জিম থেকে বেরিয়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন গায়ক অঙ্কিত বালিয়ান। হাতে কিট ব্যাগ। গন্তব্য ছিল নিজের গাড়ি। কিন্তু গাড়ির কাছে পৌঁছানোর আগেই পেছন থেকে এগিয়ে আসে চার অস্ত্রধারী। মুহূর্তেই শুরু হয় গুলিবর্ষণ। প্রায় ২৫ সেকেন্ড ধরে চলা হামলায় ছোড়া হয় ১২টি গুলি। রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন ৩৫ বছর বয়সী এই হরিয়ানভি গায়ক ও ইউটিউবার।
ঘটনার পুরো দৃশ্য ধরা পড়েছে সিসিটিভি ক্যামেরায়। হামলার পর আরো একটি বিষয় সামনে এসে ঘটনাটিকে দিয়েছে অস্বস্তিকর এক মাত্রা-অঙ্কিতের মৃত্যুর মাত্র দুই ঘণ্টা আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা ভিডিওতে তিনি যে গান গাইছিলেন, তার একটি লাইনের অর্থ ছিল, ‘রাস্তায় হত্যা করো’।
ভারতের উত্তর প্রদেশের শামলিতে গত বুধবার (২৬ আগস্ট) সন্ধ্যা পৌনে সাতটার দিকে ঘটে এ হত্যাকাণ্ড।
জিম থেকে বের হতেই হামলা: শামলির একটি জিম থেকে বের হওয়ার পর অঙ্কিত নিজের গাড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁর হাতে ছিল কিট ব্যাগ। ঠিক তখনই চার ব্যক্তি তাঁকে অনুসরণ করতে শুরু করে। তাঁদের একজনের হাতে ছিল বন্দুক।
অঙ্কিত গাড়ির কাছে পৌঁছানোর আগেই হামলাকারীরা গুলি ছুড়তে শুরু করে। একের পর এক গুলির শব্দে মুহূর্তেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে আশপাশে। পথচারীরা ছুটে নিরাপদ জায়গায় সরে যান। স্থানীয় দোকানিরাও দোকানের ভেতরে আশ্রয় নেন। কেউ কেউ পরিস্থিতি দেখার চেষ্টা করলেও গুলির শব্দ চলতে থাকায় দ্রুত আড়ালে চলে যান।
পুলিশের সূত্র বলছে, হামলায় মোট ১২টি গুলি ছোড়া হয়। আতঙ্ক ছড়াতে হামলাকারীরা কয়েকটি গুলি শূন্যেও ছোড়ে। তাঁদের কাছে ছিল দশমিক ৩০ ও দশমিক ৩২ ক্যালিবারের পিস্তল।
গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত অঙ্কিতকে স্থানীয় একটি কমিউনিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। ময়নাতদন্তের পর তাঁর শরীরে কতটি গুলি লেগেছিল এবং আঘাতের ধরন সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।
ঘটনাস্থল হরিয়ানা সীমান্ত থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে। পুলিশের ধারণা, হামলাকারীরা হরিয়ানা থেকে শামলিতে এসে থাকতে পারে।
বন্দুক, লড়াই আর দাপটের গান: শামলির বান্টি খেদা গ্রামের বাসিন্দা অঙ্কিত বালিয়ান হরিয়ানভি সংগীতজগতে পরিচিত মুখ ছিলেন। ইউটিউবেও তাঁর ছিল উল্লেখযোগ্য জনপ্রিয়তা। তাঁর চ্যানেলের গ্রাহকসংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৬৮ হাজারের বেশি।
অঙ্কিতের গানের ভিডিওতে প্রায়ই দেখা যেত বন্দুক, লড়াই ও বিলাসবহুল এসইউভি। তাঁর অনেক গানের কথায় উঠে আসত সহিংসতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, দাপট ও শত্রুতার বিষয়। কয়েকটি গান ইউটিউবে লাখ লাখবার দেখা হয়েছে।
তাঁর জনপ্রিয় গানগুলোর একটি ‘ভারি কোর্ট ম্যায় গোলি মারেঙ্গে মেরি জান’। গানটির নামের অর্থ-‘আদালতের মধ্যেই তোমাকে গুলি করব, প্রিয়’।
তবে গানের জগতের সেই বন্দুক-সহিংসতার আবহ যেন তাঁর বাস্তব জীবনের শেষ অধ্যায়ের সঙ্গে অস্বস্তিকরভাবে মিশে গেছে।
মৃত্যুর দুই ঘণ্টা আগে যে গান: মৃত্যুর মাত্র দুই ঘণ্টা আগে বুধবার ইনস্টাগ্রামে একটি ভিডিও পোস্ট করেছিলেন অঙ্কিত। ভিডিওতে তাঁকে গাড়িতে বসে একটি হরিয়ানভি গান গাইতে দেখা যায়।
গানের একটি লাইনের অর্থ-‘রাস্তায় হত্যা করো’।
এর কয়েক ঘণ্টা পরই রাস্তায় সশস্ত্র হামলার শিকার হয়ে প্রাণ হারান তিনি। ফলে অঙ্কিতের শেষ পোস্টটি এখন অনেকের কাছে এক ভয়াবহ কাকতালীয় ঘটনা হিসেবে আলোচনায় এসেছে।
তবে এই পোস্টের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো প্রত্যক্ষ যোগসূত্র আছে কি না, তা এখনো জানা যায়নি।
হত্যার দায় নিলো গোগি গ্যাং: অঙ্কিত হত্যার দায় স্বীকার করেছে কুখ্যাত গোগি গ্যাং। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে গ্যাংটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, অঙ্কিত তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। এমনকি গ্যাং-সংশ্লিষ্ট একটি ঘটনার ওপর তিনি গানও তৈরি করেছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে।
গ্যাং-সংশ্লিষ্ট বলে পরিচিত ভোলু শাহপুরিয়ার একটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকেও হুমকিমূলক পোস্ট দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘এটা কেবল শুরু, সবার পালা আসবে।’
ওই পোস্টে উত্তর প্রদেশ পুলিশকেও হুমকি দেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরো এমন ঘটনা ঘটতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
তবে গোগি গ্যাংয়ের এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
চার অজ্ঞাত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা: অঙ্কিতের বাবার অভিযোগের ভিত্তিতে চার অজ্ঞাত ব্যক্তির বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেছে পুলিশ। হামলাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে।
সিসিটিভি ফুটেজে হত্যাকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো ধরা পড়েছে। ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হামলাকারীদের শনাক্ত করার পাশাপাশি তাঁরা কোথা থেকে এসেছিল এবং হামলার পর কোন পথে পালিয়েছে, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
একজন গায়ক, যাঁর গানের কথায় বারবার বন্দুক, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সহিংসতার উপস্থিতি ছিল-শেষ পর্যন্ত তিনিই বাস্তবের সশস্ত্র হামলার শিকার হলেন। আর মৃত্যুর মাত্র দুই ঘণ্টা আগে গাওয়া ‘হত্যা’র গানটি এখন তাঁর মৃত্যুর বিবরণে যোগ করেছে এক অস্বস্তিকর সমাপতন। সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে
সানা/আপ্র/২৮/৮/২০২৬