পাকিস্তানকে ঘাঁটি বানিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে অনলাইন প্রতারণা চালানোর অভিযোগে বিদেশি নাগরিকদের নিয়ে গড়ে ওঠা একাধিক চক্রের সন্ধান পেয়েছে দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সম্প্রতি ইসলামাবাদে বড় ধরনের অভিযানে শত শত বিদেশিকে আটক ও গ্রেফতারের পর তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই বেরিয়ে আসছে প্রতারণার বিস্তৃত নেটওয়ার্ক, অবৈধ কল সেন্টার, ভিসার অপব্যবহার এবং স্থানীয়ভাবে সহযোগিতা পাওয়ার নানা তথ্য।
পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনলাইন জালিয়াতি ও অন্যান্য অবৈধ কর্মকাণ্ডের অভিযোগে সম্প্রতি ২৮৪ বিদেশিকে গ্রেফতার করা হয়। পরে আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাদের বৈধ ভ্রমণ নথি ও প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে ১৫ দিনের মধ্যে পাকিস্তান ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এদের বড় অংশ ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও চীনের নাগরিক বলে জানা গেছে।
তবে তদন্তের পরিধি শুধু গ্রেফতার হওয়া বিদেশিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। পাকিস্তান টেলিযোগাযোগ কর্তৃপক্ষ, কেন্দ্রীয় রাজস্ব বোর্ড ও সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকেও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। পাশাপাশি অভিবাসন, পাসপোর্ট ও ভিসা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন-বিদেশিরা কীভাবে পাকিস্তানে প্রবেশ করেছে, কোন ধরনের ভিসা নিয়েছে, কোথায় অবস্থান করেছে, কী ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং কীভাবে তাদের অনলাইন প্রতারণার কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।
এরই মধ্যে আরো বড় একটি অভিযানের তথ্য সামনে এসেছে। ইসলামাবাদের একটি বহুতল ভবনে পরিচালিত কথিত অবৈধ কল সেন্টারে অভিযান চালিয়ে ২৫৮ বিদেশিকে আটক করেছিল কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা। পরে একই স্থাপনায় জাতীয় সাইবার অপরাধ তদন্ত সংস্থার পৃথক অভিযানে আরো ১১৪ বিদেশিকে আটক করা হয়। দুই মামলায় মোট ৩৭২ বিদেশিকে আদালতের মাধ্যমে ১৪ দিনের বিচারিক হেফাজতে পাঠানো হয়েছিল।
তদন্তকারীদের ভাষ্য, এসব বিদেশির অনেকে পর্যটন, ভ্রমণ বা ব্যবসায়িক ভিসায় পাকিস্তানে প্রবেশ করলেও সেখানে তাদের কার্যক্রম ভিসায় ঘোষিত উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। একটি বড় কল সেন্টারধাঁচের অবকাঠামোতে তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। অনলাইন প্রতারণা, আর্থিক সুবিধা আদায়, পরিচয় গোপন করে প্রতারণা এবং ব্ল্যাকমেইলের মতো অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তে উঠে আসা আরো চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, প্রতারণা চক্রের একজন সদস্য তদন্তকারীদের কাছে দাবি করেছেন, তাদের নয় সদস্যের দলে দুই চীনা ও সাত ইন্দোনেশীয় নাগরিক ছিলেন। বিভিন্ন প্রতারণামূলক কৌশলের মাধ্যমে চক্রটি মাসে প্রায় ৮০ হাজার মার্কিন ডলার আয় করত বলেও তিনি জানিয়েছেন। বিশেষ করে ৪০ বছরের বেশি বয়সী ইন্দোনেশীয় নারীদের লক্ষ্য করা হতো বলে তার দাবি। পাকিস্তানকে ঘাঁটি বানালেও ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই ছিল দেশের বাইরের মানুষ।
তদন্তে শুধু প্রতারকদের কর্মকাণ্ডই নয়, তাদের সহযোগিতা করার অভিযোগও সামনে এসেছে। একটি পৃথক তদন্তে পাকিস্তানের অভিবাসন ও পাসপোর্ট বিভাগের কর্মকর্তা এবং ইসলামাবাদ পুলিশের বিশেষ শাখার সদস্যদের বিদেশিদের অবৈধভাবে প্রবেশ ও চলাচলে সহযোগিতার অভিযোগ উঠেছে। এক চীনা মধ্যস্থতাকারীর তথ্যের ভিত্তিতে দুই সরকারি কর্মকর্তাকে গ্রেফতারও করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে অবৈধ কল সেন্টার, সাইবার প্রতারণা, চাঁদাবাজি, ব্ল্যাকমেইল ও অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে দেশব্যাপী বিশেষ অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাকিস্তান সরকার। কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার অধীনে বিশেষ দল গঠন করে তাদের দৈনন্দিন অভিযানের প্রতিবেদন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। করাচিতে পরিচালিত অবৈধ কল সেন্টারগুলোর একটি তালিকাও প্রস্তুত করা হয়েছে।
পাকিস্তানে বিদেশি নাগরিকদের কথিত সাইবার প্রতারণা চক্রের এই বিস্তার শুধু একটি দেশের আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি আন্তঃদেশীয় সাইবার অপরাধের ক্রমবর্ধমান ভয়াবহতারও ইঙ্গিত। সীমান্তের কাঁটাতার পেরোনোর প্রয়োজন নেই-একটি ঘর, কয়েকটি যন্ত্র এবং ইন্টারনেট সংযোগ দিয়েই বিশ্বের অন্য প্রান্তের মানুষের সঞ্চয়, পরিচয় ও নিরাপত্তা লুটে নেওয়া সম্ভব। তাই এই চক্রের বিরুদ্ধে শুধু গ্রেফতার ও বহিষ্কার নয়, অর্থের প্রবাহ, ডিজিটাল অবকাঠামো, ভুয়া পরিচয় এবং স্থানীয় সহযোগীদেরও একযোগে শনাক্ত করা জরুরি।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন-এত বিপুলসংখ্যক বিদেশি কীভাবে পাকিস্তানে ঢুকে সংগঠিতভাবে এমন কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ পেল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করতে না পারলে একটি চক্র ধরা পড়লেও আরেকটি চক্র নতুন নামে, নতুন ঠিকানায় আবারো জাল বিছাবে।
সানা/আপ্র/২৪/৮/২০২৬