ঋষিণ দস্তিদারেন গুচ্ছকবিতা
টাউনশিপ
গভীর আদিবাসী ছায়াবন
সবুজ ছিঁড়ে উপড়ে ফেলেছে
অনেক অভিবাসী মুঠি।
পাহাড়ের কঙ্কাল পড়ে আছে
বুকে লক্ষ দাঁতের দাগ-আঁচড়
গাছে গাছে কুঠার ও কষ
অদূরেই নয়া টাউনশিপ-
মাটিতে ভরাট পথ রিসোর্ট
বাজার নতুন কালভার্টে
ঝিরি বুজে গেছে।
আগুন জ্বেলে চারপাশে
গোল হয়ে বসেছে সভ্যতা
ঘন জঙ্গলের বুক কেটে
একটুকরো সমতলে ক্যাম্প;
সেদ্ধ ভাজা ঝলসানো পাখিমাংস
চিবিয়ে নিচ্ছে টুকরো
কুড়মুড়িয়ে ভাঙছে হাড়গোড়
কবজির নিচে গড়াচ্ছে
স্বাদু রস আশ্লেষে
গানে হাসিতে খানখান নির্জন আঁধার।
তখন, শীত নামার আগেই
শুকনো থমধরা আকাশ
নীলচে হিমের জাদুতে স্থির
সন্ধ্যার মৃত চাঁদ অই আবছায়া-
দলছুট সাদা পেট ধূসর ডানা
পাহাড় টপকে অভ্যাসে
চেনা পথে একা উড়ে গিয়ে
আবার ফিরে আসে, নিঃস্ব।
তার মাতম বেদনার স্বর
পালকের নিচে উত্তুঙ্গ কম্প
চুপচাপ মেনে নিতে হয়
যা যা দেখা ও শোনা
আসর থেকে আর ব্যাখ্যা করা যায় না
কোনো জিজ্ঞাসাই নয়-
আলোর রেণু ধুলো সরিয়ে
বাতাসের খোসা ছড়িয়ে রাখছে রাত
মনোযোগী, ঠান্ডা ছুরির ফলায়।
বৃষ্টি
মহাজাগতিক ইশারায় দেখছিলে শহর
সাবধানে দূর হতে মেপে নিলে চাকা ও চলাচল
ভ্যাপসা রেণুর ওড়াউড়ি, এখানে অস্বস্তি
কোথাও স্লোগান নেই তোমার জন্য
আগুন মুছে দিতে পারে এমন কালো মেঘ
অথবা ছায়াহটানো কেঁপে ওঠা রোদ
ঠিকানা নেই, গলিতে ফুটপাতে আহত রাস্তায়।
ভিড় ঠেলে হাঁটছি ক্ষুধাতপ্ত
বেড়িবাঁধে তুচ্ছ গা-রিরি হাওয়া
পিঠ ঝলসে দেয় মেরিনড্রাইভ বৈভব
নোংরা বালিয়াড়ি বোতলে প্যাকেটে
জড়িয়ে পড়ছে গতি; ডাকছি মনে মনে
ডাকছি গলা ছেড়ে: বেহাত সমুদ্র, আয় আয়।
কিন্তু নেমে এলে নীলিমা ছিঁড়ে চকিত বৃষ্টিবিন্দু
ভিখারির বুকে অনেক ফোঁটা অচল পয়সা
ছড়াতে হারাতে-অতলে নিয়ে যেতে চিহ্নসন্ধানে
ঘামে নোনতা বাঁচা ধুয়ে ক্লিন্ন মাছ
যেথায় ধুকপুক; মরে পড়ে থাকে যন্ত্রণায়
আর ইতিহাস লেখে জেলেনৌকা, নিম্নবর্গীয়।
হ্যাপেনিং
গান ভেবে তুমি যা লিখছ
রূপকল্প একগোছা
বসাচ্ছ শব্দের পর শব্দ
লাইনের ওপরে কথার কামরা
ছন্দ ঠিক করে নিলেই ঝিকঝিক
তুরুকসওয়ার মেলোডি-
ভাবছ তোফা, তবে তো হয়েই গেল
চাপাও উদ্যম খাপখোলা
যন্ত্র টেনে তোলা সুর
তারে গলায় সাধো
রেওয়াজে আওয়াজে
রাত পোহালেই স্টুডিও
বাজার বলছে, হ্যাপেনিং!
লাখো লাখো ভিউ
কাটতি ঠোঁট চেটে
গর্ব থরথর তুমি যা ভাবছ
দরকারি সফল ফটোগ্রাফ-
ঘরে ঘরে তাই
হাতুড়ি লাগাচ্ছে ঘা
পেরেক ঢুকছে গর্তে
তালে তালে শব্দ বাজছে
প্রতিধ্বনি ভরপুর ধুলায়
আর দেয়ালের কষ্ট হচ্ছে জেনে
গানটা ভুলে যাচ্ছে সবাই।
দেশ
চমৎকার এক দেশ ফেলে এসেছে
ফসলের খেত আলপথ পাশে নদী
মাটিলেপা উঠান পুকুর লাউমাচা
পেছনে ফেলেছে সে- আলো হাসি কান্না
নরম সকাল সোনাচাঁপা ঘ্রাণ
কলরব, বিজনে পানপাতা মুখ
আর ঘোরলাগা অশ্রুময়ী চর—
এসব মিলেই তার দেশ
সে ছেড়ে এসেছিল তোমার শহরে।
হেঁটে যাচ্ছে অবিকল ভঙ্গিমা
ঝাঁকা মাথায় রাস্তার ফেরিওয়ালা
‘বুজ্ঞাদা! কই যাবে?’ আনমনে ফিসফিস
মায়ের অস্পষ্ট গলা আটতলায়
দুপুরের রোদ রক্তজবায় ঝরে
জানালায় চিবুক বিমর্ষ বাবা
শিরা ওঠা অস্থির দুহাত
‘বিশ্বাস কর, ধলাকাকার মুখ!
অন্ধকারে হেমসেন লেনের গভীরে
গ্যাসবেলুন গাড়ি ঠেলে নেয়’-
আদতে কে কাকে ছেড়ে আসে, যায়
ফুল ও বেলুন, মানুষ বা দেশ তাই
মায়ায় মীমাংসায় যেন ফেরার সকলেই।
এমনই আফসোস রেখে গেছে
রোদ-বৃষ্টি-ঝড়ে শীতের ফুটপাতে
ইটের নগরে আগন্তুক পায়ে
পথে পথে দিনে বহু রাতে
আরও কত মানুষের চোখে
তুলে রাখা অব্যর্থ স্মরণ
একেকটা দেশের গল্প নিভে আছে।
ক্ষুধা মারি রিকশায় ভ্যানে সওয়ারি
খাটুনির ঘাম রক্ত হাহাকার
স্টেশনে বস্তিতে ঘাটে ঘুমহীন
শ্রান্ত, পড়ে থাকে তন্দ্রালু ভোরে-
আজও শিসে শিসে
এক দোয়েল তাকে ছিন্নভিন্ন করে
বিহ্বল দূরের শহরে।
আলস্য
বাহার ভেসে গেলে
টুকরো আকাশ নীল
শুয়ে দেখে মেঘ
বিশ্রাম ভরশূন্য জানে
আটপৌরে অলস-
পাপড়ির কাছে পাতা
পিঁপড়ের পায়ে দ্রুতি
কাগজ, ছিন্ন রঙিন
ভ্রমণ উড়ে গেলে
ধুলো খেলে একা-
এক উদাসী পালক।
চিত্তক্ষোভ
মোঃ রহমত আলী
কী দেখতে চাও? পরাণ কি খুলে দেবো?
কিছু কি বুঝতে পারবে, না দেখতে পারবে!
চোখের সাগরে ডুব দাও বন্ধু,
কত কী প্রমাণ আজও জ্যান্ত।
কী জানতে চাও? কান পেতে আছ যে;
হৃদয়ের স্পন্দনে যদি কিছু শুনতে পাও।
কী বুঝলে বন্ধু? জীবনের গল্প থেকে;
না বেদনার কাব্য পড়ে, যদি বলতে খুলে!
শোনাও তোমার বর্ণনা, অশ্রু কেন ঝরে না।
কী খেলা খেলবে আবার, দুঃখের কথা শুনে;
আনন্দিত হয়ে কি লাগাইবে আগুন ফাগুনে?
নাকি উৎসব করিবে কাকের ভেঙেছে বাসা!
কী দেখো না তোমরা, চোখ থাকতেও চোখে,
অন্যায়কারী যে স্বাক্ষর রেখেছে এঁকে।
কী মনে হয় বন্ধু? ভাগ্যের নির্মম পরিহাস;
নাকি জীবন আঁধারে ঘেরা করুণ ইতিহাস!
এ নয় কোনো উপন্যাস, এ জীবন্ত চিত্তক্ষোভ;
কী আরো দেখার আছে বাকি; না জানার?
ধারালো বক্ররেখা
তানিম কবির
এলোমেলো বক্ররেখায় যত হই প্রতিষ্ঠিত
তখনই চক্রাকার এক প্রণয়ের ঘূর্ণিবলয়
সীমাহীন অর্থ থেকে অসীমের ঘূর্ণনে দেয়
মিশিয়ে অভীষ্ট খাদ
সিসিফাস আবার যাবে সমতলশূন্য চূড়ায়
এ ভীষণ অনর্থ ফের
শুরু থেকে বিনির্মাণের ফাঁদে পড়া চাঁদের
আলোয়
দেখাবে বিধৌত আর শোনাবে মরচে পড়া
বিরহের জিয়নকাঠি প্রবাহিত ইচ্ছামাফিক
ফিরে হই মরণকাঠি
ঘিরে হই বিস্মরণের ভূমিষ্ঠকালীন ক্রিয়ার
গোলাকার চিহ্ন এবং
সবিশেষ বক্ররেখায় চেপে বসি নিয়মসিদ্ধ
সমূহ বর্তুলাকার সে রেখায় বিদ্ধকারী।
উদ্বেগ
শাহীনা সোবহান
নদী আর স্রোতস্বিনী নেই।
আকাশ বৃত্তের দাস
চলন্ত অ্যাকসিলারেটর নির্দিষ্ট চৌকাঠে।
আবদ্ধ ক্ষেত্র
ভয় আর শঙ্কার ডমরু।
পীড়িত দুরন্ত পাখি
সংশয়ে সাহস
নিষ্প্রভ শূন্যতা!
নিজস্ব স্রোতস্বতী
একাকী লুকোচুরি—
অদ্ভুত ভুতুড়ে খাঁচা ভেঙে
দুর্বার জলযান।
বোধ ও বাসনা
মেহমুদ খোকন
একটি বিভ্রম
ঠিক প্রজাপতির মতো না
যখন-তখন এই একটি বিভ্রম।
তুমি তা ভালো করেই জানো।
তোমার চোখের পাতায়,
তোমার চলে যাবার পথে
তোমার আঘাতে অথবা
তোমার অবহেলায়।
একটি বিভ্রম
আমার কাছে ভালোবাসার মতো।
লাল জুলাই
মাহজাবীন তাসনীম রুহী
জুলাই মানে রক্তমাখা রাজপথের অগ্নিগাথা,
অন্যায়ের বিরুদ্ধে জেগে ওঠা মানুষের বার্তা।
জুলাই মানে বুকের ভেতর স্বাধীনতার ডাক,
ভয়কে মাড়িয়ে এগিয়ে চলার অটল শপথ।
জুলাই মানে প্রতিবাদের অগ্নিমুখর কণ্ঠস্বর,
শত শহীদের রক্তে লেখা স্বৈরাচারের অন্তর।
জুলাই মানে আবু সাঈদের সাহসী উচ্চারণ,
জীবন দিয়ে মাথা নত না করাই তো কারণ।
জুলাই মানে ‘পানি লাগবে?’ মুগ্ধর মমতা,
রক্তাক্ত পথেও মানুষ হয়ে থাকার অঙ্গীকারটা।
জুলাই মানে মায়ের চোখে অশ্রুভেজা রাত,
তবুও সন্তানের স্বপ্নে জ্বলে মুক্তির প্রভাত।
জুলাই মানে বোনের হাতে প্রতিবাদের পতাকা,
ভাইয়ের রক্তে লেখা নতুন ইতিহাসের আঁকা।
জুলাই মানে বুলেটবিদ্ধ তবু অদম্য সব প্রাণ,
অন্ধকার ভেদ করে জ্বালায় আশার দীপদান।
জুলাই মানে শপথ রক্ত যেন বৃথা না যায়,
ন্যায়ের পথে বাংলার মানুষ চিরকাল দাঁড়ায়।
স্মৃতির পাতায় তাদের নাম জ্বলুক অনির্বাণ,
লাল জুলাইয়ের প্রতিটি ক্ষণ হোক চির অম্লান।
কেএমএএ/আপ্র/০৩.০৭.২০২৬