জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে প্রবাল প্রাচীর ধ্বংসের আশঙ্কা যখন ক্রমেই বাড়ছে, তখন নতুন এক গবেষণায় আশাব্যঞ্জক তথ্য উঠে এসেছে। গবেষকেরা জানিয়েছেন, আগের অনুমানের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি প্রবাল প্রাচীর বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ুর চাপ সহ্য করে টিকে থাকতে সক্ষম।
সাম্প্রতিক এই গবেষণায় প্রায় এক লাখ ছেষট্টি হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এমন প্রবাল প্রাচীরের অস্তিত্ব শনাক্ত করা হয়েছে; যা জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা করে টিকে থাকতে এবং পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম।
বিশ্বের প্রবাল প্রাচীর সমুদ্রের মোট জলজ জীবনের প্রায় এক-চতুর্থাংশের বেঁচে থাকার রসদ জোগায়। কিন্তু বর্তমানে সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, দূষণ এবং ঘন ঘন ক্রান্তীয় ঝড়ের কারণে সৃষ্ট বিবর্ণতা বা ব্লিচিংয়ের ফলে এই বাস্তুতন্ত্র চরম সংকটের মুখে রয়েছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, অনেক প্রবাল প্রাচীর স্থায়ীভাবে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
গবেষণায় ৪৫ হাজার প্রবাল প্রাচীরের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয় এবং কয়েক দশকের জলবায়ু ও সমুদ্রসংক্রান্ত উপাত্ত পর্যালোচনা করা হয়। এর ভিত্তিতে ৭১টি দেশ ও শতাধিক অঞ্চলে জলবায়ু সহনশীল প্রবাল প্রাচীরের অবস্থান চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে ক্যারিবীয়, প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগরের এমন কিছু অঞ্চল রয়েছে, যা এর আগে কখনো এই ধরনের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটির প্রবাল সংরক্ষণ শাখার পরিচালক ও গবেষণার অন্যতম লেখক এমিলি ডার্লিং বলেন, প্রবাল প্রাচীরকে অনেক সময় এমন একটি বাস্তুতন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা আর টিকে থাকতে পারবে না। কিন্তু নতুন গবেষণা সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছে এবং নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে।
বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এই দশকের শেষ নাগাদ স্থল ও সামুদ্রিক পরিবেশের অন্তত ত্রিশ শতাংশ সংরক্ষণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যা ‘ত্রিশে ত্রিশে’ লক্ষ্য হিসেবে পরিচিত। নতুন এই গবেষণা সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়ক হতে পারে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।
এমিলি ডার্লিং আরো বলেন, বর্তমানে মাত্র আটাশ শতাংশ প্রবাল প্রাচীর সংরক্ষিত এলাকার আওতায় রয়েছে। ফলে সীমিত সম্পদ কোথায় ব্যবহার করা হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিতে পারে। তার মতে, আসন্ন বড় ধরনের এল নিনো পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এই তথ্য আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটির গ্লোবাল মেরিন প্রোগ্রামের নির্বাহী পরিচালক স্টেসি জুপিটার বলেন, এই গবেষণা সরকারগুলোকে সীমিত অর্থ ও সম্পদ সঠিকভাবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে সহায়তা করবে। তার মতে, যেসব প্রবাল প্রাচীর ইতিমধ্যে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এবং বাস্তুতন্ত্র হিসেবে কার্যকারিতা হারিয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন হতে পারে।
গবেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে প্রবাল প্রাচীরের অস্তিত্ব নিয়ে যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, এই নতুন অনুসন্ধান সেই সংকটের মধ্যেও সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাকে নতুনভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।
সানা/কেএমএএ/আপ্র/১৭/৬/২০২৬