ভারতে ফেসবুক, ইউটিউব ও এক্সসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবর ও রাজনৈতিক মতামত প্রকাশে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের লক্ষ্যে নতুন নিয়মের প্রস্তাব দিয়েছে দেশটির সরকার। এই প্রস্তাব অনুযায়ী, অনলাইনে খবর বা চলমান ঘটনা নিয়ে পোস্ট করেন কিন্তু নিবন্ধিত সংবাদমাধ্যম নন-এমন ব্যবহারকারীদেরও এখন সংবাদ সংস্থাগুলোর জন্য নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে।
দেশটির ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্প্রতি তথ্যপ্রযুক্তি নীতিমালায় এই সংশোধনের প্রস্তাব দেয়। বর্তমানে এই নীতিমালার মাধ্যমেই ডিজিটাল কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ করা হয়। নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে স্বাধীন সাংবাদিক, পডকাস্টার ও সাধারণ ব্যবহারকারীদের প্রকাশিত সংবাদধর্মী কনটেন্টের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ আরো বিস্তৃত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো সরকার নির্ধারিত নির্দেশনা না মানলে তারা আর ব্যবহারকারীদের পোস্ট করা কনটেন্টের জন্য আইনি দায়মুক্তি পাবে না। এতে প্ল্যাটফর্মগুলো বাধ্য হয়ে দ্রুত সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করবে-যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আরো কঠোর করে তুলতে পারে।
এ প্রস্তাব ইতোমধ্যে ডিজিটাল অধিকার কর্মী ও স্বাধীন কনটেন্ট নির্মাতাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তাদের আশঙ্কা, এর মাধ্যমে সামাজিক মাধ্যমে প্রায় পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হতে পারে এবং ভিন্নমত দমনের সুযোগ তৈরি হবে। সমালোচকদের মতে, এই ধরনের নিয়ম প্রয়োগ হলে ব্যবহারকারীরা আত্মনিয়ন্ত্রণ বা স্ব-সেন্সরশিপে বাধ্য হতে পারেন।
ইউটিউবভিত্তিক একটি জনপ্রিয় চ্যানেলের পরিচালক আকাশ ব্যানার্জি বলেন, অনলাইন কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে ইতোমধ্যে একাধিক আইন থাকা সত্ত্বেও ভুয়া খবর বা বিদ্বেষমূলক বক্তব্য কমেনি। বরং সরকারের সমালোচনামূলক কনটেন্ট সরিয়ে ফেলার প্রবণতা বেড়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। যদিও সরকার এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
অন্যদিকে, সরকার বলছে-এই সংশোধনের মাধ্যমে ভুয়া খবর, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য এবং প্রযুক্তিনির্ভর বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে। প্রস্তাবিত নীতিমালা নিয়ে জনমত সংগ্রহের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি তথ্যপ্রযুক্তি আইনের আওতায় সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। কিছু ব্যবহারকারী অভিযোগ করেছেন, আগাম নোটিস ছাড়াই তাদের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করা হয়েছে এবং পরবর্তীতে আদালতের মাধ্যমে আংশিক প্রতিকার পেলেও অনেক পোস্ট এখনো ব্লক রয়েছে। এসব পোস্টে সরকারের সমালোচনা ছিল বলে তারা দাবি করেছেন।
ডিজিটাল অধিকার সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, গত কয়েক বছরে ধারাবাহিক সংশোধনের মাধ্যমে অনলাইন কনটেন্টের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো হয়েছে। পোস্ট অপসারণের সময়সীমা কমিয়ে আনা এবং বিভিন্ন সংস্থাকে সরাসরি নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়ার ফলে এই নিয়ন্ত্রণ আরো কার্যকর হয়েছে। তবে এই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতির কথাও তারা উল্লেখ করেছেন।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এখন সাধারণ নাগরিকরাও সংবাদ প্রচারে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন, তাই একটি অভিন্ন নীতিমালা প্রয়োজন। তবে সমালোচকদের মতে, গণতান্ত্রিক পরিবেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, সামাজিক মাধ্যমে খবর ও রাজনৈতিক কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে ভারতের নতুন এই উদ্যোগ একদিকে যেমন তথ্যপ্রবাহের শৃঙ্খলা আনার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে, অন্যদিকে তা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ডিজিটাল অধিকারের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সানা/আপ্র/১০/৪/২০২৬