যে জার্সি পরে কেঁদেছেন, হেসেছেন, হেরেছেন—শেষ পর্যন্ত সেই জার্সিতেই লিখেছেন অমর এক গল্প
একদিন তিনি ছিলেন কেবল এক স্বপ্নবাজ বালক। পায়ের কাছে বল এলেই যার চোখে জ্বলে উঠত অন্য এক পৃথিবী। আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা জার্সি গায়ে একদিন বিশ্ব জয় করবেন—হয়তো সেই স্বপ্নটিও ছিল। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথ যে এত দীর্ঘ, এত কণ্টকাকীর্ণ, এত অশ্রুসিক্ত হবে—তা কে জানত!
সেই পথের শেষ এসে গেল।
লিওনেল মেসি ঘোষণা দিয়েছেন, আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে আর খেলবেন না। ৩৯ বছরের এই কিংবদন্তির আন্তর্জাতিক অধ্যায়ের শেষ দৃশ্য হয়ে রইল গত জুলাইয়ের বিশ্বকাপ ফাইনাল। স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে সেদিন আর্জেন্টিনার হাতে ওঠেনি বিশ্বকাপ। কিন্তু মেসির জন্য সেই হারই যেন তাঁর দুই দশকের আন্তর্জাতিক মহাকাব্যের শেষ পৃষ্ঠা হয়ে থাকল।
কী অদ্ভুত নিয়তি! যে মানুষটি আর্জেন্টিনাকে ৩৬ বছরের অপেক্ষা শেষে বিশ্বকাপ এনে দিয়েছিলেন, তাঁর শেষ বিশ্বকাপও শেষ হলো পরাজয়ের বেদনায়। তবু তাঁর বিদায়ে পরাজয়ের চেয়ে অনেক বড় হয়ে থাকল অর্জনের আলো।
সোমবার (৩১ আগস্ট) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাতে লেখা একটি চিঠির ছবি প্রকাশ করে অবসরের ঘোষণা দেন মেসি। সেখানে জানালেন, বিশ্বকাপ ফাইনালের দুই দিন পর, ২১ জুলাই তিনি নিজের সিদ্ধান্তের কথাগুলো লিখে রেখেছিলেন। পরে ৮ আগস্ট বাবা হোর্হে মেসির মৃত্যুর পর সেই সিদ্ধান্তে আরো দৃঢ় হন তিনি।
একটি জীবন, একটি ফুটবল, একটি জার্সি—আর তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অগণিত স্মৃতি।
২০০৫ সালে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে অভিষেক। তারপর একে একে কেটে গেছে ২১ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে মেসি শুধু গোল করেননি, শুধু রেকর্ড গড়েননি; তিনি আর্জেন্টিনার ফুটবল-স্বপ্নের সবচেয়ে বড় মুখ হয়ে উঠেছেন। আবার সেই স্বপ্নের সবচেয়ে বড় হতাশারও সাক্ষী হয়েছেন।
একসময় তাঁকেই বলা হতো ব্যর্থ।
অবিশ্বাস্য শোনালেও সত্যি—আর্জেন্টিনার জার্সিতে গোলের পর গোল করেও একটা সময় মেসিকে শুনতে হয়েছে, ‘জাতীয় দলের হয়ে তুমি কী জিতেছ?’ শৈশবে স্পেনে চলে যাওয়ার কারণে তাঁর দেশপ্রেম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বার্সেলোনার জার্সিতে তিনি যতটা স্বচ্ছন্দ, আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা জার্সিতে নাকি ততটা নন—এমন কথাও শুনতে হয়েছে তাঁকে।
তারপর এল ২০১৪।
ব্রাজিলের মারাকানা। বিশ্বকাপের ফাইনাল। এক পাশে মেসি, অন্য পাশে জার্মানি। স্বপ্নের ট্রফি তখন হাতছানি দিচ্ছে। কিন্তু অতিরিক্ত সময়ে মারিও গোটশের গোলে স্বপ্ন ভেঙে গেল। মেসির চোখে তখন হতাশা, আর আর্জেন্টিনার কোটি মানুষের মনে আরো একটি অপূর্ণতার গল্প।
এরপর ২০১৫ ও ২০১৬—পরপর দুই কোপা আমেরিকার ফাইনাল। দুবারই হার।
২০১৬ সালে চিলির কাছে ফাইনালে হারের পর যেন আর পারলেন না মেসি। ৩০ বছর বয়সও তখন ছোঁয়া হয়নি। অভিমানে ঘোষণা দিলেন আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের। মনে হয়েছিল, আর্জেন্টিনার জার্সি হয়তো সত্যিই তাঁকে আর দেখা যাবে না।
কিন্তু মহাকাব্যের নায়করা কি এত সহজে গল্প শেষ করেন?
ফিরে এলেন মেসি।
আর তারপর বদলে গেল সবকিছু।
২০২১ সালে ব্রাজিলের মাটিতে কোপা আমেরিকার ফাইনাল। প্রতিপক্ষ ব্রাজিল। মেসির হাতে উঠল প্রথম বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা। দীর্ঘ অপেক্ষার পর আর্জেন্টিনার জার্সিতে এল সেই কাঙ্ক্ষিত ট্রফি।
তারপর ২০২২।
কাতারের রাত। ফ্রান্সের বিপক্ষে বিশ্বকাপ ফাইনাল। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম রোমাঞ্চকর ম্যাচ। মেসির স্বপ্ন তখন আর শুধু তাঁর নিজের নয়—একটি জাতির স্বপ্ন। টাইব্রেকারে ফ্রান্সকে হারিয়ে আর্জেন্টিনা জিতে নিলো বিশ্বকাপ। ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান। মেসির মাথায় উঠল সেই মুকুট, যেটির জন্য তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে দীর্ঘ অপেক্ষা।
যে প্রশ্নটি তাঁকে বছরের পর বছর তাড়া করেছিল, তার উত্তর তখন ট্রফির ভেতরেই লেখা।
‘মেসি জাতীয় দলের হয়ে কী জিতেছে?’
উত্তর—বিশ্বকাপ।
এর আগে-পরে এসেছে ফিনালিসিমা ও আরেকটি কোপা আমেরিকার শিরোপাও। ২০২১ থেকে ২০২৪—চার বছরের মধ্যে জাতীয় দলের হয়ে দুটি কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা ও বিশ্বকাপ। একসময় যে মানুষটিকে জাতীয় দলের ব্যর্থতার প্রতীক বানানো হয়েছিল, তিনিই হয়ে উঠলেন আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সবচেয়ে সফল আন্তর্জাতিক ফুটবলারদের একজন।
আর এবার ২০২৬।
শেষ বিশ্বকাপ। শেষ লড়াই। শেষবারের মতো আকাশি-সাদা জার্সি গায়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে মেসি। আর্জেন্টিনা আবারও ফাইনালে। কিন্তু এবার আর ট্রফি নয়—স্পেনের কাছে ১-০ গোলের হার।
তবু মেসির গল্প কি হার দিয়ে শেষ হয়?
না।
কারণ কিছু মানুষ ম্যাচের ফলাফলের চেয়েও বড় হয়ে যান। কিছু ফুটবলার ট্রফির সংখ্যার চেয়েও বড় হয়ে ওঠেন। মেসি তেমনই একজন।
আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল—দুটিই দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। আন্তর্জাতিক ফুটবলে গোলসংখ্যায় তাঁর ওপরে আছেন কেবল ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো। আটবারের ব্যালন দ’অরজয়ী এই ফুটবলার ছয়টি বিশ্বকাপে খেলেছেন। রেকর্ড, গোল, শিরোপা—সব মিলিয়ে তিনি এখন শুধু একজন ফুটবলার নন; ফুটবল নামের শিল্পেরই এক অনন্য অধ্যায়।
অবসরের ঘোষণায় মেসি লিখেছেন, জাতীয় দলের জন্য তাঁর দেওয়ার মতো আর কিছু নেই। সময় ফুরিয়ে আসছে, একের পর এক অধ্যায় শেষ হয়ে যাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের দুর্দান্ত খেলোয়াড়রা উঠে আসছে—তাদের জন্যও জায়গা ছেড়ে দিতে চান তিনি।
কিন্তু সত্যিই কি মেসির জন্য কোনো অধ্যায় শেষ হয়?
হয়তো খেলোয়াড় হিসেবে শেষ। মাঠে আকাশি-সাদা জার্সিতে আর দেখা যাবে না তাঁকে। গোল করার পর দুই হাত আকাশের দিকে তুলে দাঁড়াবেন না। বিশ্বকাপের মাঠে তাঁর বাঁ পায়ের জাদু দেখতে গ্যালারিতে অপেক্ষা করবে না কোটি চোখ।
তবু মেসি থাকবেন।
থাকবেন সেই শিশুটির স্বপ্নে, যে প্রথমবার ফুটবল হাতে নেয়। থাকবেন সেই তরুণের সাহসে, যে বারবার হেরে গিয়েও আবার মাঠে নামে। থাকবেন সেই সমর্থকের চোখের জলে, যে ২০১৪-এর পরাজয় দেখেছে, ২০১৬-এর কান্না দেখেছে, আবার ২০২২-এর বিশ্বজয়ও দেখেছে।
মেসি নিজেই বলেছেন, গত ২০ বছরে সমর্থকেরা যে ভালোবাসা দিয়েছেন, তা তিনি কখনো ভুলবেন না। মাঠের ভেতর থেকে তাঁদের কণ্ঠস্বর আর শুনতে না পারাটা খুব মিস করবেন। এখন থেকে বাইরে থেকেই জাতীয় দলের একজন সমর্থক হয়ে পাশে থাকবেন।
এ যেন বিদায় নয়, দূরত্বের শুরু।
কারণ মেসিকে বিদায় বলা যায়, ভুলে যাওয়া যায় না।
একদিন নতুন কোনো শিশু বল পায়ে মাঠে নামবে। তার বাঁ পায়ে হয়তো থাকবে না মেসির মতো জাদু। কিন্তু তার স্বপ্নে থাকবে মেসি। কোনো এক বিশ্বকাপের রাতে নতুন কোনো তারকা গোল করে আকাশের দিকে তাকাবে—সেই উদ্যাপনের ভেতরেও কোথাও না কোথাও থাকবে তাঁর ছায়া।
সময়ের সঙ্গে রেকর্ড ভাঙবে। নতুন নায়ক আসবে। নতুন গল্প লেখা হবে। ফুটবলও এগিয়ে যাবে নিজের নিয়মে।
কিন্তু কিছু নাম সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয় না।
লিওনেল মেসি তেমনই একটি নাম।
আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা জার্সিতে তাঁর শেষ ম্যাচটি হয়তো শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু সেই জার্সিতে তাঁর লেখা গল্পের শেষ নেই। সেই গল্প থাকবে মানুষের স্মৃতিতে, ফুটবলের ইতিহাসে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
আর কোনো এক দূর ভবিষ্যতে, ফুটবল যখন নতুন শতকের নতুন কোনো স্বপ্নে ছুটবে, তখনও কেউ না কেউ হয়তো আকাশের দিকে তাকিয়ে বলবে—
একজন ছিল।
তার নাম মেসি।
সে ফুটবল খেলত।
আর ফুটবলকে সে একসময় শিল্পে পরিণত করেছিল।
সানা/আপ্র/১/৯/২০২৬