জুলাই আন্দোলনের সময় বিদেশি দূতাবাসের আশ্রয় ও তথাকথিত ‘সেফ হাউজ’ নিয়ে কলামিস্ট ও সমাজচিন্তক ফরহাদ মজহারের এক মন্তব্য নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একটি অনলাইন গণমাধ্যমের পডকাস্টে দেওয়া বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি বিদেশি দূতাবাস আন্দোলনকারীদের আশ্রয়ের জন্য সেফ হাউজ পরিচালনা করেছিল এবং সেখানে কিছু সমন্বয়কের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবি তোলার জন্য।
সম্প্রতি প্রচারিত ওই পডকাস্টে ফরহাদ মজহার বলেন, “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস কিছু সেফ হাউজ তৈরি করেছিল। সেখানে যারা ছিল, তারা আমাকে ফোন করে জানিয়েছিল তাদের ওপর চাপ দেওয়া হচ্ছে যেন তারা শেখ হাসিনার পদত্যাগের কথা বলে।”
সঞ্চালকের প্রশ্নের জবাবে তিনি আরো বলেন, “হ্যাঁ, যুক্তরাষ্ট্র শেখ হাসিনার পদত্যাগ চেয়েছিল।”
তার এই বক্তব্য সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে। কারণ জুলাই আন্দোলনের সময় তিনি আন্দোলনের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন এবং পরবর্তী সময় সরকার পরিবর্তনের পর বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানেও অংশ নেন। ফলে এখন তার এই মন্তব্যের পেছনে কী উদ্দেশ্য রয়েছে, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
ফরহাদ মজহারের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচয় দেওয়া এক মানবাধিকার সংগঠক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তিনি মূলত একটি ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার অবসান চেয়েছিলেন; তবে সরকারপ্রধান দেশ ছেড়ে চলে যাক- এমনটি তিনি হয়তো প্রত্যাশা করেননি। তার মতে, শেখ হাসিনাকে আইনের আওতায় আনার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং বাংলাদেশের কিছু বামপন্থি শক্তি জেনে বা না জেনে যুক্তরাষ্ট্রের ‘রেজিম পরিবর্তন’ পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল বলে ফরহাদ মজহার মনে করেন।
তবে এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন অনেকেই। গবেষক ও মানবাধিকার কর্মী রেজাউর রহমান লেনিন বলেন, জুলাই আন্দোলনের সময় নাহিদ ইসলামসহ কয়েকজন সমন্বয়ক জীবনের নিরাপত্তা চেয়েছিলেন, যা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও যৌক্তিক। তিনি জানান, তখন বিভিন্ন মানবাধিকারকর্মী বিদেশি দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও সেখান থেকে কার্যকর সাড়া পাওয়া যায়নি।
লেনিন বলেন, “মার্কিন দূতাবাস সমন্বয়কদের নিরাপত্তার জন্য কোনো সেফ হাউজে রেখেছিল- এমন তথ্য আমাদের কাছে নেই। তারা বিভিন্ন মানুষের বাড়িতে অবস্থান করেছেন। তবে জাতিসংঘের আবাসিক কার্যালয়ের পক্ষ থেকে কয়েকজন সমন্বয়ককে কিছু সহযোগিতা দেওয়া হয়েছিল।” তার মতে, ফরহাদ মজহারের বক্তব্যে তথ্যগত অসংগতি রয়েছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীবও এই দাবিকে বিভ্রান্তিকর বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “সমন্বয়কদের জন্য কারও পক্ষ থেকে আলাদাভাবে নিরাপত্তা চাওয়া হয়নি। যে যার ব্যক্তিগত উদ্যোগে নিরাপদ থাকার চেষ্টা করেছেন। ফরহাদ মজহার যা বলছেন, তা সঠিক নয়।”
রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম এনপিএর কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের সদস্য বাকী বিল্লাহ বলেন, ফরহাদ মজহার প্রায়ই ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ধরনের বক্তব্য দেন। তার মতে, সমন্বয়কদের সরকার পতনের বিষয়ে মার্কিন দূতাবাসের পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল- এমন দাবির নির্ভরযোগ্য ভিত্তি নেই। তিনি মনে করেন, বিদেশি কূটনৈতিক মহলের সঙ্গে কিছু যোগাযোগ বা আলোচনাকে হয়তো ফরহাদ মজহার ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।
বিতর্কের বিষয়ে জানতে চাইলে ফরহাদ মজহার বলেন, তিনি সবসময় একই অবস্থানে ছিলেন এবং ফ্যাসিবাদের বিরোধিতা করেছেন। তবে তিনি দাবি করেন, বিদেশি সেফ হাউজে কিছু আন্দোলনকারী আশ্রয় নিয়েছিলেন- এ তথ্য সত্য। যদিও সরকার পতনের দাবি শিখিয়ে দেওয়া হয়েছে- এমন অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।
তার ভাষায়, “আমরা কেউ আর ফ্যাসিবাদের উত্থান চাই না। কিছু গণমাধ্যম অহেতুক আমার পেছনে লেগে থাকে, কিন্তু আমি আমার অবস্থানে সঠিক আছি।”
ফরহাদ মজহারের এই বক্তব্য নতুন করে জুলাই আন্দোলনের আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট, বিদেশি কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং আন্দোলনের রাজনৈতিক চরিত্র নিয়ে আলোচনাকে সামনে নিয়ে এসেছে। তবে তার উত্থাপিত অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।
সানা/আপ্র/৯/৮/২০২৬