পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু গাছ হাইপেরিয়ন কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যাচু অব লিবার্টির উচ্চতাকেও ছাড়িয়ে গেছে স্পেসএক্সের তৈরি স্টারশিপ রকেট। দুই স্তরের এই রকেটের মোট উচ্চতা ৪০৭ ফুট। জ্বালানিসহ এর ওজন পাঁচ হাজার টনের বেশি। আকার ও উৎক্ষেপণক্ষমতার দিক থেকে এটি এযাবৎকালে তৈরি সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী রকেট।
রকেটটির উৎক্ষেপণ থ্রাস্ট প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ১০ হাজার পাউন্ড-ফোর্স। প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম এনগ্যাজেটের প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
২০২৩ সালের এপ্রিলে স্টারশিপের প্রথম পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণের সময় বুস্টার থেকে নির্গত প্রচণ্ড তাপে উৎক্ষেপণ মঞ্চের কংক্রিট ভেঙে যায়। ভূগর্ভস্থ মাটিও গভীর পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ৩৮৫ একর এলাকাজুড়ে ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে পড়ে। ওই সময় রকেটটির বুস্টার ১ কোটি ৬৭ লাখ পাউন্ড থ্রাস্ট তৈরি করতে সক্ষম ছিল, যা ২৮ সেপ্টেম্বরের উৎক্ষেপণে ব্যবহৃত সংস্করণের চেয়ে কিছুটা কম।
স্টারশিপের দুটি প্রধান অংশ রয়েছে। নিচের অংশটির নাম ‘সুপার হেভি’। ২৩৬ দশমিক ২ ফুট দীর্ঘ এই শক্তিশালী বুস্টার রকেটটিকে উৎক্ষেপণ মঞ্চ থেকে মহাকাশের দিকে তুলে নেওয়ার প্রাথমিক ধাক্কা দেয়। এর ওপরে রয়েছে ১৭০ দশমিক ৬ ফুট দীর্ঘ স্টারশিপ মহাকাশযান।
এত বড় আকারের এই রকেট তৈরির পেছনে স্পেসএক্সের লক্ষ্যও সুদূরপ্রসারী। বড় আকারের পণ্য, ভবিষ্যতে মানুষ এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পৃথিবীর কক্ষপথের বাইরে পরিবহনের উপযোগী করে এটি তৈরি করা হয়েছে। একই সঙ্গে রকেটের দুই অংশই ফিরিয়ে এনে পুনরায় ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
যেভাবে তৈরি হয় বিপুল উৎক্ষেপণক্ষমতা: সুপার হেভি বুস্টারে রয়েছে ৩৩টি র্যাপ্টর ইঞ্জিন। এসব ইঞ্জিনে তরল মিথেন ও তরল অক্সিজেন জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সম্মিলিতভাবে ইঞ্জিনগুলো প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ১০ হাজার পাউন্ড-ফোর্স থ্রাস্ট তৈরি করতে পারে।
তুলনায়, যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার স্পেস লঞ্চ সিস্টেম রকেটের সর্বোচ্চ থ্রাস্ট ৮৮ লাখ থেকে ৯৪ লাখ পাউন্ড-ফোর্স। অর্থাৎ উৎক্ষেপণের সময় স্টারশিপের বুস্টার এর চেয়েও বেশি শক্তি তৈরি করতে সক্ষম।
বুস্টার বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর মহাকাশযানের যাত্রা অব্যাহত থাকে ওপরের অংশের ছয়টি ইঞ্জিনের সাহায্যে। এর মধ্যে তিনটি সাধারণ র্যাপ্টর ইঞ্জিন এবং তিনটি মহাকাশে ব্যবহারের উপযোগী র্যাপ্টর ভ্যাকুয়াম ইঞ্জিন। স্পেসএক্সের তথ্য অনুযায়ী, ওপরের অংশটি প্রায় ৩৫ লাখ পাউন্ড-ফোর্স থ্রাস্ট তৈরি করতে পারে। তবে রকেটের উৎক্ষেপণ থ্রাস্ট হিসাব করা হয় মূলত বুস্টারের শক্তির ভিত্তিতে।
শুধু শক্তিশালী ইঞ্জিন থাকলেই এত ভারী রকেট মহাকাশে পাঠানো সম্ভব নয়। এর জ্বালানি ধারণক্ষমতাও বিশাল। সুপার হেভি বুস্টারে প্রায় ৩ হাজার ৬৫০ মেট্রিক টন এবং স্টারশিপের ওপরের অংশে আরো ১ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন জ্বালানি রাখা যায়। সব মিলিয়ে জ্বালানির পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন।
এত বিপুল ওজন নিয়েও সফলভাবে মহাকাশে পৌঁছাতে রকেটটির প্রতিটি স্তরের সঠিক সময়ে বিচ্ছিন্ন হওয়া, ইঞ্জিনের কার্যকারিতা এবং উৎক্ষেপণের আগে নিখুঁত পরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চাঁদে যেতে কক্ষপথেই নিতে হবে জ্বালানি: প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যতই বাড়ুক, চাঁদে নভোচারী পাঠানোর পরিকল্পনায় স্টারশিপকে পৃথিবীর কক্ষপথে পুনরায় জ্বালানি নিতে হবে। কারণ, চাঁদে অবতরণের জন্য তৈরি স্টারশিপ ল্যান্ডার কক্ষপথে পৌঁছানোর আগেই জ্বালানির বড় একটি অংশ ব্যবহার করে ফেলবে।
এ জটিল অভিযান পরিচালনায় স্পেসএক্স ও নাসা কয়েক ধাপের পরিকল্পনা করেছে। প্রথমে পৃথিবীর কক্ষপথে পাঠানো হবে একটি বিশেষায়িত জ্বালানি ভাণ্ডার বা ‘প্রপেল্যান্ট ডিপো’। এরপর একাধিক ট্যাংকার স্টারশিপ সেখানে গিয়ে জ্বালানি সরবরাহ করবে। সবশেষে চন্দ্রযান বা ল্যান্ডারটি কক্ষপথে পৌঁছে ওই ভাণ্ডার থেকে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহ করবে।
নাসার আর্টেমিস কর্মসূচির আওতায় নভোচারীরা ওরিয়ন মহাকাশযানে চড়ে চাঁদের উদ্দেশে যাত্রা করবেন। তার আগেই পৃথিবীর কক্ষপথে স্টারশিপ ল্যান্ডার ও জ্বালানি সরবরাহের পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। নভোচারীরা কক্ষপথে আগে থেকে প্রস্তুত রাখা ল্যান্ডারের সঙ্গে যুক্ত হবেন। এরপর সেটি তাঁদের চাঁদের কক্ষপথে নিয়ে যাবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, স্টারশিপ ল্যান্ডার দুই নভোচারীকে চাঁদের পৃষ্ঠে নামাবে এবং পরে তাঁদের আবার কক্ষপথে ফিরিয়ে আনবে।
তবে মহাকাশের অত্যন্ত শীতল পরিবেশে জ্বালানি সংরক্ষণ এবং এক মহাকাশযান থেকে অন্যটিতে তা স্থানান্তর করা বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ। এ কারণে জ্বালানি ভাণ্ডার স্থাপন, একাধিক ট্যাংকারের মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহ এবং নির্ধারিত ধাপগুলো যথাযথভাবে সম্পন্ন করা চাঁদে মানুষ পাঠানোর এই অভিযানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সানা/ডিসি/আপ্র/০১/১১/২০২৬