জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে দুই দিনব্যাপী ‘নজরুল-উৎসব ১৪৩৩’-এর সূচনা হয়েছে ছায়ানট মিলনায়তনে। গান, কবিতা, আবৃত্তি ও নৃত্যগীতের সমন্বয়ে শুক্রবার (৫ জুন) সন্ধ্যায় উৎসবের প্রথম দিনের আয়োজন প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় শুরু হওয়া অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী পরিবেশনা ছিল ছায়ানটের শিল্পীদের নৃত্যগীত ‘স্নিগ্ধ শ্যাম কল্যাণ রূপে’। এরপর স্বাগত বক্তব্যে ছায়ানটের সহসভাপতি খায়রুল আনাম শাকিল জাতীয় কবির জীবন, সাহিত্যকর্ম, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং বাংলা সংস্কৃতিতে তাঁর অনন্য অবদানের কথা তুলে ধরেন।
খায়রুল আনাম শাকিল বলেন, অবিভক্ত বাংলার একটি দরিদ্র মুসলিম পরিবারে জন্ম নিয়েও নজরুল তাঁর অসাধারণ সংবেদনশীলতা ও জ্ঞানপিপাসার মাধ্যমে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অমূল্য অবদান রেখে গেছেন। বাংলা সংগীতে রবীন্দ্রনাথের থেকে ভিন্ন এক ধারায় তিনি শাস্ত্রীয় সংগীতের খেয়াল, ঠুমরি, গজলসহ নানা সুরধারার সমন্বয় ঘটিয়েছেন।
তিনি আরো বলেন, নজরুল ছিলেন এমন এক কবি, যিনি বাঙালির হিন্দু ও মুসলমান—উভয় সাংস্কৃতিক সত্তাকে আত্মস্থ করেছিলেন। দীর্ঘ নীরবতার মধ্যেও তাঁর মানবিক ও উদার চেতনা বাঙালি জাতিসত্তার পথপ্রদর্শক হয়ে থেকেছে। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বিভিন্ন ঐতিহাসিক পর্যায়ে তাঁর সৃষ্টিকর্ম জাতিকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।
বর্তমান বৈশ্বিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে নজরুলচর্চার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে সংঘাত, বিভাজন ও অসহিষ্ণুতা বেড়ে চলেছে। এমন সময়ে নজরুলের মানবিক, অসাম্প্রদায়িক ও সমন্বিত চেতনার গভীর চর্চা সমাজকে উত্তরণের পথ দেখাতে পারে। নতুন প্রজন্মকে তাঁর সাহিত্য ও সংগীতের সঙ্গে নিবিড়ভাবে পরিচিত করা গেলে তারা আত্মপরিচয়ে আরো দৃঢ় ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবে।
স্বাগত বক্তব্যের পর পরিবেশিত হয় ‘সপ্তগীতির মালায় গাঁথা নজরুলের স্বদেশবার্তা’। দেশাত্মবোধক গান, কবিতা ও পাঠের সমন্বয়ে সাজানো এই পর্বে অংশ নেন আবৃত্তিশিল্পী ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়, ডালিয়া আহমেদ, আশরাফুল হাসান বাবুসহ অন্যরা। খায়রুল আনাম শাকিল ও ডালিয়া আহমেদের যৌথ পাঠও দর্শকদের মুগ্ধ করে।
ছায়ানটের শিল্পীরা দলগতভাবে পরিবেশন করেন ‘বল ভাই মাভৈঃ মাভৈঃ’, ‘জাগো অনশন বন্দি ওঠ রে যত’ এবং ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’। একক সংগীত পরিবেশন করেন শ্রাবন্তী ধর, প্রমিতা দে, মিরাজুল জান্নাত সোনিয়া, প্রিয়ন্তু দেব, শর্মিষ্ঠা দাশসহ একাধিক শিল্পী।
উৎসবের প্রথম দিনের বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে আমন্ত্রিত দল সরকারি সংগীত মহাবিদ্যালয় সমবেত কণ্ঠে পরিবেশন করে ‘শঙ্কা শূন্য লক্ষ কণ্ঠে’ ও ‘মধুকর মঞ্জীর বাজে’।
অনুষ্ঠানের পরবর্তী পর্বে রুদ্র দাস, ছন্দা চক্রবর্তী, সুমন মজুমদার, নাসিমা শাহীন ফ্যান্সী, ইয়াসমীন মুশতারী ও প্রিয়াঙ্কা গোপ একক সংগীত পরিবেশন করেন। ছায়ানটের শিল্পীদের নৃত্যগীত ‘মনের রঙ লেগেছে’ এবং সমবেত কণ্ঠে ‘ঝড় এসেছে ঝড় এসেছে’ ও ‘তোরা দেখে যা আমিনা’ দর্শকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে।
সংগীতশিল্পী ফেরদৌস আরা পরিবেশন করেন ‘কে বিদেশি বন-উদাসী’। আর ছন্দা চক্রবর্তীর কণ্ঠে ‘ভীরু এ মনের কলি’ গানটির মধ্য দিয়ে শেষ হয় উৎসবের প্রথম দিনের আয়োজন।
উৎসবের দ্বিতীয় ও সমাপনী দিনের অনুষ্ঠান শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় শুরু হবে। মিলনায়তনে সরাসরি উপস্থিতির পাশাপাশি অনুষ্ঠানটি ছায়ানটের সরকারি ফেসবুক পৃষ্ঠা ও ইউটিউব চ্যানেলে সরাসরি সম্প্রচার করা হচ্ছে।
সানা/আপ্র/৬/৬/২০২৬