ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিহত বা আহত হয়েছেন-এমন গুঞ্জন ঘিরে দুই দেশের গণমাধ্যমে শুরু হয়েছে পাল্টাপাল্টি দাবি। ইরানের একটি সংবাদ সংস্থা এ ধরনের জল্পনার কথা উল্লেখ করে প্রতিবেদন প্রকাশ করলেও ইসরায়েলের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম তা ভিত্তিহীন গুজব বলে দাবি করেছে।
ইরানের সংবাদ সংস্থা তাসনিম এক প্রতিবেদনে জানায়, ইরানের হামলায় নেতানিয়াহু নিহত বা আহত হয়েছেন-এমন জল্পনা হিব্রু ভাষার বিভিন্ন সূত্রে ছড়িয়ে পড়ছে এবং তা ক্রমেই বাড়ছে। তবে ইসরায়েলের জেরুজালেম পোস্ট এই দাবি নাকচ করে বলেছে, ইরানি গণমাধ্যম যুদ্ধকালীন গুজব ছড়িয়ে দিচ্ছে।
পত্রিকাটি লিখেছে, তাসনিমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে চলমান ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের মধ্যে অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন গুজবের অংশ হিসেবে নেতানিয়াহুর নিহত বা আহত হওয়ার দাবি উঠেছে।
গুজবের পেছনে যে যুক্তি: ইরানি সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েকটি বিষয় এই জল্পনাকে উসকে দিচ্ছে।
প্রথমত, নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত যোগাযোগমাধ্যমে সর্বশেষ ভিডিও প্রকাশের পর প্রায় তিন দিন পেরিয়ে গেছে এবং তার সর্বশেষ ছবি প্রকাশিত হয়েছে প্রায় চার দিন আগে। এরপর তার নামে যেসব বক্তব্য প্রকাশ হয়েছে, সেগুলো লিখিত আকারে এসেছে।
দ্বিতীয়ত, এর আগে প্রায় প্রতিদিনই অন্তত একটি করে, কখনও কখনও তিনটি পর্যন্ত ভিডিও প্রকাশ করা হতো। কিন্তু কয়েক দিন ধরে কোনো ভিডিও প্রকাশ না হওয়ায় সন্দেহ আরো জোরালো হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
তৃতীয়ত, কয়েকটি হিব্রু সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, ৮ মার্চ নেতানিয়াহুর বাসভবনের নিরাপত্তা আরো জোরদার করা হয়েছে। বিশেষ করে সম্ভাব্য আত্মঘাতী ড্রোন হামলার আশঙ্কায় এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়ানো হয়েছে।
চতুর্থত, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জারেড কুশনার এবং ট্রাম্পের বিশেষ প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফের নির্ধারিত ইসরায়েল সফর বাতিল হওয়ার ঘটনাকেও এই পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে।
পঞ্চমত, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ ও নেতানিয়াহুর কথিত এক টেলিফোন আলাপের বিষয়ে প্রকাশিত খবরে ফরাসি প্রেসিডেন্টের কার্যালয় নির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ করেনি; কেবল একটি লিখিত বিবৃতি প্রকাশ করেছে।
তবে তাসনিম নিজেও স্বীকার করেছে যে এসব জল্পনার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
ইসরায়েলের পাল্টা ব্যাখ্যা: ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম জেরুজালেম পোস্ট বলছে, তাসনিমের প্রতিবেদনে নেতানিয়াহুর ওপর কোনো হামলার প্রমাণ বা তার ক্ষতির বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য দেওয়া হয়নি। বরং কয়েকটি পরোক্ষ তথ্য একত্র করে সন্দেহ তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে।
পত্রিকাটি জানায়, ৭ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে নেতানিয়াহুর বক্তব্য প্রকাশ করা হয়েছে। এছাড়া সরকার পরিচালিত ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, তিনি ৬ মার্চ বিয়ারশেভা এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার একটি স্থান পরিদর্শন করেছেন। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তার জনসম্মুখের কর্মকাণ্ড সম্পর্কেও স্বাধীনভাবে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁর সঙ্গে তার কথোপকথনের বিষয়ও রয়েছে বলে জানায় পত্রিকাটি।
সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল ভিডিও: এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে দাবি করা হয়েছে যে ইরান নেতানিয়াহুর বাসভবনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এতে তার ভাই আইডো নেতানিয়াহু নিহত হয়েছেন এবং জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গাভির গুরুতর আহত হয়েছেন।
এই দাবি সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা স্কট রিটারের একটি মন্তব্যের বরাতে ছড়ানো হয়েছে বলে বলা হচ্ছে।
রাশিয়ার একটি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া তার কথিত সাক্ষাৎকারের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইটে গিয়ে ওই সাক্ষাৎকারের ভিডিও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো ভিডিওতে যে চিহ্ন ব্যবহার করা হয়েছে, তা মূল সম্প্রচারের সঙ্গে মিলছে না বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
আগেও ছড়িয়েছিল গুজব: নেতানিয়াহুর ভাইয়ের মৃত্যুর গুঞ্জনকেও ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিভ্রান্তি তৈরি করতে এ ধরনের তথ্য প্রায়ই ছড়িয়ে পড়ে। এর আগেও মার্চের শুরুতে ইরানের কিছু সংবাদমাধ্যম নেতানিয়াহুর মৃত্যুর দাবি তুলেছিল। পরে আন্তর্জাতিক কয়েকটি সংবাদ সংস্থা তা গুজব বলে উল্লেখ করে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর কার্যালয় এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি। তবে তার নিহত বা আহত হওয়ার দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সানা/আপ্র/১০/৩/২০২৬