পরাশক্তিগুলো নিজেদের ক্ষমতার সীমা স্বীকার করতে না চাওয়ায় বিশ্ব আরো বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। তার মতে, পরাশক্তিগুলোর বিভাজনের কারণে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ কার্যত অচল হয়ে পড়লেও পুরো জাতিসংঘ ব্যবস্থা এখনো ভেঙে পড়েনি। মানবিক সহায়তা, শান্তিরক্ষা, বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্থাটি এখনো কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
দিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন গুতেরেস। চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিব হিসেবে তার মেয়াদ শেষ হচ্ছে।
গুতেরেস বলেন, পরাশক্তিগুলোর বিভাজনের সুযোগ নিয়ে মাঝারি শক্তির দেশগুলোর মধ্যেও দায়মুক্তির ধারণা তৈরি হচ্ছে। তারা আন্তর্জাতিক নিয়মের তোয়াক্কা না করে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে। অন্যদিকে পরাশক্তিগুলোর বিভাজনের কারণে নিরাপত্তা পরিষদ কার্যকরভাবে সিদ্ধান্ত নিতে না পারায় বিশ্বে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার কার্যকর ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়েছে।
“এমন পরাশক্তি রয়েছে, যারা এখনো স্বীকার করে না যে তাদের ক্ষমতারও সীমা আছে এবং তারা এমন সব দুঃসাহসিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে, যার ফল ভয়াবহ।”
জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার ৮০ বছর পর সংস্থাটি তার মূল লক্ষ্য পূরণে সক্ষমতা হারিয়েছে কি না - এমন প্রশ্নের জবাবে গুতেরেস বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাতিসংঘের অন্যতম বড় সাফল্য হলো তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঠেকিয়ে রাখা। বিশ্বজুড়ে অনেক সংঘাত থাকলেও দুটি পরাশক্তি সরাসরি যুদ্ধে জড়ায়নি, যা জাতিসংঘের ভূমিকার কারণেই অনেকাংশে সম্ভব হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
তবে বর্তমান বিশ্বে নতুন ও আরো শক্তিশালী ভূরাজনৈতিক বিভাজন তৈরি হয়েছে বলেও স্বীকার করেন জাতিসংঘ মহাসচিব।
হরমুজ ও বাব আল-মানদাবসহ গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে নৌ চলাচলের স্বাধীনতার ওপরও জোর দিয়েছেন গুতেরেস। তার ভাষ্য, কৃষ্ণসাগর, হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মানদাবে নৌ চলাচলের অধিকার ও স্বাধীনতা অবশ্যই সম্মান করতে হবে। কাউকে চলাচলের অনুমতি দেওয়া এবং অন্য কাউকে না দেওয়া কিংবা জোর করে টোল আরোপ করা গ্রহণযোগ্য নয়।
জাতিসংঘ খাদ্য ও সার পরিবহনকে অবরোধের বাইরে রাখার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছে জানিয়ে তিনি বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধের সময় কৃষ্ণসাগর দিয়ে শস্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। হরমুজ প্রণালিতে সার পরিবহনের বিষয়ে ইরানকে একই ধরনের প্রস্তাব দেওয়া হলেও তেহরান তাতে সায় দেয়নি বলে জানান তিনি।
কৃষ্ণসাগর দিয়ে ইউক্রেইন ও রাশিয়া - উভয় দেশের খাদ্য, সার ও জ্বালানি রপ্তানির সম্ভাবনা নিয়েও জাতিসংঘ কাজ করতে আগ্রহী বলে জানান গুতেরেস। তবে এর জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
পরাশক্তিকে ক্ষমতার সীমা বুঝতে হবে: ব্রিকস সম্মেলনে ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের নেতাদের উপস্থিতির মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সদিচ্ছা তৈরির চেষ্টা করবেন কি না জানতে চাইলে গুতেরেস বলেন, তিনি সবার সঙ্গেই কথা বলেছেন। তবে তার মতে, মূল সমস্যা পরাশক্তিগুলোর বিভাজন।
“পরাশক্তিগুলো বিভক্ত থাকলে কোনো সম্মান থাকে না। সবাই মনে করে, তারা যা খুশি করতে পারে।”
সুদানের সংঘাতের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, দেশটির সংঘাতে বহু দেশ জড়িয়ে পড়েছে। সংঘাতটি মূলত সুদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারত। কিন্তু দায়মুক্তির ধারণার কারণে বাইরের অনেক দেশও এতে জড়িয়ে পড়েছে।
ইউক্রেইন যুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে গুতেরেস বলেন, রাশিয়া সাড়ে চার বছর আগে ইউক্রেনে হামলা চালানোর পরও সংঘাত চলছে। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের ক্ষেত্রেও ওয়াশিংটন নানা সমস্যার মুখে পড়ছে।
“আমার মনে হয়, পরাশক্তিগুলোর নিজেদের ক্ষমতার সীমা বোঝার সময় এসেছে। এটি বিশ্বকে আরো শান্তিপূর্ণ হতে সহায়তা করবে।”
ইউক্রেইনে ভারতের ভূমিকার প্রশংসা: ইউক্রেইন ও রাশিয়ার যুদ্ধ বন্ধে শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা এবং মধ্যস্থতায় ভারত প্রস্তুত থাকার বিষয়ে গুতেরেস বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে ইউক্রেইন যুদ্ধ ও উপসাগরীয় পরিস্থিতি - দুই ক্ষেত্রেই শান্তির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
তাৎক্ষণিকভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব না হলেও নৌ চলাচলের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি - এ বিষয়ে তারা একমত হয়েছেন বলে জানান তিনি।
ভারতের মধ্যস্থতার উদ্যোগের প্রশংসা করে গুতেরেস বলেন, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে নয়াদিল্লির নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। পারস্পরিক আস্থা ফিরিয়ে আনার পরিবেশ তৈরিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, বড় সমস্যা হলো আস্থার ঘাটতি। কোনো পক্ষই বিশ্বাস করে না যে অন্য পক্ষ চুক্তি বাস্তবায়ন করবে।
“প্রকৃত মধ্যস্থতাকারী, শান্তির বার্তাবাহক ও সেতুবন্ধনকারীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর ভারত ছাড়া এ ক্ষেত্রে আর কোনো দেশ ভালো অবস্থানে নেই।”
১৯৪৫-এর কাঠামো বদলের তাগিদ: বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় জাতিসংঘ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও স্পষ্টভাবে বলেছেন গুতেরেস। তার মতে, বর্তমান নিরাপত্তা পরিষদ ১৯৪৫ সালের বিশ্বের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতার সঙ্গে আর সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এর ফলে জাতিসংঘের বৈধতা ও কার্যকারিতা - দুই ক্ষেত্রেই সমস্যা তৈরি হয়েছে। একইভাবে ব্রেটন উডস ব্যবস্থা বর্তমান উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর বাস্তবতা প্রতিফলিত করে না। বিশ্ব ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এসব দেশের প্রতিনিধিত্ব স্পষ্টতই কম বলে মন্তব্য করেন তিনি।
“আমাদের ১৯৪৫ সালের বিশ্ব বাস্তবতার পরিবর্তে আজকের বিশ্বের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ক্ষমতার কাঠামো ও বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার প্রক্রিয়াগুলো পুনর্বিন্যাস করতে হবে।”
গুতেরেসের মতে, এটি শুধু সংস্কারের বিষয় নয়; প্রয়োজন একটি ব্যাপক পুনর্গঠন। তবে জাতিসংঘকে বিলুপ্ত করে নতুন কোনো প্রতিষ্ঠান গঠনের প্রয়োজন আছে বলে তিনি মনে করেন না।
গাজায় পরিস্থিতি ‘ভয়াবহ ও অগ্রহণযোগ্য’: গাজায় ইসরায়েলের অভিযানকে গণহত্যা হিসেবে বিবেচনা করেন কি না - এমন প্রশ্নের জবাবে গুতেরেস বলেন, গণহত্যা একটি আইনি সংজ্ঞা, যার সিদ্ধান্ত আদালতের বিষয়। তবে গাজায় যা ঘটছে, তা ভয়াবহ এবং একেবারেই অগ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেন তিনি।
“এটি আন্তর্জাতিক আইনের অধীন সব নীতির লঙ্ঘন।”
জাতিসংঘ ঘটনাটিকে আইনগতভাবে গণহত্যা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করছে না বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘ - এ কথাও স্মরণ করিয়ে দেন মহাসচিব।
গাজায় হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু এবং জাতিসংঘ কর্মকর্তাদের হত্যার পরও কোনো দেশ যদি জাতিসংঘ কর্মকর্তাদের প্রবেশে বাধা দেয় বা মহাসচিবকে সেখানে যেতে না দেয়, তাহলে জাতিসংঘের তা থামানোর ক্ষমতা নেই বলে জানান গুতেরেস।
তার ভাষায়, এটাই মূল সমস্যা। পরাশক্তিগুলোর বিভাজনের কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে ইসরায়েল, ইরান বা অন্য কোনো দেশ মনে করতে পারে যে তারা যা খুশি করতে পারে।
“আন্তর্জাতিক আইনের এসব লঙ্ঘনের জন্য কার্যকর শাস্তি নিশ্চিত করার মতো কোনো ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হাতে নেই।”
নিরাপত্তা পরিষদ অচল, জাতিসংঘ সচল: নিরাপত্তা পরিষদ অচল হয়ে পড়লেও জাতিসংঘের অন্যান্য কার্যক্রম থেমে যায়নি বলে জানান গুতেরেস। সীমিত সম্পদ ও বিভিন্ন ধরনের কাটছাঁটের মধ্যেও জাতিসংঘের কোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়নি। বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক এলাকাতেও সংস্থার প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করছে এবং মানুষকে সহায়তা দিচ্ছে।
শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে নীতিমালার আওতায় আনার ক্ষেত্রেও জাতিসংঘের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন তিনি। জাতিসংঘে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক স্বাধীন বৈজ্ঞানিক প্যানেল এবং প্রথম বৈশ্বিক সংলাপের আয়োজন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
গুতেরেসের ভাষায়, এসব উদাহরণ প্রমাণ করে জাতিসংঘ এখনো জীবনীশক্তিতে পূর্ণ এবং নিজেদের কাজের পদ্ধতি ও কাঠামো অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে সংস্কার করার সক্ষমতা রাখে।
তবে মূল সমস্যা ক্ষমতার কাঠামোতে। বর্তমান বিশ্বে ক্ষমতার সম্পর্ক বিকৃত হওয়ায় শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান নিরাপত্তা পরিষদ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
উত্তরসূরি হিসেবে চান নারী মহাসচিব: চলতি বছর জাতিসংঘের নতুন মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ার কথা। গুতেরেসের আরেক মেয়াদ দায়িত্বে থাকার প্রয়োজন আছে কি না জানতে চাইলে তিনি সরাসরি বলেন, “না, আমার আরেক মেয়াদ একেবারেই প্রয়োজন নেই।”
উত্তরসূরি হিসেবে একজন নারীকে দেখতে চান কি না - এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, জাতিসংঘের সর্বোচ্চ পদে নারীর থাকা স্বাভাবিক এবং এটি লিঙ্গসমতার বিষয়।
গত ১০ বছরে জাতিসংঘের ১৭০টি নেতৃত্বের পদে নারী-পুরুষ সমতা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে জানিয়ে গুতেরেস বলেন, বিভিন্ন দেশে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারীদের ৫৫ শতাংশ এখন নারী।
“একজন নারীকে মহাসচিব হিসেবে দেখতে পেলে আমি খুব খুশি হব।”
গত ১০ বছরে নিজের সবচেয়ে বড় সাফল্য ও ব্যর্থতার প্রসঙ্গে গুতেরেস বলেন, তার সাফল্য বা ব্যর্থতার বিচার অন্যদের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত। তবে জাতিসংঘের নীতির প্রতি পূর্ণ সম্মান রেখে গত ১০ বছর সংস্থাটিকে পরিচালনা করতে পারাকে নিজের কাজের সবচেয়ে সন্তোষজনক দিক হিসেবে দেখেন তিনি।
“মানদণ্ডের ক্ষেত্রে আমরা কখনো দ্বৈত নীতি গ্রহণ করিনি।”
অন্যদিকে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা ও নিরাপত্তা পরিষদসহ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুতর সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা ক্ষমতাধর দেশগুলোকে বোঝাতে না পারাকে নিজের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হিসেবে দেখেন তিনি।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ব্যর্থতার প্রসঙ্গে গুতেরেস বলেন, সেটি জাতিসংঘের ব্যর্থতা নয়, বরং সদস্য দেশগুলোর ব্যর্থতা। তার ভাষায়, জাতিসংঘ জলবায়ু পদক্ষেপের লড়াইয়ে সামনের সারিতে রয়েছে। কিন্তু সদস্য দেশগুলো মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর চেয়ে নিজেদের স্বল্পমেয়াদি স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে যাচ্ছে।
“সদস্য রাষ্ট্রগুলো জাতিসংঘকে যেমন দেখতে চায়, জাতিসংঘ তেমনই হবে। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অক্ষমতা বা অনিচ্ছার অজুহাত হিসেবে জাতিসংঘকে ব্যবহার করা উচিত নয়।”
৩১ ডিসেম্বর মহাসচিবের পদ ছাড়ার পর কী করবেন - এমন প্রশ্নের জবাবে গুতেরেস বলেন, এ বিষয়ে তার এখনো কোনো পরিকল্পনা নেই।
“আমার একেবারেই কোনো ধারণা নেই। ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত আমার যা করার কথা, তা ঠিকভাবে করতে কঠোর পরিশ্রম করছি। এরপর দেখা যাবে।”
সানা/ডিসি/আপ্র/১৩/৯/২০২৬