কবি পরিচিতি: কবি ডা. সৈয়দা কাউসারী মালেক রোজী, মুক্তিযোদ্ধা, আমেরিকা প্রবাসী। জন্ম ১৯৫৫ সালের ১৪ অক্টোবর। ঢাকার স্যার সলিমুল্ল্যাহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেছেন। ’৫২-এর ভাষা সৈনিক ও মুক্তিযুদ্ধকালীন টাঙ্গাইলের সিভিল সার্জন মুক্তিযোদ্ধা ডা. সৈয়দ আবদুল মালেকের কন্যা। নিজ জেলা বাংলাদেশের পিরোজপুর জেলাধীন উজিরপুর উপজেলায় দরিদ্র মেয়েদের জন্য পিতা ভাষা সৈনিক ডাঃ সৈয়দ আবদুল মালেক এর নামে একটি আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেছেন এবং স্থাণীয়দের সহযোগিতায় ৪০ বছর ধরে নিজস্ব অর্থে পরিচালনা করছেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে প্রশিক্ষণ নেন এবং যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসায় কাজ করেন। তিনি ঢাকা থেকে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ- ‘কাঁচের এপার ওপার’ ও ‘মাঝ নদীতে বাড়ি’ এবং ২০২৫ সালে কলকাতা বইমেলায় প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের নাম- ‘ভিক্ষুকের মুখ’। মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারে কিছুকাল অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেছেন। ঢাকা, কলকাতা ও নিউইয়র্কের বিভিন্ন দৈনিক, সাপ্তাহিক এবং লিটল ম্যাগাজিনে নিয়মিত লিখেন। নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ঠিকানা সাহিত্য সম্মাননা, লন্ডন বইমেলা সাহিত্য সম্মাননা এবং কলকাতায় এনআরবি ওয়ার্ল্ড আয়োজিত ‘অমর একুশে সাহিত্য সম্মাননা’ পেয়েছেন। তিনি বিশ্ব জুড়ে বসবাসরত বাঙালিদের সাংস্কৃতিক সংগঠন এনআরবি ওয়ার্ল্ড ফ্রেন্ডশিপ ফোরামের প্রেসিডিয়াম সদস্য।
আমেরিকা প্রবাসী, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও কবি ডা. কাউসারী মালেক রোজীর জন্মদিন ১৪ অক্টোবর। তার জন্মদিন উপলক্ষে আমাদের শুভেচ্ছাসহ তার ১০টি কবিতা আজকের এই বিশেষ আয়োজন-
এক.
যোগাযোগ
কেউ আমারে উপর থেকে
দেখে রাখে
আমি দেখি এখান থেকে
পৃথিবীকে,
ঘোরলাগা এই নিলাম বেচা সময়
ঘূর্ণিস্রোতে টলোমলো আকাশ
উড়াল সেতু খিরকি খুলে দেয়,
আমি জিরাই মেঘস্তম্ভ ঘরে
বটের মাথায় অনেক দূরে দেখা
বয়স ধ্যান আর অভিজ্ঞতার জোরে।
দুই.
এক রাজা
তার সঙ্গে পরিচয় কতক দশক আগে
কালেভদ্রে খুব অল্প সময়ে দেখা সাক্ষাৎ হতো
ক্ষুদ্র বদ্ধ অচিন্তনীয় অকিঞ্চিৎকর সম্পর্কের
কোন ইতিহাস নেই।
বিষন্নতায় জলভরা স্পর্শ আশ্রয় পায়নি
অসম যুদ্ধ কোন বুকে লেখা নাই,
চক্ষুর আড়ালে বৃক্ষের বাকল শরীরের
পাহাড়ী মার্বেলের স্তর সাঁতরে
নিহিত গভীরাশ্রয়ী সাক্ষর অজানা।
আজকাল দুর্বল হওয়া শরীর,
মনের ভাজে সেসবের খোঁজ নেই।
সব লেনদেন ফুরিয়ে যায় না, প্রয়োজনও হয় না,
শাড়ীর কাঁথায় পুরানো ন্যাপথলিনের গন্ধ
রাজা যার রাজত্ব নেই
সেনাপতি যেখানে বাহিনী নেই
গল্পের কোন কাহিনী নেই,
সময় অভিবাসী প্রেমহীন
কোন গ্রন্থগার নেই,
পরে আছে গল্প রাজা বাদশা মিয়ার
পুরানো মোহের ছেঁড়াকথা।
তিন.
বড় হয়ে গেছি
পরীক্ষা খাতায় প্রশ্ন ছিল
বড় হয়ে, কি হতে চাও
লিখেছিলাম প্রতিদিন
আনন্দে থাকতে চাই,
আনন্দ কি, কোথায় আনন্দ
কি লিখেছিলাম ভুলে গেছি।
সাঁতরে যখন বড় হলাম
সিড়ির মুখ পাইনি
যেখান থেকে খোঁজা যায়
কি হতে চেয়েছি সময়ে।
স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ডিঙিয়ে
কখনো চাকুরীজীবী, বন্ধু,
মা এবং স্বজন।
সংসারের আরশ ভেঙে
একা থাকতে শিখেছি,
ঘটনা যা নিতান্তই সাধারণ
একটি খুব সাদা ফুল
জলভারী আকাশ
পাতা নাড়িয়ে দমকা হাওয়া
আলুথালু শিশুর চোখ
বাড়ানো হাতে স্বস্তির আমন্ত্রণ-
আনন্দ শুষে নিয়েছি
কবিতা, গল্প, সুর ছবিতে।
দুস্কর পাথর সড়কের অবস্থান
দরজায় আর কড়া নাড়ে না,
বোধহয় বড় হয়ে গেছি।
চার.
বাতাসি ঘণ্টা
আঙুলের ডগায় আরেকটি
আঙুল ছুঁয়ে দিলে
জলতরঙ্গ বাজে বারান্দায়
বাতাসি ঘণ্টায়,
আঙ্গুলে আঙ্গুলে জড়াজড়ি করে
পুরো হাতা নিলে।
তোমার দু’চোখ কাঁপলো
ছেঁড়া পালক ওড়ে,
মাখন, বাদাম, হলুদ মেশানো হেমন্তে
ভোরের আলো লালিমা ছড়ায় গালে
আকাশ চুরি করে,
বললে মদীর স্বরে, এতক্ষণে এলি?
গভীর গাঙে ডুবে রাতের বাতি
বহুদূরে নিঃসঙ্গ অভিমান
সেদিন তোমার হাত আমার হাতে
হুইসেল ডাকে যাবার সময় হলে,
ভালোবাসায় বাড়ন্ত শশীর বাড়
রক্তের বাঁধন সীমান্তের পাহারাদার।
আরো দরজা খোলার ছিল
পাল্লা ভারী
সেই সিড়ি ওপার থেকে নামিয়ে দিলে
বাঁকানো পথে মৌমাছিরা হারায় ফুলে
তোমার জন্য আমার,
বিছানো জায়নামাজ।
দুরদেশে যখন আমি, দুয়ারে দাঁড়িয়ে তুমি
এখন দাঁড়িয়ে আমি, উড়ছে হাওয়া
শুন্যর পরে বিন্দু, সময়ের মোছা দুপুর,
আমার আঙ্গুল তোমার আঙুলে জড়ানো
জলতরঙ্গ বাজে, শব্দের বাউলা সুর।
পাঁচ.
একা থাকা
একা থাকা যায়, একাই থাকতে হয়
রঙিন দুনিয়ায় গ্রেফতার সঙ্গি,
স্রোতের পালে সময় ভেসে
এক জীবনে অনেক হাঁটা।
প্রথম কদম ফেলা যেদিন
একাই ছিলাম,
হাঁটতে শিখে দেখি
একা নই, হাঁটছি সবাই।
সংসারের প্রয়োজনীয়
রসদ নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হাঁটার শুরু।
সবার সাথে এগিয়ে গেলেই সাথ থাকে না
একা থাকার আঁচল ওড়া পথ,
সন্ধ্যা আলোয় সময় ভাঙ্গার সুর
খেয়ালী হাওয়ায় বাজে।
কোটি বছরের ভীড় ঠেলে
বুলেটের মত বেঁধে একাকিত্ব।
কেউ চলে গেলে শুধু থাকে রেশ,
যানজট এড়িয়ে অমসৃণ মেঠোপথে
হাঁটতে শেখার কসরত করতে করতে
সময় একা করে দেয়,
থইথই মানুষের মিছিলে
একদিন একা সবাই,
একাই থাকতে হয়।
ছয়.
অনেক দুর যাবার পর
অনেক দূর যাবার পর
পিছন পথে মেঘের অন্ধকার
উথলে উঠে মন খারাপের কিছু,
কি যেন ঠিক কাজ হলো না
কি যেন কি ফেলে এলাম
কোথায় কখন কি হারালো।
এভাবে যায়না যাওয়া
খুঁজে ফিরি, পাইনা কিছুই
মানি ব্যাগ, আংটি, কলম,
নোট করা টুকরো কাগজ
পকেটেই বর্তমান।
কষ্ট প্রাণে আটকে গেলে
বুকের পেশী খাঁমচে ধরে,
চোখের আলোর ঘোরপ্যাচে
ছেড়ে আসা ফটোগ্রাফ,
কেউ দাঁড়িয়ে শুণ্য মুখে,
নাড়ছে হাত।
দেখা আবার কবে হবে
স্হিরচিত্র মুছতে থাকে,
অনিশ্চয়তা, তন্ত্র তারে
ধাক্কা দিয়ে জাগায় সুর,
অনেক দুর যাবার পর
মন ডাকলে তাকিয়ে থাকা,
অন্য কোন
উপায় থাকে না।
সাত.
ঘুরে ফিরবার জন্য
মন চালে বৃষ্টি শব্দের বন্দনা
বেদানার দানা ঘোর ঘেরে
রঙের নাচ।
সুবেসাদেকের তেচরা আলো শষ্যদানায়,
ভালোবাসা চিৎকারে
ঋতুসন্ধির পাখিরা উড়ে।
তালপাতা শোনে
গভীর তরঙ্গের দামামা,
জল স্হল অন্তরীক্ষে
সপ্তস্তরের মালার যাদু দোলে।
পর্বত চূড়া, সমুদ্রপাতাল
মহাকাশ কৃষ্ণগহ্বরে শব্দে মুখরিত,
মাবুদ সম্পূর্ণ, ইসমে আজম অছিলায়
চাইবার জানালা খুলে যায়।
দরজার চৌকাঠ পেরুলেই শেষের পাতা
ঘুরে ফিরবার সময় এখন।
আট.
আমাদের দেখা হবে
চোখের দেখা না হলে কথারা পৌঁছুতে না পারলে
সম্পর্ক গড়ে তোলার আগেই
দরজাটা বন্ধ করে দেয়া,
বন্ধ দরজার ছিদ্রের ভিতর ঠিকরানো আলো
বিচ্ছিন্নতার নৈশব্দের উলঙ্গ অলঙ্ঘনীয়
প্রাচীর তুলে দাঁড়িয়ে থাকে।
দূর নক্ষত্রের বিচ্ছিন্নতায় অপেক্ষার অজুহাত
পরস্পরের কথোপকথনের জলোচ্ছ্বাস
ফাটলের বন্য বন্যা ঠেলে ফেলে
জাগায় অচেনা চর, অন্য রাজ্য।
অনুতাপ সিদ্ধান্তহীনতা অনুসাংগিক চাপ পৃথিবীর
ডাকঘর নেই, টেলিফোন-ইমেইল ঠিকানা নেই,
সম্পর্ক বুকের ভেতর, মেঘের মিনার
কালের ঝাপটা গাছের প্রাচীন বাকলে ছাপ রাখা
ভাঙচুর আয়নায় কুয়াশার গল্প থাকে।
আমাদের দেখা হবে নক্ষত্রের বনে
চাওয়া পাওয়ার ওপারে ঘন অন্ধকারে
ফানা হওয়া দেহ, দেশের অনেক দূরে
আমাদের দেখা হবে, দেখা হবে।
নয়.
ওরা অপেক্ষায় আছে
ঝড় উঠেছে ছুটছে জাহাজের কাফেলা
বার্সেলোনা থেকে গাজা।
রক্ত ছিটানো মাটি
বারবার ফিরে তাকায় প্রতিরক্ষা প্রতিক্ষায়।
ওদের শব্দ দখলদারদের কবলে,
ঘর মাটি পানি শষ্যদানা
দখলদারদের কবলে,
জলপাইয়ের পাতা কান্ড মূল
দখলদারদের কবলে।
বৃষ্টিপাত হয় বুলেটের,
ট্যাঙ্ক যুদ্ধ বিমান আর অস্ত্র
নিশানা রাখে শিশুর, নারীর শরীর
বাঘ সিংহ শিকারে যেমন খোঁজে।
বদ্ধপরিকর যাত্রায় মানবাধিকার ছাউনী ওরা
কলংকিত এই সময় খুব
রাতজাগা পৃথিবী ঝুলন্ত পেঁচা
অসহায় অশ্বত্থের ডালে।
সহস্র দিলোদার মানুষ দাঁড়িয়ে সত্যের পথে,
ছুটছে সারসার মাস্তুলের কাফেলা
ঠেকাতে অনিয়ম অন্যায়।
আমরা যারা চুপচাপ, ভাবি-তাকিয়ে থাকি
প্রার্থনার রহস্যে ঘেরা ইচ্ছে, ইথারে ভাসাই
উঠে গেছি জাহাজের মাস্তুলে,পাটাতনে।
কোটরে বসা চক্ষুরা পানি ভরা
ওরা অপেক্ষায় আছে।
দশ.
তারপর
প্রতিদিন মৃত্যুর পোস্ট পাই
ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন-
আমরা আল্লাহর, এবং
নিশ্চয়ই তার দিকেই ফিরে যাব।
মা বাবা বন্ধু স্বজন চলে গেলে
শবদেহ নেমেছে ছইয়ের ভেতর।
দাঁড়িয়ে থেকে দেখেছি
চোখের কাচে বাঁচবার আকুতি।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জীবনকে অলিঙন করে
নেমে গেছি দৈনন্দিন জীবনে,
স্বাভাবিক জানি, মৃত্যু সবার জন্য
আমার জন্যও,
দরজায় দাঁড়াবে মৃত্যু
মুখোমুখি হবে সহসাই,
তারপর নেমে যাব ছয় ফুট নিচে,
আমার জন্যও হয়তো
পোস্ট লেখা হবে।
কেএমএএ/আপ্র/০৪.১০.২০২৬