একটি পরিবারের এমন করুণ পরিণতি কেউ কল্পনাও করতে পারেননি। দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে অবসর নেওয়া একজন শিক্ষক, তার স্ত্রী, তরুণী মেয়ে আর কিশোর ছেলে-চারজনকে এক রাতেই হারিয়ে নিথর হয়ে গেল একটি পরিবার। যে বাড়িটি হওয়ার কথা ছিল তাদের নিরাপদ আশ্রয়, সেই বাড়িতেই একে একে প্রাণ গেল চারজনের।
রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ার এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের শিকার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী এবং ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী। গত শনিবার (২২ আগস্ট) রাতে তাদের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে রোববার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ জানান, বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করেই হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত।
এ ঘটনায় মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯) নামে দুই যুবককে আটক করা হয়েছে। তারা সম্পর্কে মামাতো-ফুফাতো ভাই। পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে দুজনই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তবে চারজনকে হত্যার পর কীভাবে এতা সময় বাড়ির ভেতরে থেকে হত্যাকারীরা পালিয়ে গেল, কীভাবে ঘটনাকে ডাকাতির রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হলো এবং শেষ পর্যন্ত কোন সূত্র ধরে পুলিশ তাদের শনাক্ত করল-সেই ঘটনাপ্রবাহ আরো ভয়াবহ।
ছাদে ইয়াবা, বাধা দিতে গিয়ে খুন: পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে পাশের একটি ভবনের ওপর দিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর নির্মাণাধীন বাড়ির ছাদে ওঠেন মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। সেখানে তারা ইয়াবা সেবন করছিলেন। শব্দ পেয়ে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে গিয়ে তাদের সেখানে থাকার কারণ জানতে চান এবং ইয়াবা সেবনে বাধা দেন। তখন নিজেদের পরিচয় প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় দুজন তাকে গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করেন বলে পুলিশের দাবি। গণপতির চিৎকার শুনে স্ত্রী প্রীতিলতা ছাদে যাওয়ার চেষ্টা করলে সিঁড়ির কাছে তাকেও হত্যা করা হয়। এরপর মেয়ে আগামী চক্রবর্তী এগিয়ে এলে তাকেও গামছা ও রশি দিয়ে শ্বাসরোধ করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। সবশেষে ঘরে ঘুমিয়ে থাকা ১২/১৩ বছর বয়সী ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয়। পুলিশের ভাষ্য, প্রথমে গলায় কাপড় পেঁচিয়ে এবং পরে বালিশচাপা দিয়ে শিশুটিকে শ্বাসরোধ করা হয়। পুলিশ কমিশনার সংবাদ সম্মেলনে শিশুটির বয়স নিজের সন্তানের সমান উল্লেখ করে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
খুনের পরও বাড়িতেই ছিল তারা: হত্যাকাণ্ডের পরপরই বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়নি দুই যুবক। পুলিশের দাবি, তারা কিছু সময় বাড়িটির ভেতরেই অবস্থান করেন। সেখানে গোসল করেন, ফ্রিজ থেকে খেজুর ও শসা বের করে খান এবং অবশিষ্ট ইয়াবা সেবন করেন। এরপর শুক্রবার জুমার নামাজের সময় রাস্তাঘাট ফাঁকা থাকার সুযোগে তারা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান বলে পুলিশ জানিয়েছে।
তবে বের হওয়ার আগে হত্যাকাণ্ডকে ভিন্ন দিকে নেওয়ার চেষ্টা করেন তারা। আলমারি ও ড্রয়ার খুলে কাপড়সহ বিভিন্ন জিনিসপত্র ঘরের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ফলে প্রথম দিকে ঘটনাটি ডাকাতির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ধারণা হয়েছিল। বাড়ির দুটি মুঠোফোনও ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়েছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। তদন্তকারীদের ধারণা, আলামত নষ্ট করতেই এমনটি করা হয়েছিল।
খেজুর-শসাই ধরিয়ে দিলো খুনিদের: হত্যাকাণ্ডের তদন্তে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে বেশকিছু অস্বাভাবিক আলামত পায়। ঘরের টেবিলে ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম ছিল। ফ্রিজ থেকে খেজুর ও শসা বের করে খাওয়ার প্রমাণও পাওয়া যায়। পড়ে ছিল খেজুরের বিচি ও কামড়ানো অর্ধেক শসা।
অন্যদিকে একটি সোনার চুড়ি আগুন দিয়ে পরীক্ষা করার চেষ্টার আলামতও পাওয়া যায়। এই সূত্রগুলো তদন্তকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পুলিশের ভাষ্য, স্বর্ণের কাজে অভিজ্ঞ স্থানীয় কেউ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন-এমন ধারণা থেকে তদন্ত এগোয়। পাশাপাশি খেজুরের বিচি ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া এসব আলামত ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থকে শনাক্ত করা হয়। পরে রোববার ভোরে নগরের দখীগঞ্জ শ্মশান এলাকা থেকে তাদের আটক করে পুলিশ। আটক মুগ্ধ নগরের সিটি বাজারে মাছের দোকানে কাজ করেন। আর সিদ্ধার্থ প্রায় আট বছর ধরে নগরের একটি জুয়েলারি দোকানে কারিগর হিসেবে কাজ করছেন।
স্বর্ণালংকারও নিয়ে গিয়েছিল: পুলিশ বলছে, হত্যার পর বাড়ি থেকে কিছু স্বর্ণালংকার নিয়ে যায় দুই যুবক। পরে সেগুলো একটি মন্দিরের পেছনের পরিত্যক্ত জায়গায় লুকিয়ে রাখা হয়। আটক ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ওই স্থান থেকে স্বর্ণালংকার উদ্ধার করা হয়েছে। তদন্তকারীদের ধারণা, হত্যার মূল কারণ ছিল নিজেদের পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। তবে স্বর্ণালংকার নেওয়া এবং পরে ডাকাতির নাটক সাজানোর ঘটনাও তদন্তের অংশ হিসেবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডে আরো কেউ জড়িত কি না, কিংবা এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করছে পুলিশ।
দুদিন কারও সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি: গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের সঙ্গে বৃহস্পতিবার রাতের পর থেকে স্বজনদের যোগাযোগ হচ্ছিল না। বৃহস্পতিবার রাত প্রায় একটার দিকে গণপতির মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর সঙ্গে তার মাসি পূজা চক্রবর্তীর শেষ কথা হয়। এরপর ফোনে আর কাউকে পাওয়া যায়নি।
গত শনিবার রাতে বোন ও তার পরিবারের খোঁজ নিতে মাছুয়াপাড়ার বাড়িতে আসেন পূজা। বাড়ির ফটক বন্ধ দেখে ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া পাননি। পরে জানালা দিয়ে ঘরের ভেতর এলোমেলো অবস্থা দেখতে পান। সন্দেহ হওয়ায় পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পুলিশ এসে ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে একে একে চারটি মরদেহ উদ্ধার করে। পুলিশ জানায়, গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ ছিল ছাদে। স্ত্রী প্রীতিলতা ও মেয়ে আগামীর মরদেহ পাওয়া যায় সিঁড়ির কাছে। আর ছেলে আয়ুশের মরদেহ ছিল শোবার ঘরের খাটের নিচে। মরদেহগুলোতে পচন ধরেছিল এবং বাড়ির ভেতর থেকে দুর্গন্ধ বের হচ্ছিল।
শান্ত পরিবারের এমন পরিণতি কেন: গণপতি চক্রবর্তী ছিলেন রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। প্রায় এক বছর আগে শিক্ষকতা থেকে অবসর নেওয়ার পর নিজ বাড়িতে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার চেম্বার পরিচালনা করতেন। রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার মির্জাপুরে তার গ্রামের বাড়ি। মির্জাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মির্জাপুর উচ্চবিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে মিঠাপুকুর থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। পরে কারমাইকেল কলেজ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। কর্মজীবনের শুরুতে কিছুদিন গাইবান্ধাতেও চাকরি করেন। প্রায় ২০১০ সালের দিকে মাছুয়াপাড়ায় জমি কেনেন গণপতি। বাড়ি নির্মাণ শুরু করেন ২০২৩ সালের দিকে। দীর্ঘদিন বিভিন্ন এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকার পর সম্প্রতি অসম্পূর্ণ বাড়িটির দ্বিতীয় তলায় স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে বসবাস শুরু করেছিলেন। পরিবারটি ছিল শান্ত স্বভাবের। প্রতিবেশীদের সঙ্গেও তাদের খুব বেশি ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়নি। স্বজনদের ভাষ্য, গণপতি ছিলেন অত্যন্ত ভালো ও নিরীহ মানুষ। কিন্তু সেই শান্ত পরিবারের চার সদস্যই এখন নেই।
শেষ হয়ে গেল একটি পরিবার: রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের সামনে রোববার স্বজনদের অপেক্ষা ছিল চারটি মরদেহ নিয়ে শেষবারের মতো বাড়ি ফেরার। আনুষ্ঠানিকতা শেষে রংপুরেই তাদের সৎকারের কথা জানান স্বজনেরা। পূজা চক্রবর্তীর কান্নায় বারবার ফিরে আসে গণপতির কথা। তার ভাষায়, অনেক কষ্ট করে বাড়িটি করেছিলেন গণপতি। খুব শান্ত মানুষ ছিলেন তিনি। অথচ সেই মানুষটির পুরো পরিবারকে একসঙ্গে শেষ করে দেওয়া হলো।
এই হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে নির্মম দিক হলো-চারজনের কারও আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই। নেই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের শান্ত বিকেল, নেই প্রীতিলতার সংসার, নেই আগামীর স্বপ্ন, নেই ছোট্ট আয়ুশের স্কুলে যাওয়ার ব্যস্ততা। অসমাপ্ত পড়ে আছে তাদের নতুন বাড়ি।
যে বাড়িটি তাদের নিরাপত্তা ও শান্তির আশ্রয় হওয়ার কথা ছিল, সেটিই এখন চারটি জীবনের স্মৃতি বহন করছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ, হত্যাকাণ্ডে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তির ভূমিকা এবং পুলিশের দাবির সব তথ্য তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া জরুরি। পাশাপাশি মাদক সেবন, অপরাধীদের বেপরোয়া হয়ে ওঠা এবং একটি হত্যাকাণ্ডকে ডাকাতির ঘটনা হিসেবে দেখানোর চেষ্টার বিষয়টিও গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ এটি শুধু একটি পরিবারের চারজন মানুষের হত্যাকাণ্ড নয়-এটি একটি নিরাপদ সমাজের ধারণার ওপরও নির্মম আঘাত। সেই লক্ষ্যে রংপুর জিলা স্কুলের শিক্ষার্থীরা রোববার হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছে। তাদের দাবি, জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। একটি পরিবার ছিল, স্বপ্ন ছিল, নতুন বাড়ি ছিল। এখন পড়ে আছে শুধু চারটি নিথর জীবনের স্মৃতি-আর একটি অসমাপ্ত বাড়ি।
সানা/আপ্র/২৩/৮/২০২৬