মহাকাশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরিচালনার সক্ষমতা অর্জনের পথে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অতিক্রম করেছে মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গুগল। পৃথিবীর কক্ষপথে পাঠানো নিজেদের পরীক্ষামূলক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা স্যাটেলাইটে সফলভাবে এআই মডেল চালু করেছে প্রতিষ্ঠানটি। শুধু তাই নয়, মহাকাশে বসানো চিপের মাধ্যমে পরিচালিত এআইকে দিয়ে ছোট কবিতাও লিখিয়েছে গুগলের গবেষকেরা।
গত মাসে স্পেসএক্সের রকেটে করে কক্ষপথে পাঠানো স্যাটেলাইটটি গুগলের দীর্ঘমেয়াদি ‘প্রজেক্ট সানক্যাচার’-এর পরীক্ষামূলক উদ্যোগের অংশ। এ প্রকল্পের লক্ষ্য সৌরশক্তিনির্ভর মহাকাশভিত্তিক তথ্যকেন্দ্র গড়ে তোলা, যেখানে এআই পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং অবকাঠামো স্থাপন করা হবে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুগলের গবেষকেরা সম্প্রতি মহাকাশে থাকা স্যাটেলাইটের টেনসর প্রসেসিং ইউনিটে (টিপিইউ) চালু করা ‘জেমা ৪’ এআই মডেলের কাছে মহাকাশের জীবন নিয়ে একটি হাইকু বা তিন পঙ্ক্তির ছোট কবিতা লেখার অনুরোধ পাঠান। জবাবে মডেলটি লেখে-
‘নিচে নীল মার্বেল
তথ্য বয়ে চলে নীরব ছন্দে
তারার আলো আমার সত্তাকে প্রাণশক্তি জোগায়।’
গুগলের দাবি, পৃথিবীর কক্ষপথে সক্রিয় কোনো তথ্যকেন্দ্রের উপযোগী টিপিইউ থেকে এআইয়ের স্বয়ংক্রিয় উত্তর তৈরির ঘটনা এটিই প্রথম। অর্থাৎ, মহাকাশে অবস্থানরত স্যাটেলাইটের নিজস্ব কম্পিউটিং চিপ ব্যবহার করে এআই মডেলটি অনুরোধের উত্তর তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
গুগলের ‘প্যারাডাইমস অব ইন্টেলিজেন্স’ দলের প্রধান ট্র্যাভিস বেলস এক ব্লগ পোস্টে এ সাফল্যের বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, তাঁদের টিপিইউগুলো মহাকাশে নির্ভরযোগ্যভাবে কাজের চাপ সামলাতে পারে, পরীক্ষায় তা প্রমাণিত হয়েছে। ২০২৭ সালে দুটি সংযোগ স্যাটেলাইট পাঠানোর পরবর্তী মাইলফলক অর্জনের পথও এতে সুগম হয়েছে। তাঁর ভাষায়, চিপগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে মহাকাশে কাজ করার সক্ষমতা অর্জন করেছে, যা দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।
গুগলের ‘প্রজেক্ট সানক্যাচার’-এর মূল লক্ষ্য পৃথিবীর বাইরে এআই পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা। বিপুল সৌরশক্তির সহজলভ্যতা এবং মহাকাশের নিম্ন তাপমাত্রাকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে এআইয়ের ক্রমবর্ধমান কম্পিউটিং চাহিদা পূরণ করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি। পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে সৌরশক্তিচালিত স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তথ্য প্রক্রিয়াকরণের সম্ভাবনাও যাচাই করছে তারা।
তবে মহাকাশে এআই পরিচালনার ক্ষেত্রে বেশ কিছু প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে। পরবর্তী ধাপে স্যাটেলাইটে থাকা চিপগুলো মহাজাগতিক ক্ষতিকর বিকিরণ এবং চরম তাপমাত্রার ওঠানামা কতটা সহ্য করতে পারে, তা পরীক্ষা করবে গুগল।
এরপর ২০২৭ সালে দুটি এআই স্যাটেলাইটের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। এ পরীক্ষার মাধ্যমে মহাকাশে একাধিক স্যাটেলাইটের মধ্যে উচ্চগতির আলোকভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাই করা হবে। গবেষকদের ধারণা, সফল হলে ভবিষ্যতে বিপুলসংখ্যক এআই স্যাটেলাইট নিয়ে বড় নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পথ তৈরি হতে পারে।
মহাকাশে তথ্যকেন্দ্র স্থাপনের প্রতিযোগিতায় গুগল একা নয়। স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্কও পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে কক্ষপথীয় তথ্যকেন্দ্র হিসেবে কাজ করতে পারে, এমন বিপুলসংখ্যক স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা করেছেন। তাঁর পরিকল্পনায় প্রায় ১০ লাখ স্যাটেলাইট পাঠানোর বিষয়টি রয়েছে।
তবে এ ধরনের উদ্যোগের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা, বিপুল ব্যয় এবং পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের আশঙ্কা, বিপুলসংখ্যক স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা হলে মহাকাশে সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়বে। একই সঙ্গে মহাকাশ বর্জ্যের পরিমাণও বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যেতে পারে।
সানা/ডিসি/আপ্র/০৩/১১/২০২৬