শিশুর সুস্থ ও পূর্ণাঙ্গ বিকাশে বাবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও বাস্তবে তাঁরাই শিশুদের যত্নে সবচেয়ে কম সময় দেন। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ৭ দশমিক ০৭ শতাংশ শিশু বাবার কাছ থেকে নিয়মিত যত্ন পায়। বিপরীতে দাদি-নানি, ভাইবোন ও চাচির কাছ থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু যত্ন পায়।
শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ নিয়ে করা এ গবেষণার তথ্য বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত জাতীয় কর্মশালায় উপস্থাপন করা হয়। ‘বাংলাদেশে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার মাধ্যমে সমন্বিত প্রারম্ভিক শৈশবকালীন যত্ন ও বিকাশ সেবার মূল্যায়ন’ শীর্ষক কর্মশালার আয়োজন করে জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান, ইউনিসেফ ও আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ।
কর্মশালায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা, বিভিন্ন জেলার সিভিল সার্জন, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের বিভাগ ও জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা, গবেষক, শিশু একাডেমির প্রতিনিধি, শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, দাতা সংস্থা ও ব্যবসায়িক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
আলোচনায় বলা হয়, গর্ভধারণের প্রায় তিন সপ্তাহ পর থেকেই শিশুর মস্তিষ্কের স্থায়ী গঠন শুরু হয়। গর্ভধারণ থেকে শিশুর জীবনের প্রথম এক হাজার দিনকে বিকাশের ‘সম্ভাবনার জানালা’ হিসেবে দেখা হয়। এই সময় শিশুর জন্য স্নেহ, মায়া, মমতা, নিরাপত্তা ও সুরক্ষায় বিনিয়োগ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ইউনিসেফের উপপ্রতিনিধি মালালা আহমাদজাই বলেন, বাংলাদেশে দুই থেকে চার বছর বয়সী ১০টি শিশুর মধ্যে প্রায় তিনটির বিকাশ ঠিকমতো হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে আর্থসামাজিক বৈষম্যও রয়েছে। সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের মধ্যে এ হার ৩৮ শতাংশ, আর সবচেয়ে ধনী পরিবারের শিশুদের মধ্যে ২০ শতাংশ।
গবেষণায় তিন বছরের কম বয়সী শিশুদের প্রারম্ভিক যত্ন ও বিকাশের ক্ষেত্রে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সেবার কথা বিবেচনা করা হয়েছে-সুস্বাস্থ্য, পর্যাপ্ত পুষ্টি, নিরাপত্তা ও সুরক্ষা, প্রয়োজন অনুযায়ী যত্ন এবং প্রারম্ভিক শিখনের সুযোগ। গবেষকদের লক্ষ্য ছিল, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রয়োজন অনুযায়ী যত্ন ও প্রারম্ভিক শিখনের সুযোগ দেওয়া সম্ভব কি না এবং তা কতটা কার্যকর।
গবেষণার শুরুতে ৮৯০ শিশু এবং শেষ পর্যায়ে ১ হাজার ১৯ শিশুর তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণাটি ভোলার বোরহানউদ্দিন ও দৌলতখান এবং সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ ও শ্যামনগর উপজেলায় পরিচালিত হয়। ২০২৩ সালের মার্চে শুরু হয়ে গবেষণাটি শেষ হয় ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে।
গবেষণার অংশ হিসেবে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কমিউনিটি ক্লিনিকের চিকিৎসক ও মাঠকর্মীসহ ৫৬৫ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ১৫৪টি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে ছবির বই, খেলনা ও কার্ডসহ বিভিন্ন খেলার সামগ্রী দেওয়া হয়। চারটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং বাছাই করা কয়েকটি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে খেলার কর্নারও তৈরি করা হয়।
গবেষণার ফল উপস্থাপনের সময় আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের বিজ্ঞানী শেখ জামাল হোসেন জানান, মায়ের পর এ বয়সী শিশুদের সবচেয়ে বেশি যত্ন নেন দাদি-নানি। তাঁদের কাছ থেকে ৫৬ দশমিক ৭৯ শতাংশ শিশু সেবা পায়। ভাইবোনের কাছ থেকে পায় ১৬ দশমিক ০৫ শতাংশ, চাচির কাছ থেকে ১০ দশমিক ২১ শতাংশ এবং অন্যদের কাছ থেকে ৮ দশমিক ৫৩ শতাংশ। বাবার কাছ থেকে যত্ন পায় মাত্র ৭ দশমিক ০৭ শতাংশ শিশু।
গবেষকেরা শিশুদের মায়েদের কাছ থেকেই এসব তথ্য পেয়েছেন। শেখ জামাল হোসেন বলেন, শিশুকে আদর-যত্ন ও সময় দেওয়ার ক্ষেত্রে বাবাদের অবস্থান তাঁদের কিছুটা বিস্মিত করেছে।
গবেষণায় আরো দেখা গেছে, দিনের কোনো কোনো সময়ে কিছু শিশু আশপাশে কাউকে না পেয়ে অরক্ষিত অবস্থায় থাকে। গবেষকদের ধারণা, পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর অন্যতম কারণ হতে পারে এ ধরনের পরিস্থিতি।
গবেষণার শুরু ও শেষ পর্যায়ের তথ্য তুলনা করে দেখা গেছে, শিশুদের সার্বিক বিকাশে অগ্রগতি হয়েছে। বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা, ভাষা, আবেগ এবং পেশি সঞ্চালনের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নতি হয়েছে।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অংশ করার তাগিদ: আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের বিজ্ঞানী জেনা হামাদানি বলেন, তিন বছরের কম বয়সী শিশুদের প্রারম্ভিক যত্ন ও বিকাশসেবা দেওয়ার মতো অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ের কার্যকর ব্যবস্থা নেই। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোর মাধ্যমেই এ সেবা দেওয়া সম্ভব। ভোলা ও সাতক্ষীরার গবেষণায় সেটি সম্ভব বলেই প্রমাণিত হয়েছে।
দারিদ্র্য ও অপুষ্টির কারণে এ সেবা কতটা কার্যকর হবে-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অপুষ্টিতে ভোগা শিশুও এ সেবা থেকে উপকৃত হতে পারে। তাঁর ভাষ্য, ৩০ বছর আগে এ ধরনের সেবা পাওয়া শিশুদের পরবর্তী জীবনে দেখা গেছে, তারা স্কুলে ভালো করেছে, ঝরে পড়ার হার কম ছিল, অপরাধপ্রবণতা কম ছিল এবং তাদের উপার্জনও তুলনামূলক ভালো হয়েছে।
অনুষ্ঠানের সভাপতি জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মোহাম্মদ ইউনুস আলী বলেন, প্রারম্ভিক শৈশবকালীন যত্ন ও সেবাকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ করতে হবে। তবে এ কাজে অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতাও প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক তাহমিদ আহমেদ বলেন, মিরপুরে তাঁদের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, অপুষ্টি শৈশবকালীন বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। ক্যাডমিয়াম, সিসা, পারদ ও আর্সেনিকের মতো ভারী ধাতুও শিশুর বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শেখ মোমেনা মনি, শিশু একাডেমির প্রকল্প পরিচালক মো. তারিকুল ইসলাম চৌধুরী, প্রারম্ভিক শৈশবকালীন বিকাশ নেটওয়ার্কের সহসভাপতি মাহমুদা আক্তার, জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের উপপরিচালক রওশন জাহান আখতার এবং পুষ্টিবিদ জয়াশীষ রায়।
সানা/আপ্র/২৮/৮/২০২৬