গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬

মেনু

ইতিহাসে নেই মোগলদের প্রতিরোধ করা ভারতীয় মুসলিম নারীরা

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯:৪২ পিএম, ১৯ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ২০:৪১ এএম ২০২৬
ইতিহাসে নেই মোগলদের প্রতিরোধ করা ভারতীয় মুসলিম নারীরা
ছবি

ছবি সংগৃহীত

ভারতীয় উপমহাদেশে মধ্যযুগে এমন কয়েকজন মুসলিম নারী ছিলেন- যারা শুধু রাজনীতি বা প্রশাসনেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেননি, প্রয়োজনে মোগল সম্রাটদের সামরিকভাবে প্রতিরোধও করেছেন। কিন্তু তাদের নাম ইতিহাসের বর্ণনায় উঠে এসেছে খুব কম।

বাহমানি সালতানাত থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে হায়দরাবাদ রাজ্য ভারতীয় উপমহাদেশের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এলাকা শাসন করেছে। এটি আয়তনে ফ্রান্স বা ইতালির মতো পরাশক্তিগুলোর সমকক্ষ ছিল। দাক্ষিণাত্যের আহমেদনগর, বিজাপুর, গোলকোন্ডা, বিদার, দৌলতাবাদ ছিল এর অংশ। এসব অঞ্চল শুধু শক্তিশালী রাজ্যই ছিল না; একই সঙ্গে পারস্য, আরব, আফ্রিকা ও ভারত মহাসাগরীয় বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্য এবং সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিত ছিল। কৃষি, বস্ত্র, হীরার খনি, ঘোড়ার ব্যবসা এবং সমুদ্রভিত্তিক বাণিজ্যের কারণে এই অঞ্চল এতাই সমৃদ্ধ ছিল যে আকবর থেকে শুরু করে আওরঙ্গজেব পর্যন্ত প্রায় সব মোগল সম্রাটই বারবার এখানকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

দাক্ষিণাত্যের এই ইতিহাসকে যদি দিল্লি সাম্রাজ্যের বাইরে জানার চেষ্টা করেন, তাহলে দেখতে পাবেন, এখানে মুসলিম নারীরা শুধু রাজপরিবারের সদস্য ছিলেন না; তারা শাসন করেছেন, কূটনীতি পরিচালনা করেছেন, সেনাবাহিনীকে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং রাজনৈতিক জোট গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। আসুন, সেই ইতিহাসের গল্প শুনি।

দাক্ষিণাত্যের প্রথম নারী শাসক: ১৫ শতকে বাহমানি সালতানাতে এক দশকের বেশি সময় ধরে সফলভাবে রাজ্য শাসন করেছিলেন আগা নার্গিস বানু। ১৪৬১ সালে তার স্বামী হুমায়ুন শাহ মৃত্যুর আগে রাজকীয় শয্যায় শুয়ে রাজ্যের প্রশাসনিক সব ক্ষমতা নার্গিস বানুর হাতে ন্যস্ত করে যান। হুমায়ুন শাহের মৃত্যুর পর রাজ্য পরিচালনার পূর্ণ দায়িত্ব নেন নার্গিস বানু।

সমসাময়িক দলিল অনুযায়ী মন্ত্রীরা তার পরামর্শ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্ত নিতেন না। রাজকীয় প্রাসাদের অন্তরালে থেকেও তিনি কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিতেন, প্রজাদের বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি ফিরিয়ে দিতেন। এ ছাড়া বন্দীদের মুক্তি দিতেন, আর্থিক সংকট মোকাবিলা করতেন এবং প্রশাসনকে স্থিতিশীল রাখতেন। তার শাসনামল ছিল যুদ্ধবিক্ষুব্ধ। ওডিশার রাজা আক্রমণ করলে তিনি অশ্বারোহী বাহিনী গড়ে তোলেন। পরে মালওয়ার সুলতান মাহমুদ খিলজি আক্রমণ চালিয়ে বাহমানি বাহিনীকে বিপাকে ফেললে আগা নার্গিস রাজধানীর প্রশাসন ফিরোজাবাদে স্থানান্তর করেন।

আগা নার্গিস বানুর আরেকটি বড় অবদান ছিল মাহমুদ গাওয়ানের উত্থান। পরবর্তী সময়ে তিনি বাহমানি ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে পরিচিতি পান। ঐতিহাসিকেরা বলেন, আগা নার্গিসের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া মাহমুদ গাওয়ানের সেই অবস্থানে পৌঁছানো সম্ভব হতো না। গোয়া অভিযানে সাফল্যের পর আগা নার্গিস গাওয়ানকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ভাই’ ডেকে সম্মানিত করেন। সে সময় এটি ছিল বিরল সম্মান। ১৪৭২ সালে বেলগাঁওয়ের একটি সামরিক শিবিরে আগা নার্গিস বানুর মৃত্যু হয়। শেষ সময় পর্যন্ত তিনি সেনাবাহিনীর সঙ্গেই ছিলেন।

তলোয়ার হাতে রাজ্য রক্ষার লড়াই: চাঁদ বিবির মা খুঞ্জা হুমায়ুন এসেছিলেন মধ্য এশিয়ার তুর্কো-মঙ্গোলীয় রাজনৈতিক ঐতিহ্য থেকে- যেখানে নারীদের শাসনকার্যে অংশ নেওয়া খুব স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে বিবেচিত হতো। আহমেদনগরের সুলতান হুসাইন নিজাম শাহের মৃত্যুর পর তাদের সন্তান মুর্তজা সিংহাসনে বসলেও রাজ্য পরিচালনার মূল চাবিকাঠি ছিল খুঞ্জা হুমায়ুনের হাতে। দরবারের ইতিহাসবিদ তাবা তাবাই এটিকে পুরুষ শাসকের দুর্বলতা বলে প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করলেও এ কথা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন, খুঞ্জা যেভাবে রাজকার্য চালাতেন, দরবারের সবাই তাকে রাজার মতোই মান্য করতেন।

১৫৬৭ সালে বিজাপুরের সুলতান আদিল শাহ যখন আহমেদনগর আক্রমণ করেন, তখন খুঞ্জা হুমায়ুন নিজেই সামরিক জোট গঠন করেন এবং সেনাদলের সঙ্গে রণক্ষেত্রে সশরীরে উপস্থিত হন। তার সামরিক প্রস্তুতি দেখে হতবাক হয়ে আদিল শাহ পিছিয়ে আসতে এবং নতুন শান্তিচুক্তি করতে বাধ্য হন। পরবর্তী সময়ে ১৫৬৯ সালে তার ছেলে মুর্তজা চক্রান্ত করে মাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চাইলে খুঞ্জা হুমায়ুন পিছু হটেননি। তিনি ঘোড়ায় চড়ে, হাতে তির-ধনুক এবং তলোয়ার নিয়ে লড়াইয়ের জন্য রাজপ্রাসাদ থেকে বেরিয়ে আসেন। এরপর তাকে বন্দী করা হয়। আরও জানা যায়, কারাগারেই তার মৃত্যু হয়।

সম্রাট আকবরের বাহিনীকেও যিনি হার মানিয়েছিলেন; দাক্ষিণাত্যের বিখ্যাত ও রোমাঞ্চকর চরিত্র হলেন চাঁদ বিবি। তিনি ছিলেন আহমেদনগর নিজাম শাহি বংশের কন্যা এবং বিজাপুরের আদিল শাহি রাজবংশের রানি। পরবর্তী সময়ে তিনি বিজাপুর ও আহমেদনগর উভয় রাজ্যের শাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৫৯৪ সালে মোগল সম্রাট আকবর আড্ডায় এক খোঁচা মেরে বলেছিলেন, নারীদের ঘোড়ায় চড়া শোভা পায় না। ঠিক তার পরের বছর, ১৫৯৫ সালে চাঁদ বিবি শরীরে বর্ম জড়িয়ে, মুখে পর্দা টেনে সেনাবাহিনীর সামনে দাঁড়িয়ে আকবরের বিশাল মোগল বাহিনীকে যুদ্ধে ধুলা খাইয়ে দেন! ১৫৯৬ সালে তিনি মোগল রাজপুত্র মুরাদের সঙ্গে দর-কষাকষি করে শান্তিচুক্তি করেন এবং পুরো দাক্ষিণাত্যের রাজ্যগুলোকে মোগলদের বিরুদ্ধে একজোট করেন। ইতিহাসে চাঁদ বিবিকে শুধু একজন লড়াকু যোদ্ধা রানি হিসেবে দেখা হলেও তিনি ছিলেন দক্ষ কূটনীতিক। অভ্যন্তরীণ দলাদলি সামলানো আর জোট রাজনীতিতে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত।

সাহিত্য, শিক্ষা ও কূটনীতিতে দক্ষ আরেক শাসক: চাঁদ বিবির এক শ বছর পর বিজাপুরের খাদিজা সুলতানা তৎকালীন মুসলিম নারীদের ক্ষমতার ধারণাকে আরও উঁচুতে নিয়ে যান। তবে তার ক্ষমতার প্রকাশ যুদ্ধক্ষেত্রে নয়; সাহিত্য, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও কূটনীতির মাধ্যমে। তিনি দাক্ষিণাত্যের সাহিত্যচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তার পৃষ্ঠপোষকতায় রচিত হয় ‘খাওয়ারনামা’, যেখানে ইমাম আলীর বীরত্বগাথা বর্ণনা করা হয়েছে।

ঐতিহাসিকরা বলেন, দখনি ভাষায় সাহিত্যকর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করা প্রথম নারী ছিলেন খাদিজা সুলতানা। তার উদ্যোগে ‘হাশত বিহিশ্ত’ ও ‘ইউসুফ জুলেখা’র মতো গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্মও রচিত হয়। ১৬৬১ সালে তিনি ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একটি জাহাজে চেপে হজ পালনে যান। সে সময় একজন মুসলিম রানির বিদেশি জাহাজে ভ্রমণ করায় নারীর পর্দা এবং সামাজিক রীতিনীতি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। ডাচদের বর্ণনায় উঠে আসে, খাদিজা সুলতানা কত বিশাল বহর নিয়ে চলতেন এবং তিনি কত অনায়াসে একাধিক ভাষায় চিঠি লিখতে পারতেন।

আওরঙ্গজেবের সঙ্গে আলোচনায় বসেছিলেন যিনি: দাক্ষিণাত্যের আরেক প্রভাবশালী নারী ছিলেন হায়াত বখশি বেগম। ১৫৯১ সালে তার জন্ম। তার জন্ম ঠিক ঠিক সেই সময়, যখন চাঁদ বিবি আহমেদনগরের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছিলেন। ফলে তিনি এমন এক পরিবেশে বড় হন, যেখানে নারী নেতৃত্বের বাস্তব উদাহরণ ছিল। পরবর্তী সময়ে তিনি হায়দরাবাদের কুতুব শাহি বংশের টানা তিনজন শাসকের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন। তার রাজনৈতিক প্রভাব এতাই ছিল, ১৬৫৬ সালে তিনি নিজেই ছেলে আবদুল্লাহ কুতুব শাহর পক্ষে মোগল যুবরাজ আওরঙ্গজেবের সঙ্গে শান্তি আলোচনা করেন।

শুধু রাজনীতিতেই নয়, জনকল্যাণমূলক কাজেও হায়াত বখশি বেগম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। হায়দরাবাদের বিখ্যাত মাসাব ট্যাংক মূলত তার উদ্যোগেই নির্মিত জলাধার। ‘মা-সাহিবা’ শব্দ থেকে এর নামের উৎপত্তি বলে মনে করা হয়। এ ছাড়া তিনি মসজিদ, সরাইখানা, কূপসহ নানা জনকল্যাণমূলক স্থাপনা নির্মাণ করেন। হায়দরাবাদের কুতুব শাহি সমাধিক্ষেত্রে তার সমাধিই একমাত্র নারীর সমাধি, যা পুরুষ সুলতানদের সমাধির সমমর্যাদা পায়।

আগা নার্গিস বানু, খুঞ্জা হুমায়ুন, চাঁদ বিবি, খাদিজা সুলতানা ও হায়াত বখশি বেগম- এই পাঁচজনের জীবন প্রমাণ করে, মধ্যযুগের ভারতীয় ইতিহাস শুধু সম্রাটদের ইতিহাস নয়; নারী নেতৃত্ব, আঞ্চলিক রাজনীতি এবং বহু সাংস্কৃতিক রাষ্ট্রব্যবস্থারও ইতিহাস।

কেএমএএ/আপ্র/১৯.০৮.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

শোষণমূলক ও বিপজ্জনক কাজে নিয়োজিত লেখাপড়াবঞ্চিত শিশুরা
১৯ আগস্ট ২০২৬

শোষণমূলক ও বিপজ্জনক কাজে নিয়োজিত লেখাপড়াবঞ্চিত শিশুরা

পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি বেশি শিশু এখন নগর ও শহরে বাস করে। অনেকেই শিক্ষা, চিকিৎসা ও বিনোদ...

স্কুলগেটে ময়লার ভাগাড়: হুমকিতে শিশুদের স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ
১৯ আগস্ট ২০২৬

স্কুলগেটে ময়লার ভাগাড়: হুমকিতে শিশুদের স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ

প্রতিদিন সকালে হাজারো শিশু বইয়ের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে স্কুলে যায় নতুন কিছু শেখার স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু অনে...

আন্তর্জাতিক ভলান্টিয়ার কর্পসে বাংলাদেশের প্রতিনিধি জোহরা
১৯ আগস্ট ২০২৬

আন্তর্জাতিক ভলান্টিয়ার কর্পসে বাংলাদেশের প্রতিনিধি জোহরা

রাশিয়ার খান্তি-মানসিস্ক স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল-ইউগ্রায় অনুষ্ঠিত ‘আন্তর্জাতিক আর্কটিক ভলান্টিয়ার কর্পস’-...

ঢাবির সান্ধ্য আইন নারী স্বাধীনতার অন্তরায় ও বৈষম্যমূলক
১৯ আগস্ট ২০২৬

ঢাবির সান্ধ্য আইন নারী স্বাধীনতার অন্তরায় ও বৈষম্যমূলক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ছাত্রীহলগুলোয় রাত ১০টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত কার্যকর থাকা সান্ধ্য আইনকে ন...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

বিএনপি সরকারের ছয় মাস: প্রত্যাশা কতটা, প্রাপ্তি কতখানি

আজ ১৭ আগস্ট সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হচ্ছে। এর আগে ছয় মাসের কাজের মূল্যায়নে সরকার যেমন বেশ কিছু অর্জনের কথা বলছে, তেমনি বিরোধী রাজনৈতিক দল, অর্থনীতিবিদ ও বিভিন্ন পর্যায়ের নাগরিকদের প্রশ্নও সামনে এসেছে। সরকারের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দাবি করেছেন, ছয় মাসের লক্ষ্য অনুযায়ী মোটামুটি সব কর্মসূচিই পূরণ হয়েছে-কোথাও ৯০, কোথাও ৯৫ এবং কোথাও শতভাগ বাস্তবায়ন হয়েছে। প্রিয় পাঠক, সরকার ভালো করছে নাকি মন্দ করছে? হ্যাঁ বা না জানান।

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 2 দিন আগে