ভারতীয় বংশোদ্ভূত কবি, ঔপন্যাসিক, অনুবাদক ও গবেষক কেতকী কুশারী ডাইসন মারা গেছেন। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ৮৬ বছর বয়সে শুক্রবার (১০ সেপ্টেম্বর) ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডের শহরতলি কিডলিংটনে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক ও অনুবাদ সাহিত্যে ছিল তাঁর স্বতন্ত্র বিচরণ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিত্রকর্ম নিয়ে তাঁর গবেষণা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একই সঙ্গে রবীন্দ্রসাহিত্যের ইংরেজি অনুবাদেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন তিনি। প্রবাসে থেকেও আজীবন বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক বজায় রেখেছেন কেতকী কুশারী।
১৯৪০ সালে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন কেতকী কুশারী। ১৯৫৮ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে রেকর্ড নম্বর নিয়ে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক সম্পন্ন করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য অক্সফোর্ডে যান। সেখানে ১৯৬৩ সালে প্রথম শ্রেণিতে ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৭৫ সালে পিএইচডি লাভ করেন।
অক্সফোর্ডে পড়াশোনার সময় ইয়র্কশায়ারের অধিবাসী ও পদার্থবিদ্যার গবেষক রবার্ট ডাইসনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ব্রিটিশ নাগরিকত্ব অর্জনের পর নিজের নামের সঙ্গে স্বামীর পদবি ‘ডাইসন’ যুক্ত করেন তিনি। বিদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করলেও বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর আত্মিক বন্ধন কখনো শিথিল হয়নি; বরং সময়ের সঙ্গে তা আরো গভীর হয়েছে।
১৯৭৭ সালে প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘বল্কল’ দিয়ে তাঁর সাহিত্যজীবনের সূচনা। পরে মোট ছয়টি কবিতার বই প্রকাশ করেন তিনি। ‘নারী, নগরী’ এবং ইংল্যান্ডে অভিবাসীদের জীবন নিয়ে লেখা ‘নোটন নোটন পায়রাগুলি’ পাঠক ও সমালোচকদের প্রশংসা পায়। ‘জল ফুঁড়ে আগুন’ও তাঁর উল্লেখযোগ্য ও উচ্চ প্রশংসিত গ্রন্থ।
উপন্যাসের পাশাপাশি নাটকও লিখেছেন কেতকী কুশারী। তাঁর রচিত নাটকের মধ্যে ‘রাতের রোদ’ ও ‘সুবর্ণরেখা’ উল্লেখযোগ্য। গবেষণামূলক কাজেও তিনি স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেন। ‘রবীন্দ্রনাথ ও ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সন্ধানে’ গ্রন্থটি পাঠকমহলে ব্যাপক সাড়া ফেলে। রবীন্দ্রনাথের আঁকা ছবির বিশদ বিশ্লেষণ এবং রবীন্দ্রসাহিত্যের ইংরেজি অনুবাদে তাঁর কাজ বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে।
বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই কবিতা লিখেছেন কেতকী কুশারী। তাঁর উল্লেখযোগ্য বাংলা কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘সবীজ পৃথিবী’, ‘জলের করিডর ধরে’ ও ‘কথা বলতে দাও’। ইংরেজিতে লেখা তাঁর কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘হিবিস্কাস ইন দ্য নর্থ’ ও ‘স্যাপ উড’।
এ ছাড়া একাধিক প্রবন্ধগ্রন্থ রচনা করেছেন তিনি। প্রাবন্ধিক সুশোভন অধিকারীর সঙ্গে যৌথভাবে লেখা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’ তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজ। ‘শিকড়বাকড়’ ও ‘ভাবনার ভাস্কর্য’ নামের প্রবন্ধগ্রন্থও পাঠকমহলে সমাদৃত হয়েছে।
বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে প্রবাসজীবনের অভিজ্ঞতার যে সেতুবন্ধন কেতকী কুশারী ডাইসনের লেখায় তৈরি হয়েছিল, তাঁর বহুমাত্রিক সাহিত্যকর্মের মধ্য দিয়ে সেই স্বাতন্ত্র্য দীর্ঘদিন স্মরণে থাকবে।
সানা/ডিসি/আপ্র/১৩/৯/২০২৬