যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনা আরো তীব্র হয়েছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালিয়েছে তারা। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করতেই ধারাবাহিক অভিযান চালানো হচ্ছে।
আইআরজিসির দাবি, তাদের মহাকাশ বাহিনী সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ অভিযান পরিচালনাকারী একটি কমান্ড সেন্টার, ওমানে মার্কিন নৌ ও আকাশ নজরদারি রাডার এবং কুয়েতে অস্ত্রভান্ডার ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থায় হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় একটি রাডার ব্যবস্থা ও বিশেষ অভিযানে ব্যবহৃত কয়েকটি মার্কিন হেলিকপ্টার ধ্বংস এবং বহু মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে বলেও দাবি করেছে তারা।
শুক্রবার (১৭ জুলাই) আইআরজিসির এক বিবৃতিতে বলা হয়, ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ইরানশাহর এলাকায় বামপুরে দেশটির সেনাবাহিনীর একটি ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় সাত ইরানি সেনা নিহত হওয়ার প্রতিশোধ হিসেবেই এসব পাল্টা অভিযান চালানো হয়েছে।
আইআরজিসি আরো দাবি করেছে, কুয়েতে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা নজরদারি রাডার, অস্ত্রভান্ডার, হিমার্স ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা এবং কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। এতে কুয়েতে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করেছে তারা।
এ ছাড়া ওমানের সালমাহ মালভূমিতে থাকা মার্কিন নৌ নজরদারি রাডার এবং ঘানাম এলাকায় মোতায়েন আকাশ নজরদারি রাডার ধ্বংসের দাবি করেছে ইরান।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার হুঁশিয়ারি: আইআরজিসি জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির ওপর এখনো তাদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা অব্যাহত থাকলে এ জলপথ দিয়ে তেল ও গ্যাস রপ্তানি বন্ধ থাকবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে তারা।
ইরানের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র গত কয়েক দিনে দেশটির সামরিক ও বেসামরিক বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। বিশেষ করে হরমুজগান প্রদেশে কয়েকটি সেতু ও অবকাঠামোতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে তেহরান।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, কেশম দ্বীপ, বন্দর আব্বাস এবং বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশপাশেও হামলা হয়েছে। এর মধ্যে বন্দর আব্বাসের পশ্চিমে একটি সেতুতে হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে বিবিসি।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন, ইরান আলোচনায় ফিরে না এলে দেশটির সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালানো হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, লক্ষ্য ইরানের সামরিক সক্ষমতা: মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ইরানের উপকূলীয় নজরদারি ব্যবস্থা, আকাশ প্রতিরক্ষা স্থাপনা, সামরিক রসদ অবকাঠামো এবং সামুদ্রিক সক্ষমতাসংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে।
সেন্টকমের ভাষ্য, ইরানের সামরিক সক্ষমতা আরো দুর্বল করাই এসব অভিযানের উদ্দেশ্য।
যুক্তরাষ্ট্র আরো জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে নৌ-অবরোধের অংশ হিসেবে ওমান উপসাগরে একটি তেলের ট্যাংকারের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করা কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করা হয়েছে।
কাতার, জর্ডান ও ইরাকেও হামলার খবর: আল-জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একাধিক হামলা প্রতিহত করেছে। ইরানের হামলার ধ্বংসাবশেষের আঘাতে একটি শিশু আহত হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।
জর্ডানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তিনটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে। এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
এ ছাড়া উত্তর ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলের সুলাইমানিয়াহ শহরে কয়েকটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। ইরাকের এরবিল শহরে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জোটের বাহিনী আটটি বিস্ফোরকবোঝাই ড্রোন ভূপাতিত করেছে বলেও জানিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।
যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা নিয়ে অনিশ্চয়তা: নতুন করে হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনায় দুই দেশের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতা আরো অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার পথ এখনো খোলা রয়েছে। তবে ইরান কোনো চুক্তি হলে তা দেশের স্বার্থ রক্ষা করেই হতে হবে বলে জানিয়েছে।
এর আগে দুই দেশের মধ্যে সংঘাত বন্ধে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও নতুন করে সামরিক উত্তেজনা সেই প্রক্রিয়াকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। সূত্র: প্রেস টিভি, রয়টার্স, বিবিসি, আল-জাজিরা
সানা/আপ্র/১৭/৭/২০২৬