চারুশিল্পী, নাট্যনির্দেশক, শিল্পগবেষক, পাপেট আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ এবং দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের উজ্জ্বল নক্ষত্র মুস্তাফা মনোয়ারকে গান, কবিতা, স্মৃতিচারণ ও আলোচনার মধ্য দিয়ে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেছেন তাঁর সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী, শিল্পী ও সংস্কৃতিজনেরা। তাঁর শিল্পদর্শন, সৃজনশীলতা, মানবিকতা এবং নতুন প্রজন্মের জন্য রেখে যাওয়া সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের কথা উঠে আসে স্মরণানুষ্ঠানের প্রতিটি পর্বে।
শুক্রবার (১০ জুলাই) সন্ধ্যায় রাজধানীর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে মুস্তাফা মনোয়ারের জীবন ও কর্মকে ঘিরে নানা স্মৃতি, অভিজ্ঞতা ও মূল্যায়ন তুলে ধরেন দেশের বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা।
জাতীয় নাট্যশালার মূল মিলনায়তন প্রাঙ্গণে তাঁর প্রতিকৃতিতে ফুলের পাপড়ি অর্পণ ও মোমবাতি প্রজ্বালনের মাধ্যমে জানানো হয় শ্রদ্ধা। পাশাপাশি ছিল তাঁর আঁকা চিত্রকর্ম, আলোকচিত্র এবং দীর্ঘ কর্মজীবনের নানা স্মারক নিয়ে বিশেষ প্রদর্শনী।
প্রদর্শনীতে স্থান পায় তাঁর সৃষ্ট জনপ্রিয় পাপেট চরিত্র—মন্ত্রী, গিট্টু, রাজা, বাঘা, মেনি, কুশ্রী ছানা, বাউল, শিক্ষক, ষাঁড়, বকর, পণ্ডিত ও ড্রাগন। দর্শনার্থীদের কাছে এগুলো যেন আবারও ফিরিয়ে আনে বাংলাদেশের পাপেট শিল্পের এক স্বর্ণালি সময়।
অনুষ্ঠানের শুরুতে সংক্ষেপে তুলে ধরা হয় মুস্তাফা মনোয়ারের বর্ণাঢ্য জীবন, শিল্পসাধনা এবং দেশের চারুকলা, টেলিভিশন, নাট্যচর্চা ও পাপেট আন্দোলনে তাঁর অসামান্য অবদানের কথা।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু বলেন, মানুষের মৃত্যু হলেও মুস্তাফা মনোয়ারের মতো সৃষ্টিশীল মানুষের মৃত্যু হয় না। তিনি সরাসরি শিক্ষক না হলেও তাঁর কাজ থেকে তিনি আজও শিখছেন এবং ভবিষ্যতেও শিখবেন। তাঁর ভাষায়, মুস্তাফা মনোয়ার তাঁর সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে হাজারো মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছেন এবং ভবিষ্যতেও করে যাবেন। তিনি ‘জীবনের জন্য শিল্প’ ও ‘লড়াইয়ের জন্য শিল্প’—এই দর্শনকে ধারণ করতেন।
মুস্তাফা মনোয়ারের সহধর্মিণী মেরি মনোয়ার আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, ৬১ বছরের জীবনের সঙ্গীকে স্মরণ করতে এত মানুষের একত্র হওয়া তাঁদের পরিবারের জন্য গভীর ভালোবাসার প্রকাশ। তিনি বলেন, বাইরে কোথাও গেলে অসংখ্য মানুষ তাঁকে ঘিরে ধরতেন, ছবি তুলতেন। আজও সেই ভালোবাসা অটুট রয়েছে। এজন্য উপস্থিত সবাইকে তিনি কৃতজ্ঞতা জানান।
টেলিভিশন ডিরেক্টরস গিল্ডের বর্তমান সভাপতি অভিনেতা শহীদুজ্জামান সেলিম বলেন, মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। দেশের সব নির্মাতার পক্ষ থেকে তিনি এই গুণী শিল্পীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
নৃত্যশিল্পী শামীম আরা নিপা বলেন, মুস্তাফা মনোয়ার আকাশের মতো—যাঁর কোনো ক্ষয় নেই; যাঁকে ছোঁয়া না গেলেও অনুভব করা যায়। আশির দশকের শুরু থেকে তাঁর সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন অসাধারণ সাহসী, কাজের প্রতি অত্যন্ত নিষ্ঠাবান, সৃজনশীল এবং খুঁতখুঁতে। তিনি সব সময় প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে নতুন কিছু করতে চাইতেন।
অভিনেতা আফজাল হোসেনের সঞ্চালনায় আয়োজিত স্মরণানুষ্ঠানে আরও স্মৃতিচারণ করেন চিত্রকর ও কার্টুনিস্ট রফিকুন নবী, অভিনেতা আব্দুল আজিজ, কেরামত মওলা, মনিরুজ্জামান, তারিক আনাম খান ও হাবিবুল আলম।
দীর্ঘদিন নানা শারীরিক জটিলতায় ভোগার পর গত ২৯ জুন রাজধানীর একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন মুস্তাফা মনোয়ার। তাঁর মৃত্যুতে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, স্মরণানুষ্ঠানে বক্তারা বারবার সেই অপূরণীয় ক্ষতির কথাই তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তাঁরা বলেন, মুস্তাফা মনোয়ার তাঁর শিল্প, সৃজনশীলতা ও সাংস্কৃতিক দর্শনের মধ্য দিয়েই প্রজন্মের পর প্রজন্ম বেঁচে থাকবেন।
সানা/আপ্র/১০/৭/২০২৬