মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুত বিস্তৃত যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর তেল আবিব কার্যালয়, হাইফার সামরিক ও নিরাপত্তা স্থাপনা এবং পূর্ব জেরুজালেমে হামলার দাবি করেছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী Islamic Revolutionary Guard Corps (আইআরজিসি)। একই সময়ে উপসাগরীয় দেশগুলোতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত; কুয়েতে ভুলবশত আকাশ প্রতিরক্ষা গুলিতে তিনটি মার্কিন এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল ভূপাতিত হয়েছে বলে জানিয়েছে United States Central Command (সেন্টকম)। ইরানের হামলায় আরো এক মার্কিন সেনার মৃত্যু হয়েছে-নিহত বেড়ে চার।
তেল আবিবে বিস্ফোরণ, ‘খাইবার’ ক্ষেপণাস্ত্রের দাবি: আইআরজিসির বিবৃতিতে বলা হয়, “জায়নবাদী শাসকগোষ্ঠীর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও বিমানবাহিনীর সদরদপ্তর” লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে এবং এতে ‘খাইবার’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী জানায়, ইরান থেকে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে। জেরুজালেমের আকাশে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। নেতানিয়াহুর নিরাপত্তা বা হতাহতের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ মেলেনি।
কুয়েতে ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’; ২৩ বছর পর রণক্ষেত্রে মার্কিন বিমান ক্ষতি: সেন্টকম জানায়, সক্রিয় যুদ্ধাবস্থায় কুয়েতের আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিট ভুল শনাক্তের কারণে তিনটি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল ভূপাতিত করে। ছয় আরোহী নিরাপদে বেরিয়ে চিকিৎসাধীন। ঘটনাটি ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র অংশ হিসেবে টহল মিশনের সময় ঘটে। ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পর এই প্রথম শত্রুভাবাপন্ন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান হারানোর ঘটনা বলে সামরিক বিশ্লেষকদের অভিমত।
নিহত মার্কিন সেনা ৪, বাড়ছে ক্ষয়ক্ষতি: ইরানের প্রাথমিক হামলায় গুরুতর আহত এক মার্কিন সেনা চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন-এ নিয়ে নিহত মার্কিন সেনার সংখ্যা চার। পরিবারের কাছে তথ্য পৌঁছানোর পর পরিচয় প্রকাশ করা হবে বলে জানায় সেন্টকম।
উপসাগরজুড়ে আগুন; কুয়েত, কাতার, আমিরাত, সৌদিতে বিস্ফোরণ: দোহা, দুবাই, মানামা ও কুয়েতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ধাক্কায় বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতির খবর মিলেছে। কাতারে অন্তত ১৬ জন, ওমানে ৫, কুয়েতে ৩২ ও বাহরাইনে ৪ জন আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। কুয়েতে মার্কিন দূতাবাস এলাকা থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। সৌদি আরবের রাস তানুরায় ঝধঁফর অৎধসপড়-র তেল শোধনাগারে ড্রোন হামলার পর সাময়িকভাবে কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়। বিশ্বের অন্যতম বড় এই স্থাপনার দৈনিক সক্ষমতা প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল।
সাইপ্রাসে ব্রিটিশ ঘাঁটিতে ড্রোন: ভূমধ্যসাগরীয় দেশ Cyprus-এর আক্রোতিরিতে যুক্তরাজ্যের বিমানঘাঁটির রানওয়েতে বিস্ফোরকবাহী ড্রোন আছড়ে পড়ে। হতাহতের খবর নেই; নিরাপত্তা জোরদার ও অপ্রয়োজনীয় স্টাফ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
আলোচনায় ‘না’ তেহরানের; ট্রাম্পের দাবি ঘিরে বিতর্ক: ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের শীর্ষ কর্মকর্তা Ali Larijani বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা নয়-ইরান আত্মরক্ষা করছে। কূটনৈতিক উদ্যোগ আগে দু’বার বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলেও দাবি তেহরানের। এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেছেন, সাম্প্রতিক হামলায় ইরানের সম্ভাব্য শীর্ষ উত্তরসূরি-প্রার্থীদের অধিকাংশই নিহত। এ বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
ইউরোপের নিন্দা, উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান: ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান Ursula von der Leyen মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সার্বভৌম ভূখণ্ডে হামলার নিন্দা জানিয়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে তৎপরতার আহ্বান জানিয়েছেন।
স্কুলে হামলায় শিশুমৃত্যু: ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলায় অন্তত ১৫৩ জন নিহত, যাদের বেশিরভাগই শিশু-এমন দাবি করেছে ইরানি গণমাধ্যম। দেশজুড়ে অভিযানে নিহতের সংখ্যা ৫৫৫ ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানের রেড ক্রিসেন্ট।
রণক্ষেত্রের নতুন সমীকরণ: বিশ্লেষকদের মতে, ছায়াযুদ্ধের যুগ পেরিয়ে অঞ্চলটি এখন সরাসরি রাষ্ট্র-রাষ্ট্র সংঘাতে প্রবেশ করেছে। উপসাগরীয় দেশগুলো দোদুল্যমান-যুদ্ধে জড়ালে ‘পক্ষ’ হিসেবে চিত্রিত হওয়ার ঝুঁকি, আর নীরব থাকলে অবকাঠামো ও ভাবমূর্তির ক্ষতি। বিদ্যুৎ গ্রিড, পানি লবণমুক্তকরণ কেন্দ্র ও জ্বালানি স্থাপনা সুরক্ষা এখন তাদের প্রধান দুশ্চিন্তা।
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্রের ছায়া ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে কূটনৈতিক জানালা দ্রুত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে-এমন আশঙ্কাই বাড়ছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে।
সানা/আপ্র/২/৩/২০২৬