবন ও কর্ম তুলে ধরেন ফরিদা লিমা। পরে প্রশান্ত হালদার ফুল দিয়ে তাঁকে শুভেচ্ছা জানান। অনুষ্ঠানের সূচনা করেন সাইফ সুমন।

একজন শিল্পীর জীবনে পুরস্কার, খ্যাতি কিংবা আলোচিত চরিত্রের সংখ্যা দিয়ে সব সাফল্য মাপা যায় না। কখনও কখনও একটি ‘না’ই হয়ে ওঠে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়। ফেরদৌসী মজুমদারের জীবন সেই বিরল উদাহরণগুলোর একটি—যেখানে সত্যজিৎ রায়ের সিনেমায় অভিনয় না করেও তিনি হারিয়ে যাননি; বরং মঞ্চ, শিল্প আর মানবিক মূল্যবোধের প্রতি অবিচল ভালোবাসায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন বাংলা নাট্যাঙ্গনের এক অনন্য উচ্চতায়। তাঁর গল্প তাই শুধু একজন অভিনেত্রীর নয়, দায়িত্ব, ভালোবাসা ও শিল্পসাধনার এক অনন্য জীবনগাথা।
সানা/আপ্র/২৭/৭/২০২৬

 

সংশ্লিষ্ট খবর

‘মঞ্চে উঠলেই মৃত্যুকে দেখতাম’, ভয় নিয়ে মুখ খুললেন এ আর রহমান
২৬ অক্টোবর ২০২৬

‘মঞ্চে উঠলেই মৃত্যুকে দেখতাম’, ভয় নিয়ে মুখ খুললেন এ আর রহমান

স্টুডিওতে সুরের জাদু ছড়ালেও একসময় মঞ্চে উঠে দর্শকের সামনে গান পরিবেশন করতে ভীষণ ভয় পেতেন অস্কারজয়ী স...

টাইগার নয়, আমির খানকে গুলি করতে চেয়েছিল হামলাকারীরা
২৬ অক্টোবর ২০২৬

টাইগার নয়, আমির খানকে গুলি করতে চেয়েছিল হামলাকারীরা

টাইগার শ্রফের ওপর গুলির ঘটনার তদন্তে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। তদন্তকারীদের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রত...

ক্ষুব্ধ সোহেল রানা
২৬ অক্টোবর ২০২৬

ক্ষুব্ধ সোহেল রানা

একাত্তরের রণাঙ্গনের এক বীর মুক্তিযোদ্ধাকে কবর দিতে বাধা দেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নায়ক, পরিচা...

অবশেষে বিএনপির মনোনয়ন পেলেন না মেঘনা আলম
২৬ অক্টোবর ২০২৬

অবশেষে বিএনপির মনোনয়ন পেলেন না মেঘনা আলম

অবশেষে বিএনপির মনোনয়ন পেলেন না মেঘনা আলমজাতীয় সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসনের শূন্যপদে উপ-নির্বাচনে প্রা...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পুলিশকে শক্তিশালী না করলে দিনে-রাতে স্বাচ্ছন্দ্যে চলা যাবে না

পুলিশকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোঃ আলী হোসেন ফকির, পিপিএম বলেছেন, “আপনারা সাংবাদিক ভাইয়েরা পুলিশকে ব্যবহার করেন। পুলিশকে শক্তিশালী না করলে আমরা সমাজে দিনে-রাতে কেউই স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারব না।” রোববার (২৫ অক্টোবর) সকালে বাগেরহাট পুলিশ লাইনে জেলা পুলিশের আয়োজনে কমিউনিটি পুলিশিং সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন আইজিপি সঠিক বলেছেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 22 ঘন্টা আগে