কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারে শুধু তরুণ কর্মীরাই নয়, বয়স্ক পেশাজীবীরাও নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন। বিশেষ করে চ্যাটজিপিটি চালুর পর থেকে এআই–সংশ্লিষ্ট খাতগুলোতে ৫৫ বছর বা তার বেশি বয়সী কর্মীদের চাকরি পরিবর্তন, কর্মক্ষেত্র ছাড়ার প্রবণতা কিংবা বেকার হওয়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বস্টন কলেজের ‘সেন্টার ফর রিটায়ারমেন্ট রিসার্চ’-এর গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির কারণে সরাসরি চাকরি হারানোর পাশাপাশি নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চাপও বয়স্ক কর্মীদের কর্মজীবনে বড় প্রভাব ফেলছে।
গবেষণার অন্যতম লেখক অর্থনীতির অধ্যাপক জিওফ্রে সানজেনবাখারের মতে, এআই মূলত তিনভাবে বয়স্ক কর্মীদের ওপর প্রভাব ফেলছে।
প্রথমত, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার কারণে কিছু ক্ষেত্রে কর্মীরা সরাসরি প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতিস্থাপিত হচ্ছেন। ফলে অনেকে চাকরি হারিয়ে শ্রমবাজার থেকে ছিটকে পড়ছেন।
দ্বিতীয়ত, নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার মানসিক চাপ থেকে অনেক কর্মী এমন চাকরি খুঁজছেন যেখানে এআইয়ের ব্যবহার কম, আবার কেউ কেউ নির্ধারিত সময়ের আগেই অবসরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
তৃতীয় দিকটি ইতিবাচক। কিছু ক্ষেত্রে এআই কর্মীদের উৎপাদনশীলতা বাড়াচ্ছে, কাজের দক্ষতা উন্নত করছে এবং আয় বৃদ্ধিতেও সহায়তা করছে।
টাফটস ইউনিভার্সিটির ‘ডিজিটাল প্ল্যানেট’ উদ্যোগ ও ‘কারেন্ট পপুলেশন সার্ভে’র তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষণাটি করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, চ্যাটজিপিটি চালুর আগ পর্যন্ত এআই–সংশ্লিষ্ট পেশায় বয়স্ক কর্মীদের চাকরি পরিবর্তনের হার তুলনামূলক কম ছিল। কিন্তু এর পর থেকে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে এবং তাদের চাকরি ছাড়ার প্রবণতা পরিসংখ্যানগতভাবে উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছেছে।
কমতে পারে কর্মজীবনের ব্যবধান: গবেষণায় বলা হয়েছে, এআইয়ের প্রভাবে বিভিন্ন পেশায় কর্মজীবনের স্থায়িত্বের পার্থক্য কমে আসতে পারে। এত দিন ধারণা ছিল, শারীরিক শ্রমনির্ভর কাজে থাকা কর্মীরা তুলনামূলক দ্রুত অবসরে যান। কিন্তু নতুন বাস্তবতায় উচ্চশিক্ষিত ও উচ্চ আয়ের অনেক পেশাজীবীও প্রযুক্তির পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকির মুখে পড়ছেন।
এআইয়ের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা পেশার মধ্যে রয়েছে ওয়েব ও ডিজিটাল নকশাবিদ, ওয়েব উন্নয়নকর্মী, তথ্যভান্ডার স্থপতি, কম্পিউটার প্রোগ্রামার এবং তথ্যবিজ্ঞানী।
অন্যদিকে তুলনামূলক কম ঝুঁকিতে থাকা পেশার মধ্যে রয়েছে খনি ও ভারী যন্ত্র পরিচালনাকারী কর্মী, খনির ছাদ নির্মাণকর্মী, হাসপাতালের সহকারী কর্মী, রং ও স্প্রে কর্মী এবং ফাইবারগ্লাস প্রস্তুতকারকেরা।
অধ্যাপক সানজেনবাখার মনে করেন, অবসরের বয়স নির্ধারণ বা কর্মসংস্থান নীতি তৈরির সময় নীতিনির্ধারকদের এআইয়ের এই প্রভাব বিবেচনায় নিতে হবে।
অবসর সুবিধা নিয়েও তৈরি হচ্ছে উদ্বেগ: যুক্তরাষ্ট্রে অবসরকালীন সুবিধা দেওয়ার সামাজিক নিরাপত্তা তহবিল নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ২০৩২ সালের শেষ দিকে ওই তহবিলে বড় সংকট তৈরি হতে পারে।
এই সংকট মোকাবিলায় অবসরের বয়স বাড়ানো, উচ্চ আয়ের মানুষের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপসহ বিভিন্ন পদক্ষেপের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।
অধ্যাপক সানজেনবাখার বলেন, ভবিষ্যতে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় পরিবর্তন এলে উচ্চ আয়ের মানুষের সুবিধা তুলনামূলক বেশি কমে যেতে পারে। তবে এআইয়ের প্রভাবের কারণে তাদের কর্মক্ষমতা ও কর্মজীবনের স্থায়িত্বও নতুনভাবে বিবেচনা করতে হবে।
এআই গ্রহণে এগোচ্ছেন বয়স্ক কর্মীরাও: গবেষণায় বলা হয়েছে, বয়স্ক কর্মীরাও এআই ব্যবহার শুরু করেছেন, তবে তরুণদের তুলনায় তাদের গ্রহণের হার কম।
এক জরিপে দেখা গেছে, ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সী ব্যক্তিদের মধ্যে ২৪ শতাংশ এআইকে কর্মক্ষেত্রে হুমকি হিসেবে দেখছেন, ১৯ শতাংশ এটিকে সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করছেন এবং ৩৭ শতাংশ মনে করছেন, এআই একই সঙ্গে হুমকি ও সুযোগ তৈরি করছে।
তবে অন্য গবেষণাগুলো বলছে, অভিজ্ঞ কর্মীদের কিছু বিশেষ দক্ষতা এখনো এআই সহজে প্রতিস্থাপন করতে পারছে না। নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, যোগাযোগ ও সহযোগিতার মতো মানবিক দক্ষতা তাদের বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে।
ক্যারিয়ার বিশেষজ্ঞ ভিকি সালেমির মতে, যারা এখনো এআই ব্যবহার শুরু করেননি, তাদের জন্যও দেরি হয়ে যায়নি। বর্তমান কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকতে হলে এআই সম্পর্কে ধারণা বাড়ানোর পাশাপাশি নিজেদের মানবিক দক্ষতাও আরো শক্তিশালী করতে হবে। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত এআই প্রযুক্তি শেখা, নতুন দক্ষতা অর্জন এবং সমস্যা সমাধান, যোগাযোগ ও সম্পর্ক তৈরির সক্ষমতা বাড়ানোই ভবিষ্যতের কর্মবাজারে টিকে থাকার কার্যকর পথ।
সানা/কেএমএএ/আপ্র/১৭/৭/২০২৬