রাশিয়া ও ইউক্রেইনের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ আরো ভয়াবহ এক পর্যায়ে প্রবেশ করছে। যুদ্ধক্ষেত্রের সম্মুখসারির বাইরে দুই দেশই এখন একে অপরের অর্থনৈতিক ও জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে দূরপাল্লার ড্রোন হামলা বাড়িয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় রাশিয়া ও মস্কোর নিয়ন্ত্রণে থাকা ইউক্রেইনের বিভিন্ন এলাকায় ইউক্রেইনের ড্রোন হামলায় অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে শিশুও রয়েছে।
শনিবার (২২ আগস্ট) রুশ কর্মকর্তারা জানান, ইউক্রেইনের হামলায় দেশটির সামারা অঞ্চলের একটি শিল্প স্থাপনা ও দ্বিতীয় বৃহত্তম অনলাইন খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ওজোনের একটি সরবরাহকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া রাশিয়ার দক্ষিণ ও সীমান্তবর্তী কয়েকটি অঞ্চলেও ড্রোন হামলায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
সামারা অঞ্চলের গভর্নর ভিয়াচেস্লাভ ফেদোরিশচেভ জানান, নভোকুইবিশেভস্ক শহরে ইউক্রেইনের ড্রোন হামলায় এক বৃদ্ধা নিহত হয়েছেন এবং একটি শিল্প স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইউক্রেইনের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, তাদের লক্ষ্য ছিল শহরটির একটি তেল শোধনাগার এবং হামলার পর সেখানে আগুন ধরে যায়।
একই অঞ্চলের চাপায়েভস্ক শহরে ওজোনের একটি সরবরাহকেন্দ্রেও ড্রোন হামলা হয়েছে। রাশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অনলাইন খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, হামলার পর কেন্দ্রটির কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে এবং কয়েকজন আহত হয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটির এ স্থাপনায় এটিই ইউক্রেইনের প্রথম হামলা বলে জানা গেছে। এর আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে ইউক্রেইনের ড্রোন হামলার লক্ষ্য ছিল ওজোনের বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ওয়াইল্ডবেরিজের স্থাপনাগুলো।
রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় ক্রাসনোদার অঞ্চলের গভর্নর ভেনিয়ামিন কন্দ্রাতিয়েভ জানিয়েছেন, আজভ সাগরের বন্দরনগর ইয়েইস্কে ইউক্রেইনের ড্রোন হামলায় দুই শিশুসহ তিনজন নিহত হয়েছেন। সীমান্তবর্তী বেলগোরোদ অঞ্চলেও পৃথক হামলায় দুইজন নিহত ও ১৩ জন আহত হয়েছেন। আরেক সীমান্তবর্তী অঞ্চল ব্রায়ানস্কে চারজন আহত হয়েছেন।
২০১৪ সালে রাশিয়ার দখলে যাওয়া ক্রিমিয়া উপদ্বীপের সেভাস্তোপোলের গভর্নর মিখাইল রাজভোজায়েভ জানিয়েছেন, সেখানে একটি যাত্রীবাহী বাসে ইউক্রেইনের একটি ড্রোন আঘাত হানলে অন্তত দুইজন নিহত হন।
মস্কোর নিয়ন্ত্রণাধীন ইউক্রেইনের পূর্বাঞ্চলীয় লুহানস্ক অঞ্চলের রুশনিযুক্ত গভর্নর লিওনিদ পাশেচনিক জানান, ইউক্রেইনের ড্রোন হামলায় ১৬ বছরের এক কিশোরসহ দুই বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং আরো নয়জন আহত হয়েছেন।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শনিবার রাতভর দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে ৪৫৭টি ইউক্রেইনীয় ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। তবে এসব দাবির সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এর এক দিন আগেই ইউক্রেইনের মধ্যাঞ্চলের একটি বিপণিবিতানে রাশিয়ার একাধিক ড্রোন হামলায় অন্তত ১৬ জন নিহত এবং আরো প্রায় ১৩০ জন আহত হওয়ার কথা জানিয়েছে ইউক্রেইন। ফলে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি ড্রোন হামলায় বেসামরিক হতাহতের ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন শনিবার বলেছেন, ইউক্রেইনের এসব হামলা রাশিয়ার প্রতিশোধের ‘প্যান্ডোরার বাক্স’ খুলে দিয়েছে। তাঁর বক্তব্যে আরো বড় ধরনের পাল্টা হামলার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে ইউক্রেইনের দাবি, রাশিয়ার সামরিক অভিযানের অর্থায়ন ও যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা দুর্বল করতেই তারা সম্মুখসারির অনেক দূরে অবস্থিত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাচ্ছে। কিয়েভের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব হামলার লক্ষ্য বেসামরিক জনগণ নয়; বরং রাশিয়ার যুদ্ধ প্রচেষ্টার ভিত্তি হিসেবে কাজ করা জ্বালানি, শিল্প ও অন্যান্য অর্থনৈতিক অবকাঠামো।
যুদ্ধের এই নতুন কৌশল এখন কেবল সামরিক স্থাপনায় সীমাবদ্ধ নেই। তেল শোধনাগার, সরবরাহকেন্দ্র, শিল্প স্থাপনা ও অন্যান্য অর্থনৈতিক অবকাঠামো ক্রমেই হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে। ফলে যুদ্ধের ভৌগোলিক সীমা যেমন বাড়ছে, তেমনি সাধারণ মানুষের জীবনও সরাসরি ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
এদিকে ইউক্রেইনের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে নতুন ফরাসি সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ দ্রুত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ। ইউক্রেইনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে ফোনালাপে তিনি কিয়েভের আকাশ প্রতিরক্ষার ঘাটতি নিয়ে আলোচনা করেন এবং সহায়তা দ্রুত করার আশ্বাস দেন।
রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধ সাড়ে চার বছরের মাইলফলকের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ড্রোন হামলা এখন যুদ্ধের অন্যতম প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠেছে। এক পক্ষের হামলার জবাব আরেক পক্ষের আরো বড় হামলা-এই প্রতিশোধের চক্র যত দীর্ঘ হবে, ততই বাড়বে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বহু দূরের শহর ও জনপদেও যখন বিস্ফোরণের শব্দ পৌঁছে যাচ্ছে, তখন এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকেই।
সানা/আপ্র/২৪/৮/২০২৬