সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে সোফা তৈরির একটি কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত নওগাঁর আত্রাই উপজেলার সাত প্রবাসীর জানাজা একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়েছে। শুক্রবার (২৮ আগস্ট) সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে আত্রাই উপজেলার মোল্লা আজাদ মেমোরিয়াল সরকারি কলেজ মাঠে তাঁদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
জানাজায় সংসদ সদস্য, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, পুলিশ সদস্য, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, স্বজনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। জানাজা শেষে সাতজনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে মরদেহগুলো নিজ নিজ গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে দাফনের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়।
নিহত সাতজন হলেন-আত্রাই উপজেলার উদনপৈ গ্রামের মো. ফরিদ, গণ্ডগোহালী গ্রামের রুবেল প্রামাণিক, একই গ্রামের মোহন আলী ও তাঁর ছোট ভাই সুমন আলী, কলিমুদ্দিন, ডুবাই গ্রামের সোহেল রানা এবং পারকাসুন্দা গ্রামের আব্দুল জলিল সরদার।
জানাজার আগে সাতজনের খাটিয়া পাশাপাশি রাখা হলে শোকের পরিবেশ আরো ভারী হয়ে ওঠে। গণ্ডগোহালী গ্রামের নিহত দুই সহোদর মোহন আলী ও সুমন আলীর বাবা গুফফার প্রামাণিক কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, তাঁর দুই ছেলে একসঙ্গে চলে গেছেন। তিনি সবার কাছে তাঁদের জন্য দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
জানাজায় উপস্থিত ছিলেন নওগাঁ-৬ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মোহাম্মদ রেজাউল ইসলাম রেজু, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম, আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান, আত্রাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহবুব আলমসহ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
দেশে ফিরেছে পরিচয় শনাক্ত নয়জনের মরদেহ: গত বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টার দিকে সৌদি আরবের অগ্নিকাণ্ডে পরিচয় শনাক্ত হওয়া নয়জনের মরদেহ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে ঢাকায় পৌঁছায়। তাঁদের মধ্যে আত্রাইয়ের সাতজন ছাড়াও নাটোরের নলডাঙ্গার রবিউল ইসলাম এবং রাজশাহীর বাগমারার শ্যামল উদ্দিন মাঝি ছিলেন। পরে প্রশাসনের সহায়তায় মরদেহগুলো আত্রাই ও সংশ্লিষ্ট এলাকায় পৌঁছে দেওয়া হয়।
গত ৯ আগস্ট রিয়াদের শিফা থানার মুসা সানাইয়া শিল্প এলাকায় একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশি শ্রমিক নিহত হন। কারখানাটিতে মোট ১৭ বাংলাদেশি কর্মরত ছিলেন; ঘটনার সময় বাইরে থাকায় একজন কর্মী প্রাণে বেঁচে যান।
সৌদি কর্তৃপক্ষ আঙুলের ছাপ পরীক্ষার মাধ্যমে নিহতদের মধ্যে নয়জনের পরিচয় শনাক্ত করে। তাঁদের মরদেহ দেশে পাঠানো হয়েছে। এখনো সাতজনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তাঁদের মরদেহ দ্রুত শনাক্ত করে দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্বজনেরা।
আত্রাইয়ের মধ্যবোয়ালী গ্রামের নিহত মিনহাজের মা পারুল বিবি ছেলের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার আকুতি জানিয়েছেন। তিনি শেষবারের মতো ছেলের মুখ দেখতে চান বলে জানান।
নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, অগ্নিকাণ্ডে নিহত জেলার বাকি বাসিন্দাদের পরিচয় শনাক্ত করে মরদেহ দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া চলছে। এ জন্য ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করা হচ্ছে।
বাগমারায় শ্যামলের বাড়িতে কান্নার মাতম: একই অগ্নিকাণ্ডে নিহত রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার শ্যামল উদ্দিন মাঝির মরদেহও বৃহস্পতিবার দেশে পৌঁছেছে। শুক্রবার ভোরে তাঁর মরদেহ বাগমারার ঝিকড়া ইউনিয়নের মরুগ্রাম ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হয়।
শ্যামল ছিলেন তিন মেয়ের বাবা। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতার আশায় আট বছর আগে ধারদেনা করে তিনি সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন। তাঁর মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর স্ত্রী রশিদা খাতুনসহ স্বজনেরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। কফিন খোলার পর পোড়া মুখ দেখে স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।
শ্যামলের স্ত্রী রশিদা খাতুন শোকের পাশাপাশি সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগে পড়েছেন। তাঁর বড় বোন হালিমা খাতুন ভাইয়ের রেখে যাওয়া সন্তানদের ভবিষ্যৎ এবং ঋণের টাকা কীভাবে পরিশোধ হবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তার কথা জানান।
ঝিকড়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সাইদুজ্জামান অল্প সময়ের মধ্যে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে দেওয়ায় সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। একই সঙ্গে তিনি শ্যামলের পরিবারের জন্য সরকারি আর্থিক সহায়তার দাবি করেন।
নওগাঁ-৬ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মোহাম্মদ রেজাউল ইসলাম রেজু জানান, নিহতদের পরিবারগুলোকে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও সরকারি সহায়তা অব্যাহত থাকবে এবং বাকি মরদেহগুলো দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে।
সানা/আপ্র/২৮/৮/২০২৬