দেশে হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক আকার ধারণ করছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরো ১০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে চারজনের মৃত্যু সরাসরি হামে হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, আর বাকি ছয়জন হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে।
রোববার (১২ এপ্রিল) প্রকাশিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই হিসাব ১১ এপ্রিল সকাল ৮টা থেকে ১২ এপ্রিল সকাল ৮টা পর্যন্ত সময়ের।
মৃত চার শিশুই ঢাকার বাসিন্দা। উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া ছয় শিশুর মধ্যে পাঁচজন ঢাকা বিভাগের এবং একজন খুলনা বিভাগের।
নতুন শনাক্ত ও হাসপাতালে ভর্তি: একই সময়ে দেশে হামের সংক্রমণও দ্রুত বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১৫০ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১২৩ জন ঢাকা বিভাগে। রাজশাহী বিভাগে শনাক্ত হয়েছেন ২১ জন, আর চট্টগ্রাম ও সিলেটে একজন করে রোগী শনাক্ত হয়েছে। এই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৭৬২ শিশু। এর মধ্যে ৩৫৭ জনই ঢাকা বিভাগের। অন্যদিকে সবচেয়ে কম ভর্তি হয়েছে রংপুরে ১১ জন এবং ময়মনসিংহে ২২ জন।
উপসর্গ নিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা হাজার ছাড়াল: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ১ হাজার ২৬৮ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা গেছে। এর মধ্যে ৫৮০ জনই ঢাকা বিভাগের। একই সময়ে হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৬৩৪ শিশু। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ৩১২ জন এবং চট্টগ্রামে ১২০ জন ছাড়পত্র পেয়েছে।
২৯ দিনে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে উদ্বেগজনক: গত ১৫ মার্চ থেকে ১২ এপ্রিল পর্যন্ত ২৯ দিনে হামে আক্রান্ত হয়ে ২৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আর একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১৫১টি শিশুর-যা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে স্পষ্ট করে তুলছে। এই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসা ১৫ হাজার ৬৫৩ জনের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১০ হাজার ২২৫ জন।
এর মধ্যে ২ হাজার ৬৩৯ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে এবং সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৭ হাজার ৬৫৬ জন।
হামের প্রাদুর্ভাব রোধে সরকারের উদ্যোগ: স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এম এ মুহিত জানিয়েছেন, অল্প সময়ের মধ্যেই হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আনা হবে। রাজধানীর কড়াইল এলাকায় হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধনে তিনি বলেন, সরকার এ বিষয়ে বদ্ধপরিকর।
তিনি জানান, বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেশের ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলাকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকায় ৫ এপ্রিল থেকেই জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
সারাদেশে টিকাদান কর্মসূচি সম্প্রসারণ: প্রতিমন্ত্রী বলেন, ইতোমধ্যে বড় বড় সিটি করপোরেশনগুলোতে টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আগামী ২০ এপ্রিল থেকে সারা দেশে এই কর্মসূচি চালু করা হবে।
তিনি অভিভাবকদের উদ্দেশে আহ্বান জানিয়ে বলেন, ৬ মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের অবশ্যই টিকার আওতায় আনতে হবে। হাম অত্যন্ত সংক্রামক হলেও সময়মতো টিকা দিলে এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব।
গোষ্ঠীগত প্রতিরোধেই সুরক্ষা: প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, অধিকাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে পারলে ‘গোষ্ঠীগত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা’ তৈরি হবে। এতে একটি এলাকায় সংক্রমণ ছড়ানোর সুযোগ কমে যাবে এবং সব শিশুই সুরক্ষিত থাকবে। তিনি জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্বারোপ করে বলেন, সঠিক তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে রোগ প্রতিরোধ আরো সহজ হবে।
রাজধানীতে বিভিন্ন স্থানে টিকাদান কর্মসূচি: রাজধানী ঢাকায় বিভিন্ন স্থানে হামের টিকাদান কার্যক্রম চলছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে নগর ভবনে এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ব্যবস্থাপনায় মহাখালীর কড়াইল এলাকায় টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এছাড়া মোহাম্মদপুর মেটারনিটি হাসপাতাল প্রাঙ্গণ এবং শান্তিনগর এলাকায় পৃথকভাবে টিকাদান কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে।
অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান: সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হামের মতো সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে টিকাদানই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। অভিভাবকদের নির্ধারিত কেন্দ্রে শিশুদের নিয়ে গিয়ে টিকা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। ক্রমবর্ধমান সংক্রমণ ও শিশুমৃত্যুর এই পরিস্থিতিতে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপই পারে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে-এমনটাই মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
সানা/আপ্র/১২/৪/২০২৬