বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেছেন, আওয়ামী লীগ এমন সব অপকর্ম করেছে যে দলটি দেশের ভেতরে স্থির থাকতে পারেনি, পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। দুনিয়ার ইতিহাসে একবার যারা অপকর্মের দায় নিয়ে পালিয়ে যায়, তারা আর ফিরে আসতে পারে না।
রোববার (২৩ আগস্ট) রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা হলে আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নীতি ও আদর্শ নিয়ে জাতীয় সীরাত উদ্যাপন কমিটি এ সেমিনারের আয়োজন করে। একই অনুষ্ঠানে সীরাত উপলক্ষ্যে আয়োজিত রচনা প্রতিযোগিতার পুরস্কারও বিতরণ করা হয়। শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, ১৫ বছর ধরে ফ্যাসিবাদী সরকার যে পথে হেঁটেছে, বর্তমান সরকারও সেই পথে হাঁটা শুরু করেছে। তার ভাষায়, এটি আয়নাঘর তৈরি, বিনা বিচারে হত্যা এবং শাপলা চত্বরে আলেমদের ওপর হামলার পথ। সরকারকে ফ্যাসিবাদের এই পথ থেকে সরে আসার আহ্বান জানান তিনি। জামায়াত আমির বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে যে মানুষগুলো জেগে উঠেছিলেন, তাদের সবাই মারা যাননি বা ঘুমিয়ে পড়েননি। তারা সজাগ দৃষ্টিতে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছেন। তার দাবি, মূল যুদ্ধের আগে বাহিনীকে প্রস্তুত করা হয়, কসরত ও মহড়া দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানকে তিনি ‘চূড়ান্ত যুদ্ধের মহড়া’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ধারণা করা হয়েছিল, যুগ যুগ ধরে জমে থাকা ফ্যাসিবাদের আবর্জনা পরিষ্কার হয়ে যাবে। কিন্তু তা হয়নি; বরং আবর্জনা আরো বেড়েছে। ফ্যাসিবাদ কোনো নির্দিষ্ট দলের সঙ্গে সম্পর্কিত নয় উল্লেখ করে তিনি একে সংক্রামক ব্যাধির সঙ্গে তুলনা করেন। তার মতে, এই ‘ভাইরাস’ যার ওপর ভর করবে, সে-ই ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠবে। জামায়াতের আমির সবাইকে জুলাই জাদুঘর পরিদর্শনের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, দেশে অমানবিকভাবে আয়নাঘর তৈরি করা হয়েছিল। জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে এর একটি প্রতিরূপ দেখা যাবে, তবে বাস্তবে আয়নাঘরের নির্যাতন ছিল এর চেয়েও ভয়াবহ।
শফিকুর রহমানের অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাতির দুঃখ ও নির্যাতনের ঘটনাগুলো জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিশেষ একটি দেশকে খুশি করার জন্য সেখান থেকে অনেক উপাদান সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার দাবি, অনেক নির্যাতিত মানুষের স্মৃতিচিহ্ন ও ছবি সেখানে থাকলেও পরে সেগুলো সরিয়ে ফেলা হয় এবং একটি নির্দিষ্ট দলের স্মৃতি রাখা হয়েছে। জামায়াত আমির বলেন, ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি দেলাওয়ার হোসেনের ওপর নির্যাতনের স্মৃতিচিহ্নও জাদুঘরে ছিল, যা সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সীমান্তে নিহত ফেলানীর স্মৃতিও সেখানে আর নেই। তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা ভালো লক্ষণ নয়। ক্ষমতায় এসে প্রত্যেক সরকারই ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ করেছে; কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রায় সবাই কোনো না কোনোভাবে ইতিহাস বিকৃতির সঙ্গে জড়িয়েছে। আওয়ামী লীগের ফিরে আসার প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, অপকর্মের দায় নিয়ে যারা একবার পালিয়ে যায়, তারা আর ফিরে আসতে পারে না। তার এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে দলটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন নিয়েও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন তিনি। সেমিনারে প্রধান আলোচকের বক্তব্য দেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন। তিনি বলেন, ঐক্যবদ্ধ না থাকলে শত্রুরা ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করার সুযোগ পাবে। আলেমদের একে অপরকে গালমন্দ করার পেছনে তৃতীয় কোনো শক্তির হাত থাকতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি। তার আহ্বান, এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক ও ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, মদিনার আদলে রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।
সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন জাতীয় সীরাত উদ্যাপন কমিটির সদস্যসচিব আব্দুল মান্নান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আ ক ম আবদুল কাদের। সভাপতিত্ব করেন জাতীয় সীরাত উদ্যাপন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক আ ন ম রফিকুর রহমান মাদানী। অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন বিরোধীদলীয় হুইপ রফিকুল ইসলাম খান, জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল, সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম মাসুদ, ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক শামসুল আলম, তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসা যাত্রাবাড়ী শাখার অধ্যক্ষ খলিলুর রহমান মাদানী এবং শেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রাশেদুল ইসলাম।
সানা/আপ্র/২৩/৮/২০২৬