পৃথিবীর ইতিহাসে কালের পরীক্ষায় সবচেয়ে সফলভাবে টিকে থাকা স্থাপনাগুলোর অন্যতম গিজার গ্রেট পিরামিড। প্রায় ৪ হাজার ৬০০ বছর আগে নির্মিত এই বিস্ময়কর স্থাপত্য শুধু প্রাচীন প্রকৌশল দক্ষতারই নিদর্শন নয়, সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এর গাঠনিক নকশা ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগও কার্যকরভাবে সহ্য করতে সক্ষম।
ফারাও খুফুর সমাধি হিসেবে নির্মিত পিরামিডটির স্থায়িত্বের রহস্য অনুসন্ধান করতে গবেষকেরা ভূমিকম্প পরিমাপক যন্ত্র ব্যবহার করে এর ভেতরে ও আশপাশের ৩৭টি স্থানে পারিপার্শ্বিক কম্পন রেকর্ড করেন। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিশাল আকার ও জটিল অভ্যন্তরীণ কাঠামো থাকা সত্ত্বেও পিরামিডটি বিভিন্ন ধরনের কম্পনের বিরুদ্ধে অত্যন্ত স্থিতিশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া দেখায়।
মিশরের রাজধানী কায়রোর উপকণ্ঠে অবস্থিত এ পিরামিডের প্রতিটি বাহুর দৈর্ঘ্য প্রায় ৭৫৫ ফুট এবং এটি প্রায় ১৩ একর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। বিশাল চুনাপাথরের ব্লক দিয়ে নির্মিত পিরামিডটির উচ্চতা নির্মাণকালে ছিল প্রায় ৪৮০ ফুট। প্রাকৃতিক ক্ষয় ও বাইরের আবরণ অপসারণের কারণে বর্তমানে এর উচ্চতা প্রায় ৪৫৫ ফুটে নেমে এসেছে। তবুও প্রায় ৩ হাজার ৮০০ বছর ধরে এটি ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু স্থাপনা।
গবেষকদের মতে, কয়েকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য পিরামিডটিকে ভূমিকম্প সহনশীল করে তুলেছে। এর ভিত্তি অত্যন্ত প্রশস্ত এবং ভরকেন্দ্র নিচের দিকে অবস্থিত। চারপাশের জ্যামিতিক গঠন নিখুঁতভাবে সুষম। নিচ থেকে ওপরের দিকে ওজন ক্রমান্বয়ে কমেছে, ফলে কাঠামোর ওপর চাপ সমানভাবে বণ্টিত হয়েছে। এছাড়া অভ্যন্তরীণ কক্ষগুলোর জটিল নকশা কম্পনের শক্তি শোষণ ও ছড়িয়ে দিতে সহায়তা করে।
গবেষণায় আরো দেখা গেছে, পিরামিডটি কোনো নরম মাটির ওপর নয়, বরং শক্ত ও প্রাকৃতিক চুনাপাথরের ভিত্তির ওপর নির্মিত। ফলে ভূমিকম্পের অভিঘাত সরাসরি কাঠামোর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে না।
বিজ্ঞানভিত্তিক সাময়িকী ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’-এ প্রকাশিত গবেষণার প্রধান লেখক ও মিশরের জাতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান ও ভূ-পদার্থবিদ্যা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সিসমোলজিস্ট মোহামেদ আল-গাবরি বলেন, বিভিন্ন প্রকৌশল উপাদানের সমন্বয়ে পিরামিডটি একটি সুষম ও সুসংহত কাঠামোয় পরিণত হয়েছে।
একই প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ সিসমোলজিস্ট আসেম সালামা বলেন, প্রাচীন মিশরীয় নির্মাতাদের স্থাপত্যের স্থিতিশীলতা, ভিত্তি নির্মাণ, ওজন বণ্টন এবং চাপ নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে অসাধারণ বাস্তব জ্ঞান ছিল। যদিও তাঁরা সচেতনভাবে ভূমিকম্প প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে এ স্থাপনা নির্মাণ করেছিলেন কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায় না; তবে তাদের উদ্ভাবিত প্রকৌশল কৌশল স্বাভাবিকভাবেই স্থাপনাটিকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে।
গবেষকেরা পিরামিডের বিভিন্ন সুড়ঙ্গ, আশপাশের শিলা, মাটি এবং প্রধান সমাধিকক্ষ থেকে তথ্য সংগ্রহ করেন। বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাধারণত উচ্চতায় উঠলে কম্পনের মাত্রা বাড়ে। তবে ‘কিংস চেম্বার’-এর ওপর অবস্থিত পাঁচটি বিশেষ কক্ষে কম্পনের তীব্রতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। গবেষকদের ধারণা, এসব কক্ষ ভূমিকম্পের শক্তি শোষণ করে চারদিকে ছড়িয়ে দেয়, ফলে পিরামিডের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো অতিরিক্ত ঝাঁকুনি থেকে সুরক্ষিত থাকে।
এ অঞ্চলে ১৮৪৭ ও ১৯৯২ সালে বড় ধরনের ভূমিকম্পে হাজার হাজার স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ১৯৯২ সালের ভূমিকম্পে পাঁচ শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটে। কিন্তু এত বড় দুর্যোগের পরও গিজার গ্রেট পিরামিড অক্ষত থাকে।
গবেষকদের মতে, গিজার গ্রেট পিরামিড শুধু প্রকৌশল কৃতিত্বের প্রতীক নয়; এটি মানব সভ্যতার পরিকল্পনা, বিজ্ঞান, শৃঙ্খলা ও দূরদর্শিতার এক অনন্য উদাহরণ। প্রায় দুই দশকের শ্রম, হাজারো দক্ষ কর্মী, প্রকৌশলী ও প্রশাসকের সমন্বয়ে নির্মিত এ স্থাপনা আজও প্রমাণ করে, জ্ঞান, লক্ষ্য ও অধ্যবসায় একত্রিত হলে মানবসভ্যতা কত অসাধারণ সৃষ্টি করতে পারে।
সানা/ডিসি/আপ্র/২/৬/২০২৬