বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী আজ। বিদ্রোহ, মানবতা, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার অমর কবিকে স্মরণ করতে রাজধানী ঢাকা ও ময়মনসিংহের ত্রিশাল, কুমিল্লা, চট্টগ্রামসহ সারা দেশে নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।
জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কবিতা আবৃত্তি, নজরুলসংগীত পরিবেশনা, পুস্তক প্রদর্শনী ও স্মরণানুষ্ঠানের মাধ্যমে কবির জীবন ও কর্মকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে। সরকারিভাবেও নেওয়া হয়েছে ব্যাপক কর্মসূচি। এ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী এক বছরকে ‘নজরুল বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
জাতীয় পর্যায়ের মূল অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হচ্ছে ত্রিশাল-এ। কবির স্মৃতিবিজড়িত এলাকায় অবস্থিত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ও নজরুল একাডেমি প্রাঙ্গণে দিনব্যাপী আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং নজরুলসংগীত পরিবেশনার আয়োজন করা হয়েছে।
রাজধানীতে বাংলা একাডেমি জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে সেমিনার, নজরুল পুরস্কার প্রদান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি-তে “দ্রোহের কবি, প্রাণের কবি” শিরোনামে তিন দিনব্যাপী বিশেষ আয়োজন পালিত হচ্ছে। এছাড়া নজরুল ইনস্টিটিউট-এর উদ্যোগেও বিভিন্ন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
গত শনিবার ত্রিশালে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের জাতীয় সত্তা, জাতীয় চেতনা ও জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রতীক। তিনি কবির জীবন ও কর্মকে বিশ্বপরিসরে আরো বিস্তৃতভাবে তুলে ধরার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে কবির স্মৃতিবিজড়িত ত্রিশালকে ‘নজরুল সিটি’ হিসেবে ঘোষণার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও পর্যটন বিভাগকে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে নজরুল গবেষণা ও কবির জীবনদর্শন বিষয়ে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে দুই গুণী ব্যক্তির হাতে নজরুল পদক ও সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়। পরে প্রধানমন্ত্রী নজরুল স্মরণিকার মোড়ক উন্মোচন করেন এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন।
নজরুল জাতীয় জাগরণের তূর্যবাদক ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের রূপকার: রাষ্ট্রপতি
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেছেন, নজরুল ছিলেন জাতীয় জাগরণের তূর্যবাদক ও আমাদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের রূপকার। কবি তার ক্ষুরধার লেখার মধ্য দিয়ে আমরণ শোষিত-নির্যাতিত ও বঞ্চিতদের অধিকারের কথা বলে গেছেন, করেছেন সকল অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ। তার এই বিপ্লবী ও অবিনাশী কণ্ঠস্বরের জন্য তিনি হয়ে ওঠেন ‘বিদ্রোহী কবি’।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে রোববার দেওয়া এক বাণীতে তিনি বলেন, ‘জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আমি ক্ষণজন্মা এ কবিকে পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি।’
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘সাম্য, মানবতা, দ্রোহ ও প্রেমের কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির উজ্জ্বলতম নক্ষত্র। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, সংগীতজ্ঞ, কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক। নজরুলের সৃজনশীল কর্ম বাংলা সাহিত্যে তো বটেই, বিশ্ব সাহিত্যেও বিরল। তার কালজয়ী সব লেখায় ঋদ্ধ হয়েছে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য।’
কাজী নজরুলের অমর সৃষ্টি শুধু নিজ ধর্ম, সমাজ-সম্প্রদায়, দেশ ও কালের গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকেনি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে সর্বদা গেয়েছে মানবতার জয়গান। কুসংস্কার আর অন্যায়ের সকল আবরণ বিদীর্ণ করে নতুন প্রেক্ষাপট ও ভিন্নতর ভঙ্গি তৈরির মধ্য দিয়ে কবি হয়ে উঠেছেন সকল সমাজের, সকল কালের। রাষ্ট্রপতি বলেন, নজরুলের অগ্নিঝরা কবিতা, প্রেরণাদায়ী গান ও বিদ্রোহী চেতনা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানসহ দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে অপরিসীম অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, সমাজের শোষণ-বঞ্চনা, বৈষম্য, অপশাসন ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে নজরুলের কালজয়ী কবিতা, গান ও সৃষ্টি অনাদিকাল আমাদের অনুপ্রেরণা, শক্তি ও সাহস জোগাবে। আমি আশা করি, নজরুলের আদর্শ ও চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আমরা দেশপ্রেম, সততা ও নিষ্ঠার সাথে একটি সাম্য, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশ গঠনে দ্রুত এগিয়ে যেতে সক্ষম হবো।’ রাষ্ট্রপতি চিরঞ্জীব কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান ও তার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন।
অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কবি নজরুল আমাদের প্রধান পাথেয়: প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, মাতৃভূমিকে ভালোবাসার ক্ষেত্রে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের অন্যতম প্রধান দিশারি। আমাদের জীবন, আশা-আকাক্সক্ষা, স্বপ্ন, সংগ্রাম, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য তাঁর রচনার মধ্যে মহিমাময় সৌন্দর্যে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, ‘তাঁর সৃষ্টিশীলতার মধ্যে আতিথ্য আছে সকল কালের সকল মানুষের। অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষেত্রে তিনি আমাদের প্রধান পাথেয়। তাঁর প্রাসঙ্গিকতা ও প্রয়োজন কখনো ফুরানোর নয়।’
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকীতে উপলক্ষ্যে রোববার দেওয়া এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের জনগণের পরম প্রিয়জন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকীতে তাঁর চির-অম্লান স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানান। অনিঃশেষ কৃতজ্ঞতার সঙ্গে তিনি তাঁকে স্মরণ করে তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের জাতীয় ইতিহাসের অবিস্মরণীয় নাম কাজী নজরুল ইসলাম। পরাধীন, পর্যুদস্ত, পরাভূত জাতির ভাগ্যাকাশে তাঁর আবির্ভাব ছিল আলোকবর্তিকার মতো। দিকনির্দেশক বাতিঘরের মতো। মুমূর্ষু জাতিকে জাগিয়ে দিয়ে সামগ্রিকভাবে সচেতন করার জন্য, স্বয়ংসম্পূর্ণ করার জন্য যেÑ সর্বপ্লাবী প্রতিভার তখন দরকার হয়ে পড়েছিল, জাতীয় কবি ছিলেন সেই প্রার্থিত ও বহু কাক্সিক্ষত প্রতিভা।’
তিনি বলেন, কাজী নজরুল ইসলামের পুরো জীবনটাই যেন ছিল এক যুদ্ধ ঘোষণা। একটি অনন্যসাধারণ বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহ ঔপনিবেশিক শাসন, পরাধীনতা, জুলুম, নির্যাতন, শোষণ, অসাম্য, বৈষম্য, কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে; তথা সকল অন্যায়, অবিচার ও অসুন্দরের বিরুদ্ধে।
মানুষ, মানবতা, স্বাধীনতা, শোষণমুক্ত সমাজ ও নারীমুক্তির জন্য তাঁর চেয়ে বেশি শিল্পসফল শব্দ আর কেউ রচনা করেননি উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘তিনিই আমাদের প্রথম কবি, সাংবাদিক, রাজনীতিক যিনি ঔপনিবেশিক পরাধীনতার বিরুদ্ধে উপমহাদেশের পূর্ণ স্বাধীনতা দাবি করেন। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে মানুষের প্রতি তাঁর যে দরদ ও দীপ্ত অঙ্গীকার তা তুলনাহীন।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে তাঁর কবিতা ও গান যেমন ছিল অনুপ্রেরণার প্রবল উৎস, তেমনই আমাদের সকল আন্দোলন-সংগ্রামে তাঁর সৃষ্টিশীলতাই হয়ে ওঠে প্রতিবাদ প্রতিরোধের মূল ভাষা। তিনি আমাদের যাপিত জীবনের অনিবার্য অংশ। বাংলা কাব্য-সংগীতে তাঁর আবির্ভাব ছিল ধূমকেতুর মতো বিস্ময়ময় ও অভূতপূর্ব। মাত্র দুই দশকের সাধনা দিয়ে তিনি জাতিকে করে গেছেন আত্মপ্রত্যয়ম-িত। নির্মাণ করে দিয়ে গেছেন জাতীয় সাহিত্য-সংস্কৃতির পাটাতন। সত্যিকার অর্থেই তিনি জাতীয় রেনেসাঁর নিশানবরদার। আবার তিনি বাংলাদেশের জাতীয় কবি হয়েও সারা পৃথিবীর নিঃস্ব, রিক্ত মজলুম মানুষের আত্মার আত্মীয়।’
বাংলাদেশ ও কাজী নজরুল ইসলাম এক অবিভাজ্য সত্তা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তিনি বিশ্ব কবিসভারও গুরুত্বপূর্ণ নায়ক। তিনি আমাদের জাতীয় সত্তার সার্থক প্রতিনিধি, আমাদের জাতীয় চেতনার প্রতীক। আমাদের জাতীয়তাবাদের পথিকৃৎ। জাতীয় কবির জন্মদিনে আমরা অন্যায়, অবিচার, ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও বিভেদের গ্লানি মুছে ফেলে সবার আগে বাংলাদেশকে ধারণ করে, আমাদের স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে, সুখি-সমৃদ্ধ গণতান্ত্রিক মাতৃভূমির জন্য নিজেদের নিবেদিত করাই হোক আমাদের প্রত্যয়।’
মানুষের প্রেরণার উৎস
সম্প্রতি গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কাজী নজরুল ইসলামকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ১৮৯৯ সালের ২৪ মে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া নজরুল বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচিত। কবিতা, গান, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ ও সাংবাদিকতায় তিনি রেখে গেছেন অনন্য অবদান।
শৈশব-কৈশোর-তারুণ্যের জীবনের পরতে পরতে সংগ্রাম করতে হয়েছে তাঁকে। জড়িয়েছিলেন নানা পেশায়। ১৯১৭ সালে যোগ দেন সেনাবাহিনীতে। অংশ নেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধেও।
১৯২২ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত কবিতা বিদ্রোহী বাংলা সাহিত্যে নতুন ধারার সূচনা করে। একই সঙ্গে তিনি প্রায় সাড়ে তিন হাজার গান রচনা ও সুরারোপের মাধ্যমে বাংলা সংগীতকে সমৃদ্ধ করেছেন। সাম্য, মানবতা, প্রেম, প্রতিবাদ ও ধর্মীয় সম্প্রীতির বাণী তাঁর সাহিত্য ও সংগীতের প্রধান উপজীব্য।
১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে সপরিবারে আনা হয় কবিকে। দীর্ঘ অসুস্থতার পর ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর ইচ্ছানুসারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ-এর পাশে কবিকে সমাহিত করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বিশ্বে বৈষম্য, বিদ্বেষ ও ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা যখন উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে, তখন কাজী নজরুল ইসলামের সাম্য, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িকতার দর্শন নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। তাঁর জীবন ও সাহিত্য আজও কোটি মানুষের প্রেরণার উৎস হয়ে আছে।
নজরুলের সৃষ্টিকর্ম
নজরুলের প্রথম গদ্য রচনা ছিল “বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী”। ১৯১৯ সালের মে মাসে এটি সওগাত পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সৈনিক থাকা অবস্থায় করাচি সেনানিবাসে বসে এটি রচনা করেছিলেন। এখান থেকেই মূলত তাঁর সাহিত্যিক জীবনের সূত্রপাত ঘটেছিল। এখানে বসেই বেশ কয়েকটি গল্প লিখেছেন। এর মধ্যে রয়েছে: হেনা, ব্যথার দান, মেহের নেগার, ঘুমের ঘোরে।
১৯২২ সালে নজরুলের একটি গল্প সংকলন প্রকাশিত হয় যার নাম ব্যথার দান- এছাড়া একই বছর প্রবন্ধ-সংকলন যুগবাণী প্রকাশিত হয়। ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসে কুমিল্লা থেকে কলকাতা ফেরার পথে নজরুল দুটি বৈপ্লবিক সাহিত্যকর্মের জন্ম দেন। এই দুটি হচ্ছে বিদ্রোহী কবিতা ও ভাঙ্গার গান সঙ্গীত। এগুলো বাংলা কবিতা ও গানের ধারাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল। বিদ্রোহী কবিতার জন্য নজরুল সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। একই সময় রচিত আরেকটি বিখ্যাত কবিতা হচ্ছে কামাল পাশা- এতে ভারতীয় মুসলিমদের খিলাফত আন্দোলনের অসারতা সম্বন্ধে নজরুলের দৃষ্টিভঙ্গি এবং সমকালীন আন্তর্জাতিক ইতিহাস-চেতনার পরিচয় পাওয়া যায়। ১৯২২ সালে তাঁর বিখ্যাত কবিতা-সংকলন অগ্নিবীণা প্রকাশিত হয়। এই কাব্যগ্রন্থ বাংলা কবিতায় একটি নতুনত্ব সৃষ্টিতে সমর্থ হয়, এর মাধ্যমেই বাংলা কাব্যের জগতে পালাবদল ঘটে। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে এর প্রথম সংস্করণ শেষ হয়ে গিয়েছিল। পরপর এর কয়েকটি নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হয়। এই কাব্যগ্রন্থের সবচেয়ে সাড়া জাগানো কবিতাগুলোর মধ্যে রয়েছে: প্রলয়োল্লাস, আগমনী, খেয়াপারের তরণী, শাত-ইল্-আরব, বিদ্রোহী, কামাল পাশা ইত্যাদি। এগুলো বাংলা কবিতার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। নজরুলের শিশুতোষ কবিতা বাংলা কবিতায় এনেছে নান্দনিকতা-খুকি ও কাঠবিড়ালি, লিচু-চোর, খাঁদু-দাদু ইত্যাদি তারই প্রমাণ।
বাংলা কাব্যে কাজী নজরুল এক নতুন ধারার জন্ম দেন। এটি হল ইসলামী সঙ্গীত তথা গজল, এর পাশাপাশি তিনি অনেক উৎকৃষ্ট শ্যামা সংগীত ও হিন্দু ভক্তিগীতিও রচনা করেন। নজরুল প্রায় ৩৫০০ গান রচনা এবং অধিকাংশে সুরারোপ করেছেন যেগুলো এখন নজরুল সঙ্গীত বা “নজরুল গীতি” নামে পরিচিত এবং বিশেষ জনপ্রিয়। এছাড়া দোলনচাঁপা বিংশ শতাব্দির প্রথমার্ধে কবি কাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ। এটি ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে (আশ্বিন, ১৩৩০ বঙ্গাব্দ) আর্য পাবলিশি হাউস থেকে প্রকাশিত হয়। ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দের দুর্গাপুজোর আগে ধুমকেতু পত্রিকায় নজরুলের ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ নামে বিদ্রোহাত্মক কবিতাটি প্রকাশের জন্য তাঁকে রাজদ্রোহের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। অভিযুক্ত কবিকে ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ জানুয়ারি এক বৎসর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে প্রেসিডেন্সি জেলে রাখা হয়। এই সময় দোলনচাঁপা কাব্যের কবিতাগুলি রচিত হয়। জেল কর্তৃপক্ষের অগোচরে পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় ওয়ার্ডারদের সাহায্যে তাঁর সব কবিতাই বাইরে নিয়ে আসেন। কবির নির্দেশমত আর্য পাবলিশিং হাউস এ কবিতাগুলো দিয়ে দোলনচাঁপা প্রকাশ করে। প্রথম সংস্করণ এই কাব্যগ্রন্থে ১৯টি কবিতা ছিল। সূচিপত্রের আগে মুখবন্ধরূপে সংযোজিত কবিতা “আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে” ১৩৩০ বঙ্গাব্দের (১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দ) জ্যৈষ্ঠ মাসের কল্লোল পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। দোলনচাঁপা কাব্যগ্রন্থের পরবর্তী সংস্করণে ৫০ টি কবিতা সংকলিত হয়।
সানা/আপ্র/২৫/৫/২০২৬