বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রণ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ফিফার সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে এবার প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানাল তিন মহাদেশীয় ফুটবল কনফেডারেশন।
এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি), ইউরোপীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (উয়েফা) ও কনকাকাফের (উত্তর, মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় ফুটবল সংস্থা ) শীর্ষ নেতৃত্ব যৌথ খোলা চিঠিতে ফিফার নেতৃত্বের ‘বিচারবোধের ব্যর্থতা’ ও ‘আস্থার গুরুতর লঙ্ঘন’ নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছে।
বিশেষ করে বিশ্বকাপের অংশীদারত্ব বিক্রির প্রস্তাব, সদস্যদের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা না করা এবং অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনা ফিফার নিজের হাতেই রাখার সিদ্ধান্তকে ঘিরেই তীব্র আপত্তি জানিয়েছে তারা।
চিঠিতে বলা হয়েছে, গত এক দশকে ফুটবলের যে অগ্রগতি হয়েছে, সেটি কোনো একক ব্যক্তির কৃতিত্ব নয়; বরং ফিফা, কনফেডারেশন, সদস্য অ্যাসোসিয়েশন এবং ফুটবলের সঙ্গে যুক্ত হাজারো মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল।
তাই ফুটবল কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়-এটি খেলোয়াড়, সমর্থক, ক্লাব, সদস্য অ্যাসোসিয়েশন এবং পুরো ফুটবল পরিবারের।
তিন কনফেডারেশন স্পষ্ট করেছে, তাদের আপত্তি অর্থ বা বিশ্বকাপের সম্প্রসারণ নিয়ে নয়।
বরং ফিফার বিপুল সঞ্চিত অর্থ সদস্য অ্যাসোসিয়েশনগুলোর উন্নয়নে দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছে তারা। একই সঙ্গে বিশ্বকাপের ২০৩০ ও ২০৩৪ আসর আয়োজন, টুর্নামেন্ট সম্প্রসারণ এবং বিভিন্ন সম্পদ বণ্টনের মতো সম্মিলিত সিদ্ধান্তগুলো বহাল রাখার কথাও জানিয়েছে।
তবে চিঠির সবচেয়ে কঠোর অংশটি এসেছে নেতৃত্ব ও সুশাসন নিয়ে। সেখানে বলা হয়েছে, ফুটবলের নেতৃত্ব কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পদ নয়; এটি ফুটবল পরিবারের দেওয়া একটি সেবার দায়িত্ব।
আস্থা ভেঙে গেলে এবং কোনো ব্যক্তি তাকে দেওয়া ক্ষমতার ঊর্ধ্বে নিজেকে স্থান দিলে সেই দায়িত্ব পরিত্যক্ত হয়।
ফিফার সাম্প্রতিক চিঠিতে বিশ্বকাপের অংশীদারত্ব বিক্রির প্রস্তাব ঘিরে ‘যোগাযোগের ব্যর্থতা’ স্বীকার করা হলেও এএফসি, উয়েফা ও কনকাকাফ মনে করছে; এটি কেবল যোগাযোগের সমস্যা নয়, বরং ‘বিচারবোধের ব্যর্থতা’।
তাদের অভিযোগ, যথাযথ পরামর্শ ছাড়াই দ্রুত সময়সীমার মধ্যে প্রস্তাবটি এগিয়ে নেওয়া হয়েছিল, যাতে সদস্য অ্যাসোসিয়েশনগুলো বিস্তারিতভাবে বিষয়টি পর্যালোচনা করার সুযোগ না পায়। বিশ্বকাপের স্বত্ব বা অংশীদারত্ব বিক্রির ধারণাকেও তিন কনফেডারেশন মৌলিকভাবে ভুল বলে অভিহিত করেছে।
তাদের মতে, এটি শুধু প্রক্রিয়াগত ভুল নয়, বরং ফিফা যে প্রতিষ্ঠানগুলোর সেবা করার জন্য বিদ্যমান, তাদের সঙ্গেই আস্থার গুরুতর লঙ্ঘন।
ঘটনার তদন্ত নিয়েও আপত্তি তুলেছে তারা। ফিফা কাউন্সিলের কাছে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দেওয়ার যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেটিকে যথেষ্ট মনে করছে না তিন কনফেডারেশন।
তাদের দাবি, এমন গুরুতর ঘটনার তদন্ত অবশ্যই সম্পূর্ণ স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে হতে হবে। ফিফার প্রশাসন, কর্মী কিংবা ফুটবলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষ এই পর্যালোচনায় ভূমিকা রাখতে পারবে না বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
মরক্কোয় অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক এক বৈঠক নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে তারা। চিঠি অনুযায়ী, ওই বৈঠকে নির্বাচিত মাত্র একজন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন; কোনো ফিফা কাউন্সিল সদস্য বা সদস্য অ্যাসোসিয়েশনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।
বরং ফিফার ব্যবস্থাপনা কমিটিরও পুরো কমিটি নয়, নির্বাচিত কয়েকজন সদস্যকে বিদেশে ডেকে নেওয়া হয়েছিল।
চিঠির শেষাংশে তিন কনফেডারেশন বলেছে, ফুটবলের শক্তি সবসময় তার ঐক্যে। তাই এমন নেতৃত্ব প্রয়োজন, যারা ফুটবলের সেবা করবে, ফুটবলের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করবে না।
যৌথ চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন এএফসি সভাপতি সালমান বিন ইব্রাহিম আল খলিফা, কনকাকাফ সভাপতি ভিক্টর মন্তাগলিয়ানি, উয়েফা সভাপতি আলেকসান্দার চেফেরিন এবং তিন কনফেডারেশনের মহাসচিবরা।
ডিসি/আপ্র/১০/০৮/২০২৬