পুলিশি কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ায় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্য আরো গভীর হওয়ার আশঙ্কা করছেন গবেষকেরা। তাঁদের মতে, অতীতের পক্ষপাতদুষ্ট অপরাধের তথ্যের ভিত্তিতে অপরাধপ্রবণ এলাকা শনাক্ত বা অপরাধের পূর্বাভাস দেওয়া হলে বিদ্যমান বৈষম্য প্রযুক্তির মাধ্যমে আরো জোরালো হতে পারে।
এ ঝুঁকি মোকাবিলায় পুলিশি কাজে ব্যবহৃত তথ্য যাচাই, পক্ষপাত শনাক্ত এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সিদ্ধান্তে মানুষের কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন স্কুলের ডিজিটাল ন্যায়বিচারবিষয়ক সহযোগী অধ্যাপক ড. ক্যারোলিন ম্যাকে বলেন, পুলিশ যেসব তথ্য ব্যবহার করে, সেগুলো যাচাই করে পক্ষপাত শনাক্ত ও দূর করতে হবে। রাষ্ট্রীয় পুলিশি কার্যক্রম অবশ্যই মানুষের তদারকিতে থাকা উচিত।
ব্রিটিশ তরুণ বিজ্ঞান লেখক অ্যাড্রিয়ান ড্রেজের পুরস্কারজয়ী একটি প্রবন্ধেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও পুলিশি কার্যক্রমের ঝুঁকি তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৬ সালের তরুণ বিজ্ঞান লেখক পুরস্কারজয়ী ওই প্রবন্ধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে এমন এক মানচিত্রকারের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, যিনি পুরোনো মানচিত্রের ভিত্তিতে নতুন শহরের মানচিত্র আঁকেন। ফলে পুরোনো মানচিত্রের ভুল ও পক্ষপাত নতুন মানচিত্রেও থেকে যেতে পারে।
পুলিশি কার্যক্রমেও একই ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। অতীতের অপরাধের তথ্য বিশ্লেষণ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোনো এলাকাকে অপরাধপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করলে সেখানে পুলিশের টহল ও নজরদারি বাড়তে পারে। এতে ওই এলাকায় অপরাধ বেশি শনাক্ত ও নথিভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে সেই তথ্যের ভিত্তিতে এলাকাটিকে আরো ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হতে পারে। অন্যদিকে, কম নজরদারির এলাকায় অপরাধের তথ্য কম সংগ্রহ হওয়ায় সেখানকার প্রকৃত পরিস্থিতি পূর্বাভাসে যথাযথভাবে প্রতিফলিত নাও হতে পারে। এভাবে বৈষম্য তৈরির একটি চক্র গড়ে উঠতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্টিন ক্যাম্পাসের সমাজবিজ্ঞানী সারাহ ব্রেইন লস অ্যাঞ্জেলেস পুলিশ বিভাগের তথ্য ব্যবহার নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁর গবেষণায় দেখা গেছে, প্রকাশ্য স্থানে সংঘটিত অপরাধ বেশি নথিভুক্ত হতো এবং কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যুষিত এলাকাগুলোর ওপর পুলিশের নজরদারি তুলনামূলক বেশি ছিল। এসব পক্ষপাতদুষ্ট তথ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রশিক্ষণে ব্যবহার করা হলে প্রযুক্তির পূর্বাভাস নিরপেক্ষ বলে মনে হলেও তা বৈষম্য বাড়াতে পারে।
নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরাও সতর্ক করেছেন, দুর্নীতি, পক্ষপাত কিংবা বেআইনি পুলিশি চর্চার কারণে ত্রুটিপূর্ণ হয়ে পড়া তথ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হতে পারে। ফলে প্রযুক্তি ভুল বা বৈষম্যমূলক আচরণকে স্বাভাবিক প্রবণতা হিসেবে গ্রহণ করতে পারে।
তবে এ বিষয়ে ভিন্ন সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেছেন বিশেষজ্ঞরা। লন্ডনের কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. দিমিত্রিওস কোলিয়াস মনে করেন, উন্নত প্রযুক্তি ঐতিহাসিক তথ্যের পক্ষপাত বিবেচনায় নিতে পারে। তাঁর মতে, সতর্কতার সঙ্গে তৈরি এবং স্বাধীনভাবে মূল্যায়িত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবস্থা বৈষম্য শনাক্ত ও কমাতেও সহায়তা করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পুলিশি কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য করতে হলে তথ্যের মান ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি।
একই সঙ্গে প্রযুক্তির সিদ্ধান্ত যাচাই, ভুল শনাক্ত এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তা সংশোধনের জন্য মানুষের কার্যকর সম্পৃক্ততা থাকতে হবে। কারণ, প্রযুক্তি যে তথ্য থেকে শেখে, সেই তথ্যের মধ্যেই মানুষের সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক পক্ষপাত থাকতে পারে। সূত্র: বিবিসি
সানা/ডিসি/আপ্র/২৬/১০/২০২৬