যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ মূল টেলিভিশন চ্যানেলে সরাসরি সম্প্রচার না করায় দেশটির তিনটি প্রধান সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি। এবিসি, এনবিসি ও সিএনএনের বিরুদ্ধে ‘ষড়যন্ত্রে’ জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে ট্রাম্প বলেছেন, এসব প্রতিষ্ঠানের সম্প্রচার লাইসেন্স বাতিল করা উচিত।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রায় চার মাস আগে দেওয়া ওই ভাষণে ট্রাম্প মূলত নির্বাচন–সংক্রান্ত নিরাপত্তা নিয়ে বক্তব্য দেন। ভাষণে তিনি কিছু গোয়েন্দা নথিও প্রকাশ করেন। তাঁর দাবি, এসব নথিতে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে চীনের হস্তক্ষেপের প্রমাণ রয়েছে। তবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়নে বলা হয়েছে, দুই হাজার বিশ সালের নির্বাচনের ফলাফল পরিবর্তনে চীনের ভূমিকার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ভাষণ শেষে ট্রাম্প বলেন, ‘এনবিসি ও এবিসি-এই ভুয়া সংবাদমাধ্যম দুটি ঘোষণা দিয়েছে, তারা আমার ভাষণ সম্প্রচার করবে না, যা বিরল ঘটনা।’ তিনি আরো বলেন, ‘এ ধরনের ধোঁকাবাজির শাস্তি হিসেবে তাদের সম্প্রচার লাইসেন্স বাতিল করা উচিত।’
তবে যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম ও আইনবিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশটির সংবিধানের প্রথম সংশোধনী অনুযায়ী কোনো সংবাদমাধ্যম কী সম্প্রচার করবে, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা তাদের রয়েছে। যদিও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ অতীতে অধিকাংশ জাতীয় সম্প্রচারমাধ্যম সরাসরি প্রচার করেছে।
এবিসি নিউজের এক মুখপাত্র জানান, ট্রাম্পের ভাষণ তাদের মূল টেলিভিশন চ্যানেলে নয়, বরং নিজস্ব সরাসরি সম্প্রচারমাধ্যম ও বেতারে প্রচার করা হয়েছে। একইভাবে এনবিসি ভাষণটি তাদের মূল সম্প্রচার চ্যানেলের পরিবর্তে বিনা মূল্যের সরাসরি সম্প্রচার সেবায় দেখিয়েছে। তবে এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটি আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি।
সিএনএন জানিয়েছে, তারা ভাষণের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করেছে এবং নিজেদের ওয়েবসাইট ও গ্রাহকভিত্তিক সরাসরি সম্প্রচার সেবায় ভাষণের ভিডিও দেখিয়েছে। তবে এসব ডিজিটাল মাধ্যমে দর্শকসংখ্যা মূল টেলিভিশন চ্যানেলের তুলনায় অনেক কম।
ভাষণের আগে হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলাইন লেভিট বলেন, ট্রাম্প ইরানের পরিস্থিতি, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এবং আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যু নিয়ে কথা বলতে পারেন। তাই নাগরিকদের স্বার্থে ভাষণটি সরাসরি সম্প্রচার করা উচিত ছিল।
ট্রাম্প কয়েক বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছেন। তিনি বারবার দাবি করেছেন, দুই হাজার বিশ সালের নির্বাচনে কারচুপির কারণে তিনি ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী জো বাইডেনের কাছে পরাজিত হয়েছেন। এ ছাড়া ডাকযোগে ভোট, ভোটিং যন্ত্রে কারচুপি এবং অমার্কিন নাগরিকদের ভোটদান নিয়েও অভিযোগ করে আসছেন। তবে এসব দাবির পক্ষে তিনি এখনো গ্রহণযোগ্য কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি।
ডেমোক্রেটিক পার্টির কয়েকজন নেতা সম্প্রচারমাধ্যমগুলোকে ট্রাম্পের ভাষণ সরাসরি না দেখানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, আগে থেকেই ভিত্তিহীন প্রমাণিত দাবিগুলো তিনি আবারো তুলে ধরতে পারেন।
অন্যদিকে সিবিএস নিয়মিত অনুষ্ঠান স্থগিত রেখে ভাষণটি সরাসরি সম্প্রচার করে। তবে সম্প্রচার শুরুর আগে উপস্থাপক টনি ডোকুপিল বলেন, প্রেসিডেন্টের অনেক বক্তব্য বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। এরপরও সংবাদমূল্য বিবেচনায় ভাষণটি সরাসরি দেখানো হচ্ছে। প্রায় পনেরো মিনিট পর সিবিএস সম্প্রচার বন্ধ করে ট্রাম্পের নির্বাচন–সংক্রান্ত দাবিগুলোর তথ্য যাচাই ও খণ্ডন শুরু করে।
ফক্স নিউজ ট্রাম্পের ভাষণ সরাসরি সম্প্রচার করেছে। নিউইয়র্কসহ কয়েকটি স্থানীয় সম্প্রচারমাধ্যমও ফক্সের সঙ্গে ভাষণটি প্রচার করে।
এদিকে সিবিএসের মূল প্রতিষ্ঠান প্যারামাউন্টের নিয়ন্ত্রণ ডেভিড এলিসনের হাতে যাওয়ার পর সংবাদকক্ষে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। তাঁর বাবা ধনকুবের ল্যারি এলিসন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত। প্রতিষ্ঠানটির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মী সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে চাকরি ছেড়েছেন। যদিও সিবিএস কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
বর্তমানে ডেভিড এলিসন ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারি অধিগ্রহণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল যোগাযোগ কমিশনের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছেন। অধিগ্রহণ সম্পন্ন হলে সিএনএনের নিয়ন্ত্রণও তাঁর হাতে যেতে পারে। ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই সিএনএনের সংবাদ পরিবেশনকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে সমালোচনা করে আসছেন। সূত্র: রয়টার্স
সানা/আপ্র/১৭/৭/২০২৬