একদিকে থোকায় থোকায় ঝুলছে রঙিন আম, অন্যদিকে সুবাস ছড়াচ্ছে নানা জাতের ফুল। কোথাও বিরল ফলের চারা, কোথাও ছাদবাগানের জন্য বাহারি গাছ। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বসেছে এমন এক সবুজের মেলা, যেখানে একই ছাতার নিচে মিলেছে দেশি-বিদেশি হাজারো প্রজাতির গাছের সমাহার।
মাসব্যাপী জাতীয় বৃক্ষমেলা এখন শুধু গাছ কেনাবেচার স্থান নয়; এটি হয়ে উঠেছে প্রকৃতি, সৌন্দর্য ও সবুজ ভবিষ্যতের এক মিলনমেলা। বৃক্ষপ্রেমী মানুষ, শৌখিন বাগানপ্রেমী এবং নগরবাসীর পদচারণায় প্রতিদিনই প্রাণবন্ত হয়ে উঠছে মেলার প্রাঙ্গণ।
এবারের মেলায় সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে বাহারি জাতের আমগাছের চারা। ভারতের মহারাষ্ট্রের বিখ্যাত আলফানসো, থাইল্যান্ডের হানিডিউ, কিং অব চাকাপাত, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার আপেল ম্যাঙ্গো, ভারতের তোতাপুরি, ব্রুনাইয়ের কিং অব ব্রুনেই এবং পাকিস্তানের আনওয়ার-আতুল-দেশ-বিদেশের নানা জাতের আমগাছ নিয়ে হাজির হয়েছেন নার্সারি উদ্যোক্তারা।
কোনো কোনো আমগাছের চারার দাম শুনেও বিস্মিত হচ্ছেন দর্শনার্থীরা। মেলায় এমন কিছু বিদেশি জাতের আমগাছ রয়েছে, যার প্রতিটি চারার দাম ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
হোসেন নার্সারির স্বত্বাধিকারী মো. সাদ্দাম হোসেন বলেন, “এবারের মেলায় আমরা ১০০ প্রজাতির আমগাছের চারা এনেছি। এর মধ্যে রয়েছে ভারত, থাইল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রুনাই ও পাকিস্তানের বিভিন্ন বিখ্যাত জাত।”
তিনি জানান, প্রতিটি জাতের আমের রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য। ভারতের আলফানসো আমের ক্ষেত্রে বিশেষ পদ্ধতিতে চারা তৈরি করতে হয়। সঠিকভাবে গ্রাফটিং করা না হলে ফল পাওয়া গেলেও কাঙ্ক্ষিত সুবাস ও স্বাদ পাওয়া যায় না।
মেলায় হানিডিউ ও আপেল ম্যাঙ্গো চারার প্রতিটির দাম ৩০ হাজার টাকা। হানিডিউ আমের আঁটি পাতলা, স্বাদ অত্যন্ত মিষ্টি এবং প্রতিটি আমের ওজন ৮০০ গ্রাম থেকে এক কেজি পর্যন্ত হয়। আর আপেল ম্যাঙ্গো মিষ্টি ও কচকচে স্বাদের জন্য জনপ্রিয়।
শুধু আম নয়, মেলায় রয়েছে পৃথিবীর নানা প্রান্তের বিচিত্র সব ফলের গাছ। জাপানের জাতীয় ফল পার্সিমন, ব্রাজিলের জাবুটিকাবা, মালয়েশিয়ার ডুরিয়ান, রামবুটান, ম্যাঙ্গো স্টিম এবং থাইল্যান্ডের সুগন্ধি নারকেলের চারাও পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি রয়েছে প্রায় এক হাজার প্রজাতির শোভাবর্ধনকারী গাছ, নানা জাতের ফুল ও পাতাবাহার।
জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত নার্সারি উদ্যোক্তা মো. লুৎফুর রহমান সরকার এবার ২৭ প্রজাতির আমগাছের চারা নিয়ে মেলায় এসেছেন। তিনি বলেন, মেলার প্রথম দিকে বিক্রি কিছুটা কম থাকলেও কয়েক দিন পর ক্রেতাদের উপস্থিতি বাড়ে। সরকারের বড় আকারের বৃক্ষরোপণ উদ্যোগের কারণে এবার ভালো সাড়া পাওয়ার আশা করছেন তিনি।
বন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবারের বৃক্ষমেলায় ১২০টি স্টল রয়েছে। এর মধ্যে নার্সারি, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের স্টল রয়েছে। দর্শনার্থীদের সুবিধার জন্য তথ্যকেন্দ্র, নিয়ন্ত্রণকক্ষ, চিকিৎসাসেবা এবং শিশুদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী বলেন, এবারের মেলায় ১৭ লাখ থেকে ১৮ লাখ চারা বিক্রির প্রত্যাশা রয়েছে। এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হলে পরিবেশ ও প্রকৃতির জন্য তা ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
তিনি বলেন, সবুজ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য পূরণে বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমকে আরো এগিয়ে নিতে হবে। আর মানুষের মধ্যে গাছ লাগানোর আগ্রহ বাড়াতে বৃক্ষমেলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
মেলায় ঘুরতে আসা রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা সায়রা বেগমের বাড়ির ছাদে রয়েছে নানা জাতের ফলদ ও শোভাবর্ধনকারী গাছ। প্রতিবছর তিনি বৃক্ষমেলার অপেক্ষায় থাকেন।
সায়রা বেগম বলেন, “বাড়ির ছাদে নানা ধরনের ফলদ গাছ আছে। প্রতিবার মেলায় নতুন কী জাতের গাছ এসেছে, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করি। এবারও কয়েকটি নতুন জাতের আমগাছ কেনার পরিকল্পনা করেছি।”
আগারগাঁওয়ের এই বৃক্ষমেলায় তাই শুধু গাছের বেচাকেনা হচ্ছে না; তৈরি হচ্ছে মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির নতুন সম্পর্ক। নগরের ইট-কংক্রিটের জীবনে এক টুকরো সবুজের স্বপ্ন নিয়ে প্রতিদিন এখানে আসছেন মানুষ। আর সেই স্বপ্নের আঙিনায় এবার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হয়ে উঠেছে-আমের রাজ্যে বিরল সব জাতের সমাহার।
সানা/আপ্র/১১/২০২৬