ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষকৃত্যানুষ্ঠানের দ্বিতীয় দিনে রাজধানী তেহরান কার্যত জনসমুদ্রে পরিণত হয়। রোববার (৫ জুলাই) ভোর থেকে ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মুসাল্লায় লাখো শোকাহত মানুষ জড়ো হন। সেখানে তিন ধাপে তিনটি জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম ধাপে খামেনির জানাজা, দ্বিতীয় ধাপে তাঁর পরিবারের সদস্যদের এবং তৃতীয় ধাপে নাতনির জানাজা সম্পন্ন হয়।
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানানো হয়, আয়াতুল্লাহ জাফর সোবহানি জানাজায় ইমামতি করেন। কফিনে ইরানের পতাকা মোড়ানো ছিল এবং উপস্থিত জনতার মধ্যে শোক, কান্না ও আহাজারির পরিবেশ সৃষ্টি হয়। মুসাল্লার চারপাশের সড়কগুলোও জনসমুদ্রে পরিণত হয়।
রাষ্ট্রীয় ছুটি ঘোষণার মধ্য দিয়ে ইরানজুড়ে শোক কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। সোমবার তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে শোকমিছিল অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
লাল পতাকা উড়িয়ে তাকে হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার শপথ: ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শেষকৃত্যানুষ্ঠানের দ্বিতীয় দিনে লাল পতাকা উড়িয়ে তাকে হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার শপথ নিয়েছে লাখো জনতা।
খমেনির হত্যাকাণ্ডকে কোনোভাবেই ‘জবাবহীন’ ছেড়ে দেওয়া হবে না বলেও ঘোষণা এসেছে তেহরানের এই জমায়েত থেকে। ইরানের তাসনিম নিউজ এসেন্সির খবরে বলা হয়, শনি ও রোববার লাখ লাখ শোকাতুর মানুষ তেহরানের গ্র্যান্ড মুসাল্লায় সমবেত হন। সেখানে গভীর শোক প্রকাশের পাশাপাশি খামেনি হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়।
এ সময় তাদের হাতে ছিল লাল পতাকা, যেখানে আরবি অক্ষরে লেখা ছিল ‘হে হোসেনের রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণকারীরা’। এই পতাকা কারবালায় ইমাম হোসেনের শাহাদাতের সঙ্গে জড়িত শিয়া ঐতিহ্যের একটি গভীর ও ঐতিহ্যগত প্রতীক।
তাসনিম নিউজের ভাষ্য, ঐতিহাসিকভাবে লাল ব্যানার বা পতাকা দিয়ে বোঝানো হয়, নির্দোষ মানুষের রক্ত অন্যায়ভাবে ঝরানো হয়েছে এবং এর বিচার এখনো বাকি আছে। সাধারণত মহররমের শোক অনুষ্ঠানের সময় শিয়া মুসলমানরা এ পতাকা দেখান।
এ পতাকা দিয়ে ন্যায়ের সন্ধান এবং ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার দৃঢ় সংকল্পও বোঝানো হয়।
গ্র্যান্ড মুসাল্লার জমায়েতে শোকাহত মানুষরা বারবার ‘প্রতিশোধ’, ‘প্রতিশোধ’ স্লোগান দেন। এ সময় তাদের হাতে লাল পতাকা ছাড়াও ইরানের জাতীয় পতাকা, খামেনির প্রতিকৃতি, দেশটির বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়েদ মোজতবা খামেনির ছবি এবং মুষ্টিবদ্ধ হাতের প্রতীক ছিল।
ইরান যুদ্ধের প্রথম দিন গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন–ইসরায়েলি হামলায় ৮৬ বছর বয়সী খামেনি নিহত হন। হামলায় খামেনির মেয়ে সাইয়্যেদা বুশরা হোসেইনি খামেনি, জামাতা মেসবাহ-উল-হুদা বাকেরি, পুত্রবধূ (বর্তমান সর্বোচ্চ নেতার স্ত্রী) জাহরা হাদ্দাদ আদেল, ১৪ মাস বয়সি নাতনি (বুশরাকন্যা) জাহরা মোহাম্মাদি গোলপায়েগানিও নিহত হয়।
জানাজায় পরিবারের সদস্য ও শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতি: তেহরানের বিশাল জানাজা অনুষ্ঠানে প্রয়াত নেতার তিন ছেলে-মোস্তফা, মাসুদ ও মেয়সাম-কফিনের সামনে উপস্থিত ছিলেন বলে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে। তাঁর ভাইয়েরাও জানাজায় অংশ নেন।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কলিবফসহ শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কুদস ফোর্সের কমান্ডার ইসমাইল কানি-ও সেখানে ছিলেন। তবে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে আলোচিত মোজতবা খামেনিকে জানাজায় দেখা যায়নি, যা নিয়ে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা তৈরি হয়েছে।
খামেনির আদর্শে ঐক্যের বার্তা পেজেশকিয়ানের: তেহরানে আয়োজিত ‘ইমাম খামেনি; প্রতিরোধের চিরন্তন নেতা’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, প্রয়াত নেতার আদর্শ মুসলিম বিশ্বে ঐক্য, স্বাধীনতা ও প্রতিরোধের বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছে।
তিনি বলেন, মুসলিম দেশগুলো ঐক্যবদ্ধ হলে গাজা, লেবানন ও ফিলিস্তিনের সংকট আরো ভয়াবহ হতো না। ঐক্যকে তিনি কেবল রাজনৈতিক স্লোগান নয়, কৌশলগত প্রয়োজন হিসেবে উল্লেখ করেন।
পেজেশকিয়ান ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি মুসলিম বিশ্বের পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেও সংলাপ ও বোঝাপড়া বাড়ানোর আহ্বান জানান।
তেহরান অচল নগরী: আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, তেহরানে খামেনির জানাজায় লাখো মানুষ অংশ নেন। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ জানায়, জানাজায় ইমামতি করেন প্রবীণ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ জাফর সোবহানি।
রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক শীর্ষ নেতৃত্ব, নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তারা এবং বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কুদস ফোর্সের কমান্ডারসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
শোকাহত জনতা কান্নায় ভেঙে পড়ে এবং অনেকে নীরবে প্রার্থনায় অংশ নেন। রাষ্ট্রীয় শোকের অংশ হিসেবে দেশজুড়ে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
৭০ দেশের প্রতিনিধি, কূটনৈতিক আলোচনায় ইরান: ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির বরাতে জানা যায়, খামেনির শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে বিশ্বের ৭০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধি অংশ নেন। তিনি এই উপস্থিতিকে ইরানের কূটনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেন।
এর পাশাপাশি ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর নতুন সার্ভিস ফি আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রদূত জানান, এটি নিরাপত্তা, নৌচলাচল নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশ রক্ষার অংশ হিসেবে নেওয়া সিদ্ধান্ত।
যুক্তরাষ্ট্র এই উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান করলেও ইরান নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে। একই সঙ্গে কিছু দেশের জন্য বিশেষ সুবিধার কথাও জানানো হয়েছে।
তিন ধাপে জানাজা ও ছয় দিনের শোকযাত্রা: তেহরানের ইমাম খোমেনি মুসাল্লায় আয়োজিত জানাজা তিন ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রথমে খামেনি, পরে তাঁর পরিবারের সদস্য এবং সর্বশেষ নাতনির জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
গত শনিবার (৪ জুলাই) থেকে শুরু হওয়া শেষকৃত্য কর্মসূচি ছয় দিন ধরে চলবে। সোমবার তেহরানে প্রধান শোকযাত্রা, মঙ্গলবার কোম শহরে এবং পরবর্তী দিনে ইরাকের নাজাফ ও কারবালায় আনুষ্ঠানিকতা হবে।
শেষ পর্যায়ে মরদেহ মাশহাদে নিয়ে গিয়ে ইমাম রেজার মাজারে দাফনের পরিকল্পনা রয়েছে। পুরো অনুষ্ঠান ঘিরে ইরানজুড়ে শোক, নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক তৎপরতা একসঙ্গে চলছে।
সানা/আপ্র/৫/৭/২০২৬