রাতের আকাশে চাঁদের উপস্থিতি এতটাই স্বাভাবিক যে, একে ছাড়া পৃথিবীর অস্তিত্ব কল্পনা করাও কঠিন। সৃষ্টির পর থেকে চাঁদ যেমন রাতের আকাশকে আলোকিত করেছে, তেমনি পৃথিবীর প্রকৃতি, জলবায়ু ও জীববৈচিত্র্যের ওপরও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখেছে।
কিন্তু যদি চাঁদ না থাকত, কিংবা হঠাৎ বিলীন হয়ে যেত, তাহলে কেমন হতো আমাদের পৃথিবী?
বিজ্ঞানীদের গবেষণা ও তথ্য অনুযায়ী, চাঁদের অনুপস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ত জোয়ার-ভাটার ওপর।
মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলের আকারের একটি মহাজাগতিক বস্তুর সঙ্গে পৃথিবীর সংঘর্ষের ফলে চাঁদের সৃষ্টি হয়েছিল।
পৃথিবীর এই একমাত্র প্রাকৃতিক উপগ্রহের মহাকর্ষীয় প্রভাব না থাকলে সমুদ্রের জোয়ারের উচ্চতা বর্তমানের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশে নেমে আসত এবং জোয়ার-ভাটা পুরোপুরি সূর্যের আকর্ষণ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতো। ফলে প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে জোয়ার ও ভাটা দেখা যেত।
চাঁদ না থাকলে পৃথিবীর ঘূর্ণনগতিতেও বড় পরিবর্তন আসত। বিজ্ঞানীদের ধারণা, তখন পৃথিবী আরো দ্রুত ঘুরত এবং একটি দিন শেষ হতে সময় লাগত মাত্র ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা। অর্থাৎ বর্তমানের ২৪ ঘণ্টার দিনের ধারণাই বদলে যেত।
রাতের আকাশও হয়ে উঠত অনেক বেশি অন্ধকার। চাঁদের পর রাতের আকাশে সবচেয়ে উজ্জ্বল বস্তু শুক্র গ্রহ হলেও তার উজ্জ্বলতা পূর্ণিমার চাঁদের তুলনায় প্রায় ১৪ হাজার গুণ কম। ফলে জোছনাভরা রাতের সৌন্দর্য পৃথিবী থেকে হারিয়ে যেত।
চাঁদের অনুপস্থিতিতে সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণের মতো মহাজাগতিক ঘটনাও আর ঘটত না।
সে ক্ষেত্রে সূর্যকে আংশিকভাবে আড়াল করার মতো বিরল ঘটনা দেখতে শুক্র গ্রহের সূর্য ও পৃথিবীর মাঝখান দিয়ে অতিক্রমের অপেক্ষা করতে হতো, যা অত্যন্ত বিরল একটি ঘটনা।
জলবায়ুর ক্ষেত্রেও দেখা দিত বড় ধরনের অস্থিতিশীলতা। চাঁদ পৃথিবীকে তার অক্ষে স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি না থাকলে সূর্যের মহাকর্ষীয় প্রভাবে পৃথিবীর অক্ষ দুলতে শুরু করত।
এর ফলে মেরু অঞ্চলের বরফস্তর অস্থিতিশীল হয়ে যেত এবং বৈশ্বিক জলবায়ুতে ব্যাপক পরিবর্তন দেখা দিত। এমনকি সমুদ্রের জলরাশির বণ্টনেও পরিবর্তন ঘটতে পারত।
চাঁদের আলো না থাকলে নিশাচর প্রাণীদের জীবনও কঠিন হয়ে উঠত।
রাতের অন্ধকারে চলাফেরা ও খাদ্য সংগ্রহের জন্য তাদের নতুনভাবে অভিযোজিত হতে হতো। একই সঙ্গে এমন অনেক জলজ প্রাণী রয়েছে, যাদের প্রজনন চক্র চাঁদের অবস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত। চাঁদ না থাকলে এসব প্রাণীর বংশবৃদ্ধি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারত।
মানব ইতিহাসও ভিন্ন রূপ পেত। চাঁদকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বহু বৈজ্ঞানিক গবেষণা, আবিষ্কার ও ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটত না।
যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার মহাকাশ প্রতিযোগিতা কিংবা ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই চাঁদের বুকে মানুষের প্রথম পদচারণার মতো ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো ইতিহাসের অংশ হতো না।
উল্কাপিণ্ডের আঘাত ও সৌরজগতের বিবর্তন নিয়ে গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্ষেত্র থেকেও মানবজাতি বঞ্চিত হতো।
বিজ্ঞানীরা আরো মনে করেন, যদি কোনো কারণে চাঁদ ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে তার ধ্বংসাবশেষ পৃথিবীর চারপাশে বলয় সৃষ্টি করতে পারে।
পরবর্তী বহু বছর ধরে সেই ধ্বংসাবশেষের অংশ পৃথিবীতে উল্কার মতো আছড়ে পড়ে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
সূত্র: সায়েন্স ব্লগস, ফোর্বস, প্ল্যানেটারি সায়েন্স ইনস্টিটিউট, সায়েন্স নরডিক
সানা/ডিসি/আপ্র/১/৬/২০২৬