গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

মেনু

১৯৮৮-এর বন্যার পর ‘বন্যা ব্যবস্থাপনা’য় কোনো পরিবর্তন এসেছে কি?

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১:১৬ পিএম, ১৭ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ২১:৪৯ এএম ২০২৬
১৯৮৮-এর বন্যার পর ‘বন্যা ব্যবস্থাপনা’য় কোনো পরিবর্তন এসেছে কি?
ছবি

ছবি সংগৃহীত

শাহানা হুদা রঞ্জনা    

ঝড়, বন্যা কিংবা অন্য যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ যখন ঢাকাকে স্পর্শ করে, তখনই যেন আমাদের সম্বিত ফিরে আসে। ১২ জুলাই ঢাকায় যে পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে এবং যেভাবে নগরীর বিভিন্ন এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে, তা দেখে ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যার কথা মনে পড়ে গেল। বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ বন্যা ছিল ১৯৮৮ সালের বন্যা। তখন দেশের বড় একটি অংশ, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা, দীর্ঘ সময় পানির নিচে ছিল।

ওই বন্যায় প্রাণ হারিয়েছিলেন অসংখ্য মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল কৃষি, যোগাযোগব্যবস্থা, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ প্রায় সব খাত। তবে সেই বিপর্যয় বাংলাদেশের বন্যা ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন ভাবনার সূচনা করেছিল। ১৯৮৮ সালের বন্যার পর ঢাকার পশ্চিমাঞ্চল রক্ষায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, প্রতিরক্ষা অবকাঠামো, স্লুইসগেট, পাম্পিং স্টেশন এবং জলনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নে একাধিক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। পরে এগুলোর অনেকগুলো বাস্তবায়নও হয়। তবে তখনই বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছিলেন, শুধু বাঁধ নির্মাণ করলেই বন্যা সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।

কার্যকর বন্যা ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজন উন্নত বন্যা পূর্বাভাস, নিয়মিত নদী খনন, নদীতীর সংরক্ষণ, প্রাকৃতিক জলাধার রক্ষা, টেকসই নগর পরিকল্পনা এবং দুর্যোগের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা বৃদ্ধি। বন্যা ব্যবস্থাপনা ও ঝুঁকি মূল্যায়নে ১৯৮৮ সালের অভিজ্ঞতা আজও একটি গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, গত ৩৮ বছরে আমরা কতটা এগোতে পেরেছি?

এই সময়ে দেশের জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নগরায়ণ বিস্তৃত হয়েছে, কিন্তু কমে গেছে জলাভূমি। নদী ও খাল ভরাট করে গড়ে উঠেছে আবাসন প্রকল্প, শিল্পকারখানা এবং নানা ধরনের স্থাপনা। কঠিন বর্জ্যের স্তূপ বেড়েছে, অথচ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এখনো অনেক ক্ষেত্রে অপ্রতুল। এক কথায় বলা যায়, টেকসই নগর পরিকল্পনা নিশ্চিত করা যায়নি। নদী ও বন্যা ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা ও সমন্বিত পরিকল্পনারও ঘাটতি রয়েছে। অবশ্য একটি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে—বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন।

চলতি বছর দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি আবারও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম, তিন পার্বত্য জেলা, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ। কয়েকটি নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার ওপরে প্রবাহিত হচ্ছে। নিম্নাঞ্চলে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে কৃষিজমি, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ অবকাঠামোসহ নানা খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশে বন্যা বা অন্য কোনো বড় দুর্যোগ দেখা দিলেই আমাদের তৎপরতা শুরু হয়। কিন্তু প্রস্তুতির বদলে যদি সব উদ্যোগ শেষ মুহূর্তে নেওয়া হয়, তাহলে ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রমও প্রত্যাশিতভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানুষ সরকারি উদ্যোগের অপেক্ষায় থাকে। অতীতে বেসরকারি ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ দেখা গেলেও সাম্প্রতিক সময়ে সেই স্বতঃস্ফূর্ততা কিছুটা কমেছে বলেই মনে হয়।

২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যা এবং দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার সময় নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলার মধ্যে ছিল। সরকারি সংস্থা, সশস্ত্র বাহিনী, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন তখন ব্যাপক উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করেছিল। বহু সাধারণ মানুষও নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। তবে পরবর্তী সময়ে সংগৃহীত ত্রাণের অর্থ ও সামগ্রী বিতরণে অনিয়মের অভিযোগও ওঠে। ওই অভিজ্ঞতার কারণে এবারও অনেকের মনে প্রশ্ন জাগছে-নতুন বন্যা পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আগের মতো থাকবে তো?

চট্টগ্রাম ও তিন পার্বত্য জেলায় প্রাণহানি, বসতবাড়ি ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে। প্রশাসন উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার করলেও দুর্গত মানুষের দুর্ভোগ এখনো কাটেনি। বিশেষ করে যেভাবে নগর ও জনপদ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে, তাতে উদ্বিগ্ন না হয়ে উপায় নেই। ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বাধ্য হওয়া মানুষদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিরাপদ খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও জীবিকা পুনরুদ্ধার।

আমরা আশা করি, বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে আরও বেশি সংখ্যায় আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হবে এবং পর্যাপ্ত শুকনো খাবার, চাল, ডাল, বিশুদ্ধ পানি, শিশুখাদ্য ও প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। পার্বত্য অঞ্চলসহ দুর্গম এলাকাগুলোতে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের সহায়তায় দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা এবং ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ আরও জোরদার করতে হবে।

বন্যার শুরুতে দুর্গত মানুষের কাছে রান্না করা খাবার পৌঁছে দেওয়া সবচেয়ে জরুরি। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে শুকনো খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, স্যালাইন, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ অব্যাহত রাখতে হবে। শিশু, গর্ভবতী নারী, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী মানুষের প্রয়োজনকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। ইতোমধ্যে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় রান্না করা খাবার, শিশুখাদ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণ শুরু হয়েছে, যা অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার সময় প্রতিবছরই কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ সামনে আসে।

দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে বহু এলাকায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বিদ্যুৎ সরবরাহ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে পড়ায় যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। অনেক দুর্গম গ্রামে নৌযান কিংবা হেলিকপ্টার ছাড়া পৌঁছানো সম্ভব হয় না। ফলে প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী ও চিকিৎসাসেবা যথাসময়ে পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। আবার বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর নতুন সংকট দেখা দেয়। বিশুদ্ধ পানির অভাব, ডায়রিয়া, চর্মরোগ, সাপের কামড় এবং অন্যান্য পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বেড়ে যায়। তাই ত্রাণের পাশাপাশি জরুরি স্বাস্থ্যসেবা, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, স্যানিটেশন এবং স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ওইসব বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে এখনই সমন্বিত প্রস্তুতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। কারণ আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের ঝুঁকি পুরোপুরি কেটে যাচ্ছে না। একই সঙ্গে কৃষকদের দিকেও বিশেষ নজর দিতে হবে। টানা অতিবৃষ্টি ও বন্যায় চট্টগ্রাম বিভাগের কয়েকটি জেলায় কৃষি খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এর আগে হাওর অঞ্চলেও আকস্মিক বন্যায় বোরো ধানের বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। সাম্প্রতিক বন্যায় অসংখ্য পুকুর, দিঘি ও মৎস্য খামারের মাছ ভেসে গেছে। এতে মৎস্য খাতেও উল্লেখযোগ্য আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। পাশাপাশি ভারী বর্ষণ ও বন্যার কারণে আঞ্চলিক সড়ক, গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থা এবং বিভিন্ন মহাসড়কেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, যার প্রভাব দীর্ঘদিন অর্থনীতির ওপর পড়বে।

বাংলাদেশের মতো নদীবাহিত দেশে অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও বন্যাকে পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়। দেশের ভূপ্রকৃতি, মৌসুমি বৃষ্টিপাত এবং উজানের নদীগুলোর প্রবাহের কারণে বন্যা এ দেশের প্রাকৃতিক বাস্তবতারই অংশ। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত বন্যাকে নির্মূল করা নয়; বরং বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনার মাধ্যমে এর ক্ষয়ক্ষতি যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা।

প্রশ্ন হলো, আমরা কি চাইলে বন্যার ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারি? বিশেষজ্ঞদের মতে, যেখানে সম্ভব সেখানে বন্যা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিতে হবে, আর যেখানে তা সম্ভব নয়, সেখানে ক্ষয়ক্ষতি কমানোর জন্য অভিযোজনমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে বন্যার্ত মানুষের দ্রুত উদ্ধার, পর্যাপ্ত ত্রাণ বিতরণ এবং কার্যকর পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।

১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যার পর দেশে বন্যা ব্যবস্থাপনা নিয়ে একাধিক পরিকল্পনা ও সুপারিশ করা হয়েছিল। সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনার আওতায় নিয়মিত নদী ড্রেজিং, নদীদখল উচ্ছেদ, নদীদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে এসব উদ্যোগের অধিকাংশই কাঙ্ক্ষিতভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। বরং অনেক নদী নাব্যতা হারিয়েছে, কোথাও কোথাও নদী প্রায় অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে। অসংখ্য খাল ভরাট হয়ে গেছে কিংবা দখলের কারণে মৃতপ্রায় অবস্থায় রয়েছে। পুকুর, জলাশয় ও প্রাকৃতিক জলাধারও একের পর এক হারিয়ে গেছে।

বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রেখে ভাঙনপ্রবণ এলাকায় টেকসই তীর সংরক্ষণ করতে হবে। একই সঙ্গে শহর, গ্রাম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সেতু ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষায় প্রয়োজন অনুযায়ী বিজ্ঞানভিত্তিক বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। তবে সব জায়গায় বাঁধ নির্মাণ সমাধান নয়। কোথাও বাঁধ উপকারী, আবার কোথাও তা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত করে নতুন সমস্যার জন্ম দিতে পারে। তাই প্রকল্প গ্রহণের আগে পরিবেশগত ও প্রকৌশলগত মূল্যায়ন অপরিহার্য।

বাংলাদেশের দুটি প্রধান নগরী- ঢাকা ও চট্টগ্রামের—ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুর্বলতা এখন আর গোপন কোনো বিষয় নয়। সামান্য কয়েক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতেই নগরীর বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে চলে যায়। এর পেছনে শুধু অতিবৃষ্টি নয়, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল দখল, জলাধার ভরাট এবং অকার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাও সমানভাবে দায়ী। তাই জলাবদ্ধতা নিরসনে কেবল ড্রেন নির্মাণ নয়; খাল, জলাভূমি ও প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ পুনরুদ্ধারের বিকল্প নেই।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই খাল পুনর্খনন ও নদী পুনরুদ্ধারের কথা বলে আসছে। সাম্প্রতিক বন্যা ও জলাবদ্ধতার অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই এই কর্মসূচিগুলো আরও দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা সামনে এনে দিয়েছে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় প্রচলিত পদ্ধতিতে দুর্যোগ মোকাবিলা আর যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি, সমন্বিত এবং বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা।

বাংলাদেশের অনেক বন্যাই উজানের ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে সৃষ্টি হয়। তাই প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনায় আরও কার্যকর সহযোগিতা জরুরি। দুই দেশের মধ্যে রিয়েল-টাইম নদীর পানির তথ্য বিনিময়, যৌথ বন্যা পূর্বাভাস, অভিন্ন নদী ব্যবস্থাপনা এবং নিয়মিত কারিগরি সমন্বয় জোরদার করা প্রয়োজন। অতীতেও এসব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, কিন্তু প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই সহযোগিতা আরও কার্যকর হবে—এমন প্রত্যাশাই দেশবাসীর।

সবশেষে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—বন্যা বাংলাদেশের জন্য নতুন কোনো ঘটনা নয়, আবার ভবিষ্যতেও এটি পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব হবে না। কিন্তু বন্যাকে দুর্যোগে পরিণত করে মানুষের জীবন ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষতির জন্য প্রকৃতির পাশাপাশি আমাদের পরিকল্পনার দুর্বলতা, অব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশের প্রতি দীর্ঘদিনের অবহেলাও কম দায়ী নয়।

১৯৮৮ সালের বন্যা আমাদের অনেক শিক্ষা দিয়েছিল। সেই শিক্ষা যদি সত্যিকার অর্থে কাজে লাগানো যেত, তাহলে প্রায় চার দশক পর এসে একই ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হতো না। এখন সময় নতুন পরিকল্পনা তৈরির নয়; সময় পুরোনো প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের। নদীকে তার স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে দেওয়া, খাল ও জলাভূমি সংরক্ষণ, আধুনিক নগর পরিকল্পনা, কার্যকর বন্যা পূর্বাভাস এবং দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ- এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলেই কেবল বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব হবে।

প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে নয়, প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান করেই বাংলাদেশকে এগোতে হবে। অন্যথায় প্রতি বর্ষায় একই দৃশ্য, একই দুর্ভোগ এবং একই দীর্ঘশ্বাসই আমাদের নিয়তি হয়ে থাকবে।

লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলামিস্ট
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)

কেএমএএ/আপ্র/১৭.০৭.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী: ত্যাগ ও অর্জনের এক অনন্য অধ্যায়
১৬ জুলাই ২০২৬

শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী: ত্যাগ ও অর্জনের এক অনন্য অধ্যায়

লে. কর্নেল হাসানুর রহমান, বিজিওএম, পিএসসিবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বিশ্ববাসী দুটি বড় যুদ্ধের ধ্বংসাত্...

তার ‘গণতন্ত্রের স্কুলেই’ শেষ বিদায়
১৬ জুলাই ২০২৬

তার ‘গণতন্ত্রের স্কুলেই’ শেষ বিদায়

আশিস সৈকততবর্ষণমুখর বিকেলেও তার শেষ যাত্রায় ছিল অসংখ্য মানুষ। দীর্ঘদিনের প্রিয় সংসদ ভবনে তিনি আসেন স...

বৃষ্টি হলেই অচল ঢাকা, জলাবদ্ধতা নিরসনে কোটি টাকা ব্যয়ের সুফল কি মিলছে?
১৪ জুলাই ২০২৬

বৃষ্টি হলেই অচল ঢাকা, জলাবদ্ধতা নিরসনে কোটি টাকা ব্যয়ের সুফল কি মিলছে?

আদিত্য আরাফাতকবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো বর্ষা বন্দনার সুযোগ কোথায়! বর্ষাকাল এ নগরে আশীর্বাদ নয়;...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই