ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ২০টি সামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্যাটেলাইট চিত্র ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে এ তথ্য জানিয়েছে বিবিসি ভেরিফাই। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের পাল্টা হামলার ব্যাপ্তি ও কার্যকারিতা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র এ পর্যন্ত যে চিত্র তুলে ধরেছে, বাস্তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তার চেয়ে অনেক বেশি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালায়। যুক্তরাষ্ট্র এ অভিযানের নাম দেয় ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’। এর জবাবে ইরান ইসরায়েলের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের আটটি দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ব্যাপক পাল্টা হামলা শুরু করে।
বিবিসি ভেরিফাইয়ের অনুসন্ধান অনুযায়ী, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ইরাক, জর্ডান, বাহরাইন ও ওমানে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও সামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালানো হয়। এতে অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, রাডার, জ্বালানি সরবরাহকারী উড়োজাহাজ এবং যোগাযোগ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।
পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, অপারেশন এপিক ফিউরি শুরু হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানে ১৩ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনি দাবি করেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর জন্য আর কোনো নিরাপদ স্থান অবশিষ্ট নেই।
বিবিসি ভেরিফাই অন্তত ২০টি মার্কিন সামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তবে কিছু বিশ্লেষকের ধারণা, প্রকৃত সংখ্যা ২৮টির কাছাকাছি হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল রুওয়াইস ও আল সাদার এবং জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে মোতায়েন থাকা তিনটি অত্যাধুনিক ‘টার্মিনাল হাই অলটিটিউড এরিয়া ডিফেন্স’ বা থাড ব্যাটারি। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এ ধরনের মাত্র আটটি ব্যাটারি রয়েছে। প্রতিটি ব্যাটারি নির্মাণে প্রায় ১০০ কোটি ডলার ব্যয় হয় এবং পরিচালনার জন্য প্রয়োজন হয় শতাধিক সেনাসদস্য।
আয়ারল্যান্ডের প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাবেক প্রধান ভাইস অ্যাডমিরাল মার্ক মেলেট বলেন, এসব ব্যাটারি একটি অত্যন্ত জটিল আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের কেন্দ্রবিন্দু, যা দ্রুত প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়।
স্যাটেলাইট চিত্রে সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে থাকা মার্কিন নজরদারি ও জ্বালানি সরবরাহকারী বিমানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ধরা পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সেখানে একটি ‘ই-৩ সেন্ট্রি’ নজরদারি বিমানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার পরিবর্তে নতুন বিমান আনতে প্রায় ৭০ কোটি ডলার ব্যয় হতে পারে।
এ ছাড়া কুয়েতের আলী আল সালেম বিমানঘাঁটি ও ক্যাম্প আরিফজানেও উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া গেছে। স্যাটেলাইট চিত্রে জ্বালানি বাংকার, বিমান হ্যাঙ্গার, সেনা আবাসন এবং যোগাযোগ অবকাঠামোর ক্ষতির প্রমাণ মিলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংঘাতের শুরুতে ইরান বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করলেও পরে কৌশল পরিবর্তন করে উচ্চমূল্যের নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আরো নিখুঁত হামলা চালিয়েছে। স্টিমসন সেন্টারের বিশ্লেষক কেলি গ্রিকো বলেন, প্রথম দিকে ইরানের লক্ষ্য ছিল প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে চাপে ফেলা, কিন্তু পরবর্তী সময়ে তারা পরিকল্পিতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সম্পদ ধ্বংসে মনোযোগ দেয়।
পেন্টাগনের এক হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত সংঘাতের ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ৯০০ কোটি ডলার। এর বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক সরঞ্জাম মেরামত ও প্রতিস্থাপনে ব্যয় হবে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ৪২টি বিমান ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে পেন্টাগন। এর মধ্যে রয়েছে এফ-১৫, এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান, এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন এবং এ-১০ আক্রমণকারী বিমান।
বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা, বর্তমান নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেলে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন ঘাঁটিগুলো আরো বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। কারণ চলমান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, যা দ্রুত পূরণ করার সহজ কোনো উপায় নেই। সূত্র: বিবিসি
সানা/ডিসি/আপ্র/২/৬/২০২৬