যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্ক নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। আলোচনার ব্যর্থতার পর কানাডার কয়েকটি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের রাজ্য না হয়েও একটি রাজ্য হওয়ার সব সুবিধা ভোগ করতে চায়।
শুক্রবার (২১ আগস্ট) রাতে বাণিজ্য আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর শনিবার(২২ আগস্ট) ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কানাডার বিরুদ্ধে এমন মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, বছরের পর বছর ধরে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের কৃষকদের ওপর বিপুল শুল্ক আরোপ করে আসছে।
ট্রাম্পের এ বক্তব্য তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম রাজ্যে পরিণত করার বিষয়ে দেওয়া একাধিক মন্তব্যেরই ধারাবাহিকতা। কানাডার সার্বভৌমত্ব নিয়ে ট্রাম্পের এমন বক্তব্য দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আগে থেকেই ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। এবার বাণিজ্যিক বিরোধের মধ্যেও একই ধরনের মন্তব্য করায় দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
এদিকে বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ককে কানাডার অর্থনীতি ও স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া সর্বশেষ শর্তগুলো ছিল অন্যায্য এবং কানাডার অর্থনৈতিক স্বার্থের পরিপন্থী। বিশেষ করে কানাডার ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়টি নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে অটোয়া।
কার্নি জানিয়েছেন, আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু পণ্যের ওপর সমপরিমাণ পাল্টা শুল্ক আরোপ করবে কানাডা। ইস্পাত, দুগ্ধজাত পণ্য, গৃহস্থালি সামগ্রী, কৃষি সরঞ্জাম, কাগজ ও ইলেকট্রনিক পণ্যসহ বিভিন্ন মার্কিন পণ্য এ পাল্টা শুল্কের আওতায় থাকবে। তিনি বলেছেন, কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্যযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে এবং দেশের শিল্প ও কর্মসংস্থান রক্ষায় সরকার প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ৫০ শতাংশ শুল্ক কানাডা থেকে আমদানি করা প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যে কার্যকর হয়েছে। এর মধ্যে পোশাক, আসবাব, দুগ্ধজাত পণ্য, সিমেন্ট, মাছ ধরার সরঞ্জাম, হকি সরঞ্জামসহ বিভিন্ন পণ্য রয়েছে। এসব নতুন শুল্ক কানাডার যুক্তরাষ্ট্রে বার্ষিক রপ্তানির প্রায় ৫ শতাংশকে প্রভাবিত করবে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এর ফলে সীমান্তের দুই পাশের ব্যবসা ও ভোক্তাদের ওপরও বাড়তি ব্যয়ের চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শুক্রবার শেষ হওয়া তিন দিনের নিবিড় আলোচনায় একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর বিষয়ে দুই দেশই আশাবাদী ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা একে অপরের বিরুদ্ধে আলোচনার শর্ত পরিবর্তন এবং সমঝোতার পথে বাধা তৈরির অভিযোগ তোলে। শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তি ছাড়াই আলোচনা শেষ হয়। নতুন করে আলোচনার নির্দিষ্ট কোনো সময়সূচিও এখন পর্যন্ত নির্ধারিত হয়নি।
এই অচলাবস্থা শুধু দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যেই প্রভাব ফেলছে না; উত্তর আমেরিকার দীর্ঘদিনের বাণিজ্য কাঠামোর ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মধ্যকার বাণিজ্য চুক্তির ভবিষ্যৎও নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র ও প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্কে অর্থনৈতিক বিরোধের পাশাপাশি রাজনৈতিক অবিশ্বাসও বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, শুল্কের এই পাল্টাপাল্টি শেষ পর্যন্ত পণ্যের দাম বাড়িয়ে সাধারণ ভোক্তাদের ওপরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ব্যবসায়ীদের জন্য সরবরাহব্যবস্থা ও বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা বাড়বে। অন্যদিকে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে নতুন আন্তর্জাতিক বাজার খোঁজার পথেও আরো জোর দিতে পারে।
ফলে ট্রাম্পের ‘রাজ্য হওয়ার সুবিধা’ মন্তব্য নিছক রাজনৈতিক বাক্যবাণ হিসেবে দেখার সুযোগ কমে যাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ৫০ শতাংশ শুল্ক, পাল্টা শুল্ক এবং ভেঙে পড়া বাণিজ্য আলোচনা। একসময়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ দুই প্রতিবেশীর সম্পর্কে এখন অর্থনৈতিক স্বার্থ, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও রাজনৈতিক মর্যাদা-তিনটিই নতুন করে পরীক্ষার মুখে।
সানা/ডিসি/আপ্র/২৩/৮/২০২৬