মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল চন্দ্রনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, বিশেষ ক্লাসে মাঝেমধ্যে শ্রেণিকক্ষে বসেন তাদের অভিভাবকেরাও। শিক্ষক কীভাবে পাঠ বুঝিয়ে দেন, তা সরাসরি দেখে বাড়িতে সন্তানদের পড়াশোনায় সহযোগিতা করেন তাঁরা। শুক্রবার ও শনিবারও চলে বিশেষ ক্লাস। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি, অভিভাবকদের সম্পৃক্ততা, পাঠদানের বিশেষ পদ্ধতি এবং পড়াশোনার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক চর্চা ও নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশের উদ্যোগে বিদ্যালয়টি গড়ে তুলেছে স্বতন্ত্র পরিচিতি।
শ্রীমঙ্গল শহরে অবস্থিত বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে শিক্ষার্থী ৭২২ জন। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার ১৩৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে শিক্ষার্থী সংখ্যায় শীর্ষে রয়েছে এ বিদ্যালয়। শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফলাফলের পাশাপাশি কাব স্কাউট ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য সাফল্য।
অভিভাবকেরাও দেখেন পাঠদানের পদ্ধতি
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জহর তরফদার দায়িত্ব নেওয়ার পর শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা, পঞ্চম শ্রেণির জন্য বিশেষ ক্লাস চালু রাখা এবং অভিভাবকদের সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন। বিশেষ করে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য শুক্রবার ও শনিবারও অতিরিক্ত ক্লাস নেওয়া হয়। কোনো কোনো দিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত চলা এসব ক্লাসে প্রধান শিক্ষক নিজেই পাঠদান করেন।
এরপর বেলা ১২টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত চলে নিয়মিত ক্লাস। বিশেষ ক্লাসে অভিভাবকদেরও কখনো কখনো সন্তানদের সঙ্গে বসতে হয়। শিক্ষক কীভাবে বিষয়গুলো বুঝিয়ে দেন, তা দেখে তাঁরা বাড়িতে সন্তানদের পড়াশোনায় সহায়তা করতে পারেন।
পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী দেবার্ঘ দেবের মা দেবদ্রুতি পাল চৌধুরী বলেন, “সকাল ৯টা থেকে বেলা ১২টা পর্যন্ত বিশেষ ক্লাসের পর আবার ১২টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত নিয়মিত ক্লাস হয়। মাঝেমধ্যে আমাদেরও সন্তানের সঙ্গে ক্লাসে বসতে হয়। স্যার কীভাবে বুঝিয়ে পড়ান, আমরা সেটা দেখি এবং পরে বাসায় সহযোগিতা করি।”
তিনি জানান, অতিরিক্ত ক্লাসের জন্য শিক্ষার্থীদের কোনো বাড়তি টাকা দিতে হয় না।
পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী আদিবা হুসেনের বাবা লোকমান হোসেন শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। তাঁর মতে, চন্দ্রনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদানের পদ্ধতি অন্য অনেক বিদ্যালয়ের চেয়ে আলাদা।
লোকমান হোসেন বলেন, “এটি আর দশটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো নয়। এখানে শিক্ষার মান ভালো। আমার মেয়ের বেসিক অনেক ভালো হয়েছে। বিদ্যালয়ের নিয়ম ও পড়ানোর পদ্ধতি শিক্ষার্থীরা ঠিকভাবে গ্রহণ করতে পারলে পিছিয়ে পড়ার সুযোগ কম।”
এক দশকে শতাধিক শাপলা কাব অ্যাওয়ার্ড
বিদ্যালয়টির সাফল্যের আরেকটি বড় দিক কাব স্কাউট কার্যক্রম। ২০২১ সালে শাপলা কাব অ্যাওয়ার্ড পরীক্ষায় বিদ্যালয়টির ১২ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে সাতজন পুরস্কার অর্জন করে। এরপরও এ সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। কোনো বছর সাতজন, কোনো বছর আটজন, আবার কোনো বছর নয়জন শিক্ষার্থী এ সম্মাননা পেয়েছে। ২০২৫ সালে বিদ্যালয়টির সাতজন শিক্ষার্থী শাপলা কাব অ্যাওয়ার্ড অর্জন করে।
বিদ্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী, গত ১০ বছরে শিক্ষার্থীরা শতাধিক শাপলা কাব অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে। বাংলাদেশ স্কাউটসের কাব স্কাউট শাখায় ৬ থেকে ১১ বছর বয়সী শিশুদের জন্য এটি সর্বোচ্চ সম্মাননা।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক প্রণবেশ চৌধুরী অন্তু বলেন, গত এক দশকে শিক্ষার্থীরা শতাধিক শাপলা কাব অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে। সাংস্কৃতিক বিভিন্ন প্রতিযোগিতায়ও জাতীয় পর্যায়ে সাফল্য অর্জন করেছে তারা।
পাঠ্যবইয়ের বাইরেও নৈতিকতা ও সংস্কৃতির চর্চা
শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার উপযোগী করে গড়ে তোলাই বিদ্যালয়টির লক্ষ্য নয়। নৈতিক শিক্ষা, সাংস্কৃতিক চর্চা, শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। গুরুজনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ অনুযায়ী নৃত্য, আবৃত্তি, সংগীত ও একক অভিনয়ের আলাদা কার্যক্রম রয়েছে।
সহকারী শিক্ষক প্রণবেশ চৌধুরী অন্তু বলেন, “আমাদের এখানে শুধু লেখাপড়া নয়, শিক্ষার্থীদের আগ্রহ অনুযায়ী বিভিন্ন গ্রুপে যুক্ত করা হয়। আবৃত্তি, নৃত্য ও সংগীতের আলাদা বিভাগ রয়েছে। কয়েকজন শিক্ষককে এসব বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।”
সহকারী শিক্ষক লাভলী দত্ত জানান, তিনি বিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার পর থেকেই দেখছেন, প্রধান শিক্ষক পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা ক্লাস করান এবং শুক্রবার-শনিবারও সময় দেন। এর সুফলও পাওয়া যাচ্ছে। বিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করা শিক্ষার্থীরা ভালো মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে।
১৩ শতাংশ জমিতে ৭২২ শিক্ষার্থী, জায়গার সংকট
শিক্ষার্থী সংখ্যা ও বিভিন্ন কার্যক্রমে সাফল্য থাকলেও বিদ্যালয়টির বড় সমস্যা জায়গার স্বল্পতা। মাত্র ১৩ শতাংশ জমিতে অবস্থিত বিদ্যালয়টিতে পড়াশোনা করছে ৭২২ জন শিক্ষার্থী।
সহকারী শিক্ষিকা মহামায়া শর্মা বন্যা বলেন, “মাত্র ১৩ শতাংশ জমিতে আমাদের বিদ্যালয় অবস্থিত। অথচ এখানে শিক্ষার্থী ৭২২ জন। বিভিন্ন এলাকা থেকে অভিভাবকেরা সন্তানকে ভর্তি করাতে আসেন।”
তিনি বলেন, “জায়গার সংকটের কারণে অনেক শিক্ষার্থীকে ভর্তি করা সম্ভব হয় না। আরো জায়গা থাকলে এবং আগের মতো দুই শিফটে ক্লাস চালু করা গেলে আরো শিক্ষার্থীকে ভর্তি করা সম্ভব হতো।”
শিক্ষকদের মতে, শিক্ষার্থীদের সাফল্যের পেছনে তাঁদের বাড়তি পরিশ্রমের পাশাপাশি অভিভাবকদের সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বৃত্তির ফলেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরেও শ্রীমঙ্গলের ৪৫টি সরকারি-বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১২৯ জন প্রাথমিক বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে চন্দ্রনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছিল ৩৪ জন। ওই অনুষ্ঠানে বিদ্যালয়টির শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক পরিবেশনাও দর্শকদের প্রশংসা কুড়ায়।
প্রধান শিক্ষক জহর তরফদার বলেন, “কোনো পরিশ্রমের ফল সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যায় না। প্রয়োজন সময় ও ধৈর্য। আমাদের অতিরিক্ত পরিশ্রম তখনই সার্থক মনে হয়, যখন দেখি দেশের সবচেয়ে বেশি শাপলা কাব পাওয়ার গৌরব অর্জন করেছি কিংবা বৃত্তির ফলাফলে সরকারি বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে আমাদের অবস্থান সেরা হয়েছে।”
তিনি বলেন, “একুশ শতকের সুনাগরিক হিসেবে শিক্ষার্থীদের গড়ে তুলতেই আমাদের এ প্রয়াস। শুধু ভালো ফলাফল নয়, নৈতিকতা, সংস্কৃতি, শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের গুণাবলিও তাদের মধ্যে তৈরি করতে চাই।”
অন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও উদাহরণ দেওয়া হয়
শ্রীমঙ্গল উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, চন্দ্রনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি কিছুটা ব্যতিক্রমী। বিদ্যালয়ের জায়গা কম হলেও শিক্ষার্থী অনেক। বিশেষ করে প্রধান শিক্ষক শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি পরিশ্রম করেন।
তিনি বলেন, “আমরা বিভিন্ন সভা ও আলোচনায় এ বিদ্যালয়ের উদাহরণ দিই। এতে অন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও উৎসাহিত হচ্ছেন।”
রফিকুল ইসলামের মতে, বিদ্যালয়টির ভালো ফলাফলের পেছনে শিক্ষকদের পরিশ্রমের পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতনতা, বিদ্যালয়ের অবস্থান ও যোগাযোগব্যবস্থাও ভূমিকা রাখছে।
বিদ্যালয়টির সুনামের কথা শুনেছেন মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরীও। তিনি জানান, বিদ্যালয়টির সাংস্কৃতিক কার্যক্রমও দেখেছেন।
সংসদ সদস্য বলেন, “আমি বিদ্যালয়টি পরিদর্শনে যাব। তবে অন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও বলব, আপনারাও নিজ নিজ জায়গা থেকে ভালো কাজ করে সুনাম অর্জন করুন।”
শিক্ষার্থীসংখ্যা, কাব স্কাউটের সাফল্য, বৃত্তির ফলাফল ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি অভিভাবকদের সম্পৃক্ত করে পাঠদানের এ উদ্যোগ শ্রীমঙ্গলের চন্দ্রনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ব্যতিক্রমী করে তুলেছে। তবে বাড়তি শিক্ষার্থীকে সুযোগ দিতে জমির সংকট কাটানো এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সম্প্রসারণ এখন বিদ্যালয়টির অন্যতম চাহিদা।
সানা/আপ্র/৯/১০/২০২৬