এ কে এম ফজলুল হক, চট্টগ্রাম ব্যুরো: সমুদ্রপথে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পেশাগত জীবনের সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি। দেশের তরুণদের কাছে নৌবাণিজ্য ও সমুদ্রভিত্তিক পেশার নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেওয়া এই প্রতিষ্ঠানটি ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে মেরিটাইম জনশক্তি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী জুলদিয়ায় প্রায় ১০০ একর জায়গার ওপর ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় তৎকালীন মার্চেন্টাইল মেরিন একাডেমি। স্বাধীনতার পর প্রতিষ্ঠানটির নাম হয় বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি।
প্রতিষ্ঠানটির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি বছর ১৮০ জন প্রাক্-সমুদ্র ক্যাডেট ভর্তি করা হয়। এর মধ্যে নারী ক্যাডেটের জন্য রয়েছে ২০টি আসন। ১৯৬২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পাঁচ হাজার ছয়শর বেশি প্রাক্-সমুদ্র ক্যাডেট এখানে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন মেয়াদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা তৈরি হয়েছে।
মেরিন একাডেমিতে প্রশিক্ষণের মূল লক্ষ্য শুধু সমুদ্রযাত্রার জন্য তরুণদের প্রস্তুত করা নয়; আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন খাতে দক্ষ ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হিসেবে গড়ে তোলাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী নৌযান পরিচালনা, নিরাপত্তা, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা, কারিগরি দক্ষতা এবং নেতৃত্বের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রতিষ্ঠানটির প্রশিক্ষণ কার্যক্রম স্বীকৃতি পেয়েছে। ২০২০ সালে আন্তর্জাতিক মেরিটাইম প্রকৌশল ও বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান এবং নটিক্যাল ইনস্টিটিউটের যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি উৎকর্ষের সনদ লাভ করে। এ স্বীকৃতি মেরিটাইম শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মানের ক্ষেত্রে একাডেমিটির আন্তর্জাতিক অবস্থানকে আরো শক্তিশালী করে।
একাডেমির প্রশিক্ষণ কার্যক্রম আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন সংস্থার নির্ধারিত মডেল কোর্সের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এখানকার প্রশিক্ষণ শেষে ক্যাডেটরা দেশি-বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজে কর্মজীবনের সুযোগ পান। দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা উচ্চতর পদে দায়িত্ব পালনের সুযোগও পান।
বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রেও সমুদ্রগামী নাবিকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যিক জাহাজে কাজ করা বাংলাদেশি নাবিকরা দেশে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাচ্ছেন। ফলে মেরিটাইম খাতকে তরুণদের জন্য সম্ভাবনাময় পেশাক্ষেত্র হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা মনে করেন, দক্ষ নাবিক তৈরির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রশিক্ষণের মান আরো উন্নত করা প্রয়োজন। ভবিষ্যতের নৌপরিবহনে জাহাজ পরিচালনার পাশাপাশি জ্বালানি সাশ্রয়, পরিবেশ সুরক্ষা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং সমুদ্র নিরাপত্তার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাচ্ছে।
সমুদ্রকে ঘিরে বাংলাদেশের বাণিজ্য ও অর্থনীতির পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দক্ষ মেরিনারের চাহিদাও বাড়ছে। আর সেই চাহিদা পূরণে বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি দেশের তরুণদের জন্য তৈরি করছে সম্ভাবনাময় এক পেশাগত পথ—যেখানে প্রশিক্ষণ শেষে কর্মক্ষেত্র শুধু বাংলাদেশ নয়, ছড়িয়ে পড়ছে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথেও।
সানা/আপ্র/৬/৯/২০২৬