চট্টগ্রাম ব্যুরো: গ্যাস সংকটের অজুহাতে চট্টগ্রাম মহানগরের গণপরিবহনে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। কয়েক দিন ধরে নগরের বিভিন্ন রুটে বাস, মিনিবাস, টেম্পো ও সিএনজিচালিত অটোরিকশায় নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি টাকা নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ যাত্রীদের। এ নিয়ে পথে পথে চালক ও যাত্রীদের মধ্যে প্রায়ই বাগ্বিতণ্ডা ও হাতাহাতির পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। গ্যাসের সংকট কিছুটা কমলেও বাড়তি ভাড়া কমেনি বলে অভিযোগ তাঁদের।
যাত্রীদের ভাষ্য, মহানগরের বিভিন্ন গণপরিবহনে ওঠানামার সর্বনিম্ন ভাড়া আগে ৫ টাকা নির্ধারিত থাকলেও অনেক দিন ধরেই কোথাও কোথাও ১০ টাকা নেওয়া হচ্ছিল। গ্যাস সংকট দেখা দেওয়ার পর সেই ভাড়া আরো বাড়িয়ে ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। নির্দিষ্ট দূরত্ব অতিক্রমের পরও যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে চট্টগ্রামে গ্যাসের সংকট তীব্র হয়। তখন নগরের সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যাচ্ছিল না। আগস্টের শুরুর দিকেও সংকট অব্যাহত ছিল। এ সময় সিএনজিচালিত গণপরিবহনের ভাড়া বাড়িয়ে দেন চালকেরা। বাসে ওঠানামার ভাড়া ৫ টাকার পরিবর্তে ১০ টাকা এবং গ্যাসচালিত টেম্পোতেও একইভাবে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া শুরু হয়। দূরত্ব অনুযায়ী কোথাও আরো ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, চলতি মাসের শুরুর দিকে গ্যাস সংকটের সময় চকবাজার থেকে আগ্রাবাদমুখী টেম্পোর ভাড়াও বাড়ানো হয়। সংকটের তীব্রতা কিছুটা কমলেও সেই বাড়তি ভাড়া এখনো বহাল রয়েছে।
এই রুটের যাত্রী আফিয়া আখতার বলেন, ‘গ্যাস সংকটের দোহাই দিয়ে প্রতিনিয়ত যাত্রী হয়রানি করা হচ্ছে। কৃত্রিমভাবে গাড়ির সংকট তৈরি করে বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।’
ফতেয়াবাদ থেকে নিউ মার্কেট পর্যন্ত চলাচলকারী ৩ নম্বর রুটের যাত্রী রোকেয়া বেগমের অভিযোগ, আগের নির্ধারিত ভাড়া দিতে চাইলে চালক ও সহকারীদের কাছ থেকে নানা কথা শুনতে হয়। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে বাড়তি ভাড়া দিতে হচ্ছে।
যাত্রী তৌহিদ হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘যখন গ্যাসের সংকট বেশি ছিল, তখন বাড়তি ভাড়া নেওয়ার বিষয়টি মানুষ মেনে নিয়েছে। কিন্তু এখন সংকট আগের মতো না থাকলেও ভাড়া কেন কমছে না? এর কারণ কী?’
বাড়তি ভাড়া নিয়ে প্রতিদিনই চালক, সহকারী ও যাত্রীদের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নগরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রুটে চলাচলকারী লোকাল বাস ও টেম্পোতে এমন পরিস্থিতি বেশি দেখা যাচ্ছে। যাত্রীদের অভিযোগ, গ্যাস সংকটকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে কৃত্রিমভাবে পরিবহন সংকট তৈরি করা হচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়ে বাড়তি ভাড়া দিয়েই গন্তব্যে যেতে হচ্ছে তাঁদের।
নগরের লোকাল পরিবহনে, বিশেষ করে টেম্পো চলাচলে সিন্ডিকেটের কারণেও যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একটি রুটকে দুই থেকে তিন ভাগ করে গাড়ি চালানো হয়। এতে একই পথে যাত্রীদের একাধিকবার গাড়ি পরিবর্তন করতে হয় এবং প্রতিবারই বাড়তি ভাড়া গুনতে হয়।
খোরশেদ আলম নামের এক যাত্রী বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন যাতায়াত করি। আমাদের তো বেতন বাড়েনি। পরিবার নিয়ে চলতেই কষ্ট হচ্ছে। এর মধ্যে প্রতিদিন গাড়িভাড়া বাড়তি দিতে হচ্ছে।’
শুধু বাস ও টেম্পো নয়, সিএনজিচালিত অটোরিকশাতেও বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন গন্তব্যে ৩০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে বলে যাত্রীরা জানিয়েছেন। কিছু জ্বালানি তেলচালিত যানবাহনও এ সুযোগে ভাড়া বাড়িয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বাড়তি ভাড়া আদায়ের বিষয়টি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষেরও নজরে রয়েছে। সংস্থাটি বিভিন্ন সময়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ফাহমিদা মুস্তাফা বলেন, ‘গত বুধবার (১৯ আগস্ট) থেকে আমরা বাড়তি ভাড়ার বিষয়ে অভিযানে নেমেছি। নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। সিএনজিচালিত গণপরিবহনে নিয়মিত জরিমানা করা হচ্ছে। পাশাপাশি কিছু জ্বালানি তেলচালিত গাড়িও ভাড়া বাড়িয়েছে। যাত্রীদের অভিযোগের ভিত্তিতে গণপরিবহনগুলোকে শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে। এটা চলমান প্রক্রিয়া।’
যাত্রীদের দাবি, গ্যাসের সংকটকে কেন্দ্র করে সাময়িকভাবে ভাড়া বাড়ানোর প্রয়োজন হয়ে থাকলেও সংকট কমে যাওয়ার পর তা পুনর্র্নিধারণ করা জরুরি। নির্ধারিত ভাড়া কার্যকর করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত তদারকি ও কার্যকর ব্যবস্থা চান তাঁরা।
সানা/আপ্র/১/৯/২০২৬