নেপালের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও হড়পা বানে শত শত মানুষের প্রাণহানি এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন বলিউড অভিনেত্রী মনীষা কৈরালা। নিজের জন্মভূমির এই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠিত এনডিটিভি ওয়ার্ল্ড অন্বীক্ষা সম্মেলনে অংশ নিয়ে নেপালের ভয়াবহ বন্যা নিয়ে কথা বলেন মনীষা। সেখানে তিনি বলেন, যারা এই দুর্যোগে সবকিছু হারিয়েছেন, সবার আগে তাঁদের কথা ভাবতে হবে। তাঁদের জন্য প্রার্থনা করার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
মনীষার ভাষায়, “বিপুল মানুষের দুর্ভোগ দেখা সত্যিই হৃদয়বিদারক।”
নিজের শৈশবের স্মৃতির সঙ্গে বর্তমান বিপর্যয়ের তুলনা করে তিনি ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের কথাও স্মরণ করেন। বলেন, সেই ভূমিকম্প কীভাবে নেপালের মানুষের জীবন ও অবকাঠামো তছনছ করে দিয়েছিল, তা তাঁর মনে আছে। কিন্তু এবারের দুর্যোগের আকস্মিকতা ও ব্যাপকতা তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।
তিনি বলেন, নেপালে এমন ভয়াবহ বন্যা বা প্রকৃতির এমন রূপ অনেকেই আগে দেখেননি। এই কঠিন সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং তাঁদের সহায়তা করা সবার দায়িত্ব।
মনীষা কৈরালা নেপালেরই সন্তান। তাঁর পিতামহ বিশ্বেশ্বর প্রসাদ কৈরালা ছিলেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী। ফলে নিজের জন্মভূমির এই বিপর্যয়ে তাঁর আবেগঘন প্রতিক্রিয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
প্রাণহানি বাড়ছেই, নিখোঁজ শত শত
নেপালের তিব্বত সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় ২৬ আগস্ট সকালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা আঘাত হানে। বন্যার প্রবল স্রোত ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদীর পথ ধরে নেমে এসে ঘরবাড়ি, সেতু, সড়ক, বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ভাসিয়ে নেয়। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধারকাজও কঠিন হয়ে পড়েছে।
নেপাল পুলিশের হিসাবে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪৬৯ হয়েছে। বিভিন্ন জেলায় নদী ও ধ্বংসস্তূপ থেকে মরদেহ উদ্ধারের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। চিতওয়ান ও নওয়ালপরাসিসহ ভাটির কয়েকটি জেলায় বিপুলসংখ্যক মরদেহ পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে বহু মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
নেপাল পর্যটন বোর্ডের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে ১২৭ জন নেপালি নাগরিকসহ ৬৬৭ জন পর্যটক ও ভ্রমণকারী নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের অবস্থান শনাক্ত করতে পর্যটন সংস্থা, ভ্রমণ প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনী সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
নেপালি সেনাবাহিনী, পুলিশ ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী উদ্ধার ও তল্লাশি অভিযানে নিয়োজিত রয়েছে। দুর্গম এলাকায় হেলিকপ্টার ব্যবহার করে আটকে পড়া মানুষকে সরিয়ে নেওয়া এবং জরুরি ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। নদীর তীর, বসতি ও ধ্বংসস্তূপে স্থলপথেও চলছে তল্লাশি।
নতুন করে বন্যার শঙ্কা
প্রথম দফার বিপর্যয়ের মধ্যেই নেপাল-তিব্বত সীমান্তে নতুন করে ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসের কারণে নদীর গতিপথে বাধা সৃষ্টি হয়ে একটি প্রাকৃতিক জলাধার বা প্রতিবন্ধক হ্রদ তৈরি হয়েছে। সেখানে বিপুল পরিমাণ পানি জমে যাওয়ায় হ্রদটির বাঁধ ভেঙে গেলে ভাটির দিকে আবার প্রবল ঢল নেমে আসতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন তৈরি জলাধারটির পানি ইতোমধ্যে উপচে পড়তে শুরু করেছে এবং এর আয়তন ২৫ লাখ ঘনমিটারেরও বেশি হয়েছে। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় উদ্ধারকাজ সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়েছে এবং নদী অববাহিকার নিচের দিকের বাসিন্দাদের সতর্ক রাখা হয়েছে।
বন্যার উৎস ও ভয়াবহতার কারণ নিয়ে তদন্ত চলছে। প্রাথমিক বিশ্লেষণে তিব্বত দিক থেকে প্রবল জলপ্রবাহ ভোতে কোশি নদীতে ঢুকে নেপালের দিকে নেমে আসার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে হিমবাহ ধস, বরফ-শিলা ধস ও ভূমিধসের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের স্মৃতি এখনো নেপালের মানুষের মনে তাজা। তার এক দশক পর এমন ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা দেশটির বহু অঞ্চলে নতুন করে বিপর্যয়ের চিহ্ন রেখে যাচ্ছে। আর সেই ধ্বংসযজ্ঞ দেখে জন্মভূমির মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যে আবেদন জানিয়েছেন মনীষা কৈরালা, তা এখন কেবল একজন তারকার আবেগ নয়-বিপর্যস্ত মানুষের জন্য সহমর্মিতারও এক মানবিক আহ্বান।
সানা/আপ্র/২৮/৮/২০২৬