বিশ্বকাপের মঞ্চে রূপকথার প্রথম অধ্যায় লিখতে নেমেছিল কুরাসাও। কিন্তু ফুটবলের মহাশক্তি জার্মানির সামনে সেই স্বপ্ন বেশিক্ষণ টেকেনি। ইতিহাসের ক্ষুদ্রতম জনসংখ্যার দেশ হিসেবে বিশ্বকাপে অভিষেক হওয়া ক্যারিবীয় দ্বীপটি একবার জার্মান দুর্গে আঘাত হেনেছিল ঠিকই, কিন্তু এরপর যেন খুলে যায় গোলের বন্যার দুয়ার। সাত গোলের ঝড়ে কুরাসাওকে উড়িয়ে দিয়ে দুর্দান্ত জয়েই বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করেছে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি।
হিউস্টনে রোববার (১৪ জুন) ‘ই’ গ্রুপের ম্যাচে কুরাসাওকে ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত করে ইউলিয়ান নাগেলসমানের দল। ২০১৪ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ব্রাজিলকে ৭-১ গোলে হারানোর পর বিশ্বকাপে এটিই জার্মানির প্রথম সাত গোলের ম্যাচ।
শুরু থেকেই প্রতিপক্ষের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে জার্মানি। ম্যাচের ষষ্ঠ মিনিটে ফ্লোরিয়ান ভির্টজের সঙ্গে দারুণ বোঝাপড়ায় গোল করে দলকে এগিয়ে দেন ফেলিক্স এনমেচা। বিশ্বকাপ অভিষেকেই গোলের দেখা পান এই মিডফিল্ডার।
কিন্তু বিশ্বকাপের সৌন্দর্যই হলো অপ্রত্যাশিত মুহূর্তের জন্ম দেওয়া। ২১তম মিনিটে সেই বিস্ময়ের জন্ম দেয় কুরাসাও। ইয়ুর্গেন লোকাডিয়ার শট প্রতিহত হওয়ার পর ফিরে আসা বলে বাঁ পায়ের জোরালো শটে জাল খুঁজে নেন লিভানো কোমেনেনসিয়া। বিশ্বকাপে নিজেদের ইতিহাসের প্রথম গোল পেয়ে উচ্ছ্বাসে ভাসে কুরাসাও, আর মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায় জার্মান শিবির।
তবে সেই গোল যেন ঘুমন্ত দৈত্যকে জাগিয়ে তোলে।
৩৮তম মিনিটে নাথানিয়েল ব্রাউনের কর্নার থেকে হেডে গোল করে জার্মানিকে আবার এগিয়ে দেন নিকো শ্লটারবেক। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে ফেলিক্স এনমেচার ওপর ফাউল থেকে পাওয়া পেনাল্টি কাজে লাগিয়ে ব্যবধান বাড়ান কাই হাভার্টজ।
বিরতির পর মাঠে নামে আরও ক্ষুধার্ত এক জার্মানি। ৪৭তম মিনিটে জশুয়া কিমিখের নিখুঁত পাস থেকে গোল করেন জামাল মুসিয়ালা। বিশ্বকাপে এটিই ছিল তার প্রথম গোল।
এরপর কুরাসাওয়ের রক্ষণে একের পর এক আঘাত হানতে থাকে জার্মান আক্রমণভাগ। ৬৮তম মিনিটে ডেনিজ উনদাভের ফ্লিক থেকে গোল করেন নাথানিয়েল ব্রাউন। বিশ্বকাপ অভিষেকে গোল ও সহায়তা—দুই কীর্তিই গড়েন ২২ বছর বয়সী এই ডিফেন্ডার।
৭৮তম মিনিটে বদলি হিসেবে নেমে নিজের নামও স্কোরশিটে তোলেন উনদাভ। আর নির্ধারিত সময়ের দুই মিনিট আগে উনদাভের বাড়ানো বল ধরে নিজের দ্বিতীয় গোল করেন হাভার্টজ। তার গোলেই পূর্ণতা পায় জার্মানির সাত গোলের মহোৎসব।
ম্যাচে প্রায় ৬৫ শতাংশ সময় বলের নিয়ন্ত্রণ ছিল জার্মানদের দখলে। তারা ২৬টি শট নেয়, যার ১২টি ছিল লক্ষ্যে। বিপরীতে কুরাসাওয়ের ৮টি শটের মাত্র দুটি ছিল লক্ষ্যে, যার একটি জড়িয়ে যায় জালে।
এদিন আরেকটি ইতিহাসও গড়েন মানুয়েল নয়্যার। ৪০ বছর বয়সে তিনি জার্মানির হয়ে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি বয়সী ফুটবলার হিসেবে মাঠে নামেন।
হাভার্টজের দ্বিতীয় গোলটি জার্মানিকে এনে দেয় আরেকটি অনন্য অর্জন। বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বাধিক গোল করা দলের আসনে উঠে বসে তারা। বিশ্বকাপে জার্মানির মোট গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ২৩৯, এক গোল কম নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে নেমে যায় ব্রাজিল।
টানা দুই বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেওয়া জার্মানির জন্য এটি শুধু একটি জয় নয়, বরং প্রত্যাবর্তনের এক জোরালো ঘোষণা। আর কুরাসাও, সাত গোল হজম করেও বিশ্বকাপের প্রথম গোলের স্মৃতি বুকে নিয়ে রেখে গেল নিজের রূপকথার প্রথম পৃষ্ঠা।
সানা/আপ্র/১৫/৬/২০২৬