ইরান সংকটের কূটনৈতিক সমাধানে যুক্তরাষ্ট্র এখনো আলোচনায় বসতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তবে একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেছেন, ইরান আলোচনার বিষয়ে আন্তরিক নয়। এমন অবস্থায় একদিকে কূটনৈতিক তৎপরতার কথা বলা হলেও অন্যদিকে পশ্চিম এশিয়াজুড়ে সামরিক উত্তেজনা ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরো বাড়ছে।
বুধবার (২২ জুলাই) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সবসময় কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষপাতী। তবে ইরানের অবস্থান নিয়ে তাদের মধ্যে সন্দেহ রয়েছে।
রুবিও বলেন, “আমাদের বর্তমান সমস্যা হলো, তারা আলোচনায় আন্তরিক নয়। তারা যদি আন্তরিক হয়, আমরাও আন্তরিক। আর যদি তারা তা না হয়, তাহলে নিজেদের ও মিত্রদের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপই নেব।”
তিনি আরো বলেন, ইরানকে কোনোভাবেই হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিতে দেওয়া যাবে না। কারণ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ কোনো দেশের একক নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে তা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত তৈরি করবে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য, কোনো দেশ যদি আন্তর্জাতিক জলপথ নিয়ন্ত্রণ করে, জাহাজ চলাচলে বাধা দেয় বা এর জন্য অর্থ দাবি করে, তাহলে তা বিশ্বের অন্য অঞ্চলেও একই ধরনের সংকট তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করবে।
রুবিওর বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি জ্বালানি পরিবহন পথ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে ইয়েমেনের ইরানপন্থী হুতি বিদ্রোহীদের হুমকির মুখে সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেলবাহী তিনটি জাহাজ লোহিত সাগর থেকে এশিয়ার পথে যাত্রা বাতিল করে ফিরে গেছে।
লোহিত সাগরের প্রবেশমুখ নিয়ন্ত্রণকারী হুতিরা সোমবার সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধের ঘোষণা দেয়। এর ফলে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া ইরান সংঘাতে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে।
সংঘাতের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে ব্যাপক প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে ইরান দীর্ঘদিন ধরে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে হুমকি দিয়ে আসছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ হিসেবে পরিচিত এই প্রণালিতে কোনো ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হলে বৈশ্বিক তেল বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে তেহরানের কাছে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া অন্তর্বর্তী সমঝোতা টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইস্কান্দার মোমেনি মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান সফর করে ইসলামাবাদকে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার আগ্রহের কথা জানালেও মাঠপর্যায়ে সংঘাত থামার কোনো স্পষ্ট লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। মঙ্গলবার টানা একাদশ রাতের মতো ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী।
বুধবার ভোরে ইরানের রাজধানী তেহরানে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। পরে দেশটির আধা সরকারি ফার্স বার্তা সংস্থা জানায়, রাজধানীতে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে।
এ ছাড়া ইরানের একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অবস্থিত বুশেহর প্রদেশের তিনটি স্থানে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে বলে রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনাকে জানিয়েছেন এক কর্মকর্তা।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আলোচনার বার্তা এবং একই সময়ে সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকা-দুই ধরনের অবস্থানই ইরান সংকটকে আরো অনিশ্চিত করে তুলছে। এখন আন্তর্জাতিক মহলের নজর কূটনৈতিক উদ্যোগ, যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পথগুলোর নিরাপত্তার দিকে।
সানা/ডিসি/আপ্র/২২/৭/২০২৬