গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

মেনু

ছোটগল্প===

নীরবে পোড়া মন

খান মুহঃ আশরাফুল আলম

খান মুহঃ আশরাফুল আলম

প্রকাশিত: ২১:০৪ পিএম, ১৭ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ২১:৩৫ এএম ২০২৬
নীরবে পোড়া মন
ছবি

ছবি সংগৃহীত

হেমন্তের ম্লান বিকেলটা যখন ঢাকা শহরের আকাশজুড়ে এক চিলতে ছাই-রঙা বিষণ্নতা ছড়িয়ে দিয়ে বিদায় নেয়, ফার্মগেটের পুরনো ফ্ল্যাটটিতে তখন এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসে। চারপাশের ব্যস্ত রাস্তার হর্ন, ধুলাবালি আর দূর থেকে ভেসে আসা মেট্রোরেলের মৃদু ঘড়ঘড় শব্দ এই ঘরের দেয়ালগুলোতে এসে ধাক্কা খেয়ে ফিরে যায়। ভেতরটা একদম নিথর- যেন বাইরের চঞ্চল শহরের সঙ্গে এ কক্ষের কোনো সংযোগই নেই।
জানালার পাশে কাঠের ইজিচেয়ারে চুপচাপ বসে আছেন সত্তর-ঊর্ধ্ব শাহানা আক্তার। এককালে টানটান চামড়ার যে হাত দুটো সংসারের হাজারো কাজ অবলীলায় সামলে নিত, আজ তা কুঁচকে গেছে; সেখানে স্পষ্ট নীল শিরার নকশা। তার কোলের ওপর পড়ে আছে একটি বহু পুরনো, পাতা-হলদে হয়ে যাওয়া চামড়ায় বাঁধানো ডায়েরি। চোখের দৃষ্টি আগের চেয়ে অনেক ঘোলাটে হয়ে এসেছে। কিন্তু এই ডায়েরির প্রতিটি পাতা ওল্টালেই তার মনের ভেতরের ছবিগুলো নিখুঁত ও জীবন্ত হয়ে ভেসে ওঠে। শাহানার এই একা বসে থাকার অসুখটাকে তার ছেলে আরহান নাম দিয়েছে ‘স্মৃতিবিলাস’। কিন্তু শাহানা জানেন, এটি বিলাসিতা নয়; এটি এক চিরন্তন, নীরব মন পোড়ার ইতিহাস।
ঠিক সাড়ে ৬টায় দরজার কলিংবেলটা বেজে উঠল। সুরাইয়া চশমাটা ঠিক করে দরজার দিকে তাকালেন। কাজের মেয়ে আমেনা দরজা খুলে দিতেই ঘরে ঢুকল শামি। তার কাঁধে ল্যাপটপের ভারী ব্যাগ, কপালে ক্লান্তির ঘাম। সে এক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তার কর্মব্যস্ততার কোনো শেষ নেই- যেন সময়ের সঙ্গে এক অবিরাম পাল্লা দেওয়া। ব্যাগটা সোফায় নামিয়ে রেখে সে মায়ের শোবার ঘরের দিকে এগিয়ে এলো- ‘মা, আজকেও ঘরের বাতি না জ্বালিয়ে অন্ধকারে বসে আছ? শরীরটা ঠিক আছে তো তোমার?’ 
শামি সুইচ টিপে ঘরটা আলোয় ভরিয়ে দিল।
হঠাৎ আলোয় শাহানা চোখ দুটো একটু পিটপিট করলেন। এরপর মৃদু হেসে বললেন, ‘শরীর তো জড়বস্তুর মতো কেটেই যায় রে বাবা। মনটাই যা একটু অবাধ্য, কোনো নিয়ম মানতে চায় না। সময়-অসময় বোঝে না।’
শামি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মায়ের পায়ের কাছে বসল। মায়ের ঠান্ডা হাতা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল, ‘আবার ওই পুরনো ডায়েরি? ডাক্তার সাহেব তোমাকে এসব পুরোনো দিনের কথা বেশি ভাবতে বারণ করেছেন না? প্রেশারটা আবার বেড়ে যাবে।’
শাহানা হাসলেন। ওই হাসিতে ঝরে পড়ল সীমাহীন এক করুণা- ‘তুই ভাবিস স্মৃতিগুলো কষ্টের? না রে শামি, এগুলোই তো আমার বেঁচে থাকার রসদ। তোর বোন হানি যখন ওপার থেকে ফোন করে বলে সে ভীষণ ব্যস্ত, তখন এ খাতাটাই আমার সঙ্গে কথা বলে। আমার একাকীত্ব দূর করে।’
শমির বোন হানি বারো বছর ধরে কানাডায় স্থায়ী। সেখানে তার স্বামী, সন্তান আর জমকালো প্রবাসী সংসার। প্রথম প্রথম প্রতি বছর দেশে এলেও এখন কয়েক বছরে একবারও তার আসার সময় মেলে না। ভিডিও কলে যখন সে কথা বলে, তখন তার ব্যাকগ্রাউন্ডের তুষারপাত আর শাহানার ঘরের জানালার বাইরের ধূলিধূসরিত ঢাকা শহরের মধ্যে এক অলঙ্ঘ্য দূরত্ব তৈরি হয়। এই দূরত্বটা ভৌগোলিক নয়, মানসিক। হানি এখন আর বাংলাদেশের ওই মেঠোপথ, শিউলি ফুল কিংবা বর্ষার প্রথম বৃষ্টির সোঁদা গন্ধের টান অনুভব করে না। তার মন আর এ দেশের জন্য পোড়ে না। কিন্তু শাহানার মনটা প্রতিমুহূর্তে পুড়ে ছাই হয় ওই অদেখা নাতনির জন্য- যাকে তিনি কেবল মোবাইলের পাঁচ ইঞ্চি স্ক্রিনেই হাত বুলিয়ে আদর করতে পারেন।
শাহানা একাই লড়েছেন, শামি ও হানিকে বড় করেছেন। এ ঢাকা শহরটাকে নিজের চোখের সামনে তিল তিল করে বদলে যেতে দেখেছেন তিনি। এক সময় ধানমন্ডির যে বাড়িটায় তারা থাকতেন- এর চারপাশে ছিল বড় বড় গাছ, পুকুর আর পাখির ডাক। বিকেল হলেই প্রতিবেশীরা একে অন্যের উঠোনে এসে বসতেন, সুখ-দুঃখের গল্প হতো। আর আজ? চারদিকে কেবল বহুতল ভবন, কাচের দেয়ালে ঘেরা কৃত্রিম আলো আর যান্ত্রিক কোলাহল। প্রতিবেশীর ঘরের দরজায় বিশাল তালা ঝোলে, কেউ কারো খবর রাখার প্রয়োজন বোধ করে না।
শামির দিকে তাকিয়ে শাহানা বললেন, ‘জানিস শামিু, মাঝে মধ্যে এই শহরের দিকে তাকালে আমার খুব অচেনা লাগে। চারদিকে এত চাকচিক্য, এত বড় বড় ফ্লাইওভার, এক্সপ্রেসওয়ে- সবকিছু কত আধুনিক হয়েছে! কিন্তু সব মানুষ কেন যেন বড্ড দূরবর্তী হয়ে গেছে। এই যে তুই এত টাকা কামাস, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কর্পোরেট অফিসে খাটিস। অথচ দিন শেষে তোর মুখে আমি এক চিলতে শান্তি দেখি না। আমাদের সময় অভাব ছিল রে। কিন্তু মানুষের মনে একটা অমলিন শান্তি ছিল।’
শামি চুপ করে মায়ের কথাগুলো শুনছিল। মায়ের কথার ভেতরের এই রূঢ় সত্যটা তাকেও বিদ্ধ করে। আসলেই তো, প্রতিদিন সকালে তীব্র জ্যামের মধ্য দিয়ে অফিসে যাওয়া, ক্লায়েন্ট মিটিং, টার্গেট পূরণের ইঁদুর দৌড়- এই তো তার জীবন। মনের ভেতর একটা সূক্ষ্ম হাহাকার তারও জমে থাকে। কিন্তু তা প্রকাশ করার অবসর বা সুযোগ তার কই? ঠিক তখনই তার ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে হানির নাম ভেসে উঠছে। শামি রিসিভ করে লাউডস্পিকার অন করল। 
ওপাশ থেকে কানাডার শীতের দেশের কৃত্রিম আলোয় উজ্জ্বল হানির মুখ ভেসে উঠল- ‘হাই শামি! আম্মু কেমন আছে?’ তার কণ্ঠস্বর সব সময়ই একটু তাড়াহুড়া মাখানো।
সুরাইয়া ফোনের স্ক্রিনের দিকে কাঁপা কাঁপা হাত বাড়িয়ে দিলেন- ‘হানি মা! কেমন আছিস? আমার জনি সোনা কেমন আছে?’
‘ভালো আছি আম্মু। জনির এখন উইন্টার ভ্যাকেশন চলছে। তাই ওকে নিয়ে একটু স্কেটিংয়ে যাচ্ছি। বাইরে প্রচণ্ড বরফ পড়ছে আজ’- হানি হাসিমুখে জানাল।
‘এবার শীতে একবার আসবি না রে দেশে? তোর প্রিয় নলেন গুড়ের পিঠা বানাতাম। তুই তো নতুন চালের গুঁড়া দিয়ে ভাপা পিঠা খেতে বড্ড ভালোবাসতিস’- শাহানা আকুল গলায় বললেন।
হানির মুখের হাসিটা মুহূর্তেই একটু ফিকে হয়ে গেল। সে আমতা আমতা করে বলল- ‘আম্মু, এখন তো উইন্টারে টিকিট বুক করা খুব মুশকিল। তাছাড়া জনির পরের সেমিস্টারের পড়াশোনা শুরু হয়ে যাবে। বাংলাদেশ তো এখন অনেক বদলে গেছে শুনলাম, খুব জ্যাম নাকি চারদিকে? ধুলাবালিও প্রচুর। জনির তো আবার ডাস্ট অ্যালার্জি আছে। দেখি, সামনের বছর চেষ্টা করব।’
সামনের বছর- এ শব্দবন্ধটি শাহানা দশ বছর ধরে শুনে আসছেন। তিনি মৃদু দীর্ঘশ্বাস চেপে বললেন- ‘আচ্ছা মা, সাবধানে থাকিস। জনিকে সাবধানে রাখিস।’
কলটা কেটে যাওয়ার পর শাহানার ঘরের কোণের প্রাচীন দেয়াল ঘড়িটার টিকটিক শব্দ আবার তীব্র হয়ে উঠল। মায়ের চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়া এক ফোঁটা অশ্রু শামির চোখ এড়ালো না। সে মায়ের হাতা আরো শক্ত করে চেপে ধরল। 
‘মা, তুমি কেঁদো না’- শামি শান্ত গলায় সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করল।
‘কাঁদছি না রে বাবা।’ শাহানা চোখের কোণের জলটুকু আঁচলে মুছে বললেন, ‘আসলে মনটা যখন খুব বেশি পোড়ে, তখন চোখ দিয়ে একটু জল বের হওয়া ভালো। এতে মনের ভেতরের তপ্ত ছাইগুলো ধুয়ে পরিষ্কার হয়ে যায়।’
শাহানা ডায়েরিটার শেষ পাতাটি ওল্টালেন। সেখানে একটা শুকনো, বিবর্ণ শিউলি ফুল চ্যাপ্টা হয়ে লেপ্টে আছে। সবুর তাকে এক কুয়াশাচ্ছন্ন হেমন্তের সকালে এটি দিয়েছিলেন। সুবাস হারিয়ে গেছে বহু বছর আগে। কিন্তু এর স্পর্শটা আজও শাহানাকে এক নিমেষে ওই ফেলে আসা যৌবনের দিনগুলোয় ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
জানালার বাইরে ঢাকা শহরের বুক চিরে নিয়ন আলো ছড়াতে ছড়াতে একটা ট্রেন চলে গেল। পুরো শহরটা যেন একটা বিশাল জ্বলন্ত কুণ্ডলী- যেখানে কোটি কোটি মানুষ তাদের আশা-আকাক্সক্ষা আর স্মৃতির আগুনে প্রতিদিন পুড়ে চলেছে। কেউ প্রবাসে বসে দেশের ধুলামাটির জন্য পুড়ছে, কেউ বা নিজের চেনা ড্রয়িংরুমে বসেই আপনজনের দূরত্বের আগুনে পুড়ছে।
শাহানা আক্তার আস্তে করে চোখ বন্ধ করলেন। ডায়েরিটা বুকের ওপর চেপে ধরতেই তার মনে হলো, এই মন পোড়ার যন্ত্রণাই আসলে প্রমাণ করে আমরা এখনো রোবট হয়ে যাইনি, এখনো মানুষ। জীবনের এই শেষ অপরাহ্ণে এসেও তার মনটা পুড়ছে। আর এ মধুর পোড়ার মধ্যেই তিনি খুঁজে পান তার হারানো সাদিককে, তার ফেলে আসা সোনালি অতীতকে আর চিরন্তন প্রিয় এই বাংলাদেশকে।

কেএমএএ/আপ্র/১৭.০৭.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

বর্ষার কবিতা
১৭ জুলাই ২০২৬

বর্ষার কবিতা

শ্রাবণীরাজীব কুমার দাসশ্রাবণ মেঘের জোয়ার আকাশে দিয়েছে পাড়িপ্রকৃতি মেতেছে শ্রাবণী সাজেকত সুখ বাসনায় র...

টিউশনির আজগুবি আলাপ
১৭ জুলাই ২০২৬

টিউশনির আজগুবি আলাপ

রম্য ছড়া===

টঙ্গীতে ‘জীবনের রংধনু’ কাব্যগ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন
১৩ জুলাই ২০২৬

টঙ্গীতে ‘জীবনের রংধনু’ কাব্যগ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন

টঙ্গী (গাজীপুর) প্রতিনিধি: গাজীপুরের টঙ্গীতে উদীয়মান কবি মো. আলাল সরকারের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘জীবনের...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই