ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের দুই প্রধানমন্ত্রী কথা বললে দুই দেশের বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান সম্ভব। পারস্পরিক আলোচনা ও বোঝাপড়ার মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেছেন, দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে তিনি নেতিবাচক কিছু দেখছেন না; বরং সবকিছু ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে।
রোববার (৯ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর যমুনা ফিউচার পার্কে ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্রে শিশুদের জন্য একটি খেলাধুলার জায়গা উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে সবাই অত্যন্ত সম্মান করেন। তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য বহুবার শুনেছেন এবং তার অন্তর থেকে কথা বলার বিষয়টি লক্ষ্য করেছেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী-দুজনই সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত নেতা বলে মন্তব্য করেন তিনি।
হাইকমিশনার বলেন, দুই নেতা যখন কথা বলেন, তখন সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। আলোচনা হলেই সমস্যা সমাধানের পথ তৈরি হয়। দুই দেশের মানুষ একসঙ্গে আছে এবং শেষ পর্যন্ত সমাধান হবেই-এ বিষয়ে তিনি অত্যন্ত আশাবাদী। তার ভাষায়, ‘এখানে নেতিবাচক কিছু নেই, সবই ইতিবাচক।’
দুই দেশের সম্পর্কে দীর্ঘ টানাপড়েনের পর নতুন করে যোগাযোগ ও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগের মধ্যে হাইকমিশনারের এ বক্তব্য এলো। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে টানাপড়েন তৈরি হয়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই দেশই সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়ে নানা উদ্যোগের কথা জানিয়ে আসছে।
সরকার গঠনের পরপরই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরে ভারত যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। পরে আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় অষ্টাদশ ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানান তিনি। বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য না হলেও বিমসটেকের বর্তমান সভাপতি হিসেবে এই আমন্ত্রণ দেওয়া হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ওই সফরের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। গত ২৯ জুলাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জানিয়েছিলেন, প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া আমন্ত্রণ সরকার পর্যালোচনা করছে। একই দিন দীনেশ ত্রিবেদীও বলেছিলেন, বাংলাদেশের সরকারপ্রধানকে স্বাগত জানাতে নয়াদিল্লি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে এবং সফরের সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অগ্রাধিকারের ওপর নির্ভর করছে।
এর মধ্যে দিল্লিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য দেওয়াকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে অস্বস্তি তৈরি হয়। গত ৫ আগস্ট নয়া দিল্লিতে দক্ষিণ এশিয়ার বিদেশি সংবাদদাতাদের একটি সংগঠনের আয়োজনে অডিও কলে যুক্ত হয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন শেখ হাসিনা।
এর আগে বাংলাদেশ সরকার দিল্লির কাছে অনুরোধ জানিয়েছিল, আদালতের দৃষ্টিতে পলাতক আসামি শেখ হাসিনা যাতে ভারত থেকে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে না পারেন, সে বিষয়ে সহযোগিতা করতে। তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ওই অনুষ্ঠানে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না এবং সেখানে প্রকাশিত মতামতের প্রতিও সরকারের কোনো সমর্থন নেই। ভারতীয় সরকারের এ অবস্থানের পরও শেখ হাসিনাকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ায় বাংলাদেশ সরকার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায়।
রোববার ভিসা আবেদন কেন্দ্রে শিশুদের জন্য খেলাধুলার জায়গাটি উদ্বোধনের প্রসঙ্গেও কথা বলেন দীনেশ ত্রিবেদী। ভারতীয় হাইকমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ঢাকায় হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ২৫ জুন তিনি আইভ্যাকে গেলে এক মা শিশুদের জন্য একটি খেলাধুলার জায়গা তৈরির অনুরোধ করেছিলেন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সেই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
শিশুদের সঙ্গে নিয়ে খেলাধুলার জায়গাটি উদ্বোধনের পর দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, বাংলাদেশে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় দুই মাসের অভিজ্ঞতায় জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক দেখে তিনি আবেগাপ্লুত হয়েছেন। বাংলাদেশ ও ভারতের মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক অত্যন্ত ভালো উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই সম্পর্ককে সরকারি পর্যায় থেকেও আরো ভালো করার দায়িত্ব সবার।
দুই দেশের সাধারণ মানুষ একে অপরের কাছ থেকে মূলত সম্মান ও মর্যাদা প্রত্যাশা করে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ভারতের মানুষ যেমন সম্মান ও মর্যাদা চায়, বাংলাদেশের মানুষও তেমনটাই চায়। সাধারণ মানুষ খুব বেশি কিছু চায় না; তারা শুধু মানুষের মতো আচরণ ও মর্যাদা প্রত্যাশা করে।
বাংলাদেশে ভারতীয় ভিসার ব্যাপক চাহিদার কথাও তুলে ধরেন ভারতীয় হাইকমিশনার। তিনি বলেন, এই চাহিদা পূরণে ধীরে ধীরে ভিসা আবেদন কেন্দ্রের সংখ্যা ও সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে একসঙ্গে সক্ষমতা অনেক বাড়ানো হলে নতুন সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই পর্যায়ক্রমে ভিসা কেন্দ্র ও সেবার সক্ষমতা বাড়ানো হবে।
ভিসা আবেদনকারীদের ভোগান্তি কমানোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, শিশু, নারী এবং চিকিৎসার জন্য ভারতে যেতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধা বাড়ানোর বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
রোববার আইভ্যাকের আয়োজন শেষে বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন দীনেশ ত্রিবেদী। এর আগে গত ২৯ জুলাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে তিনি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। ওই বৈঠকের পরও তিনি বলেছিলেন, পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে দুই দেশের এমন কোনো সমস্যা নেই, যার সমাধান সম্ভব নয়।
সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতের নতুন হাইকমিশনারের প্রথম সৌজন্য সাক্ষাৎ হওয়ার কথা রয়েছে।
সানা/আপ্র/৯/৮/২০২৬