তিস্তা নদীর ভাঙন থেকে বসতভিটা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় কুড়িগ্রামের রাজারহাট ও উলিপুর উপজেলায় নদীর বাম তীর সংরক্ষণকাজ এগিয়ে চলেছে। পূর্ব সতর্কতামূলক এ কার্যক্রমের আওতায় নেওয়া ১৬টি প্যাকেজের মধ্যে ১৩টির কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। বাকি তিনটি প্যাকেজের কাজও শেষের পথে বলে জানিয়েছে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড।
২০২৫–২৬ অর্থবছরে নেওয়া এ প্রকল্পের আওতায় প্রায় আট কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ করা হচ্ছে। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৮৫৩ দশমিক ৪০ লাখ টাকা, অর্থাৎ প্রায় ৪৮ কোটি ৫৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, রাজারহাট ও উলিপুর উপজেলার তিস্তা নদীর ঝুঁকিপূর্ণ বিভিন্ন এলাকায় ১৬টি প্যাকেজে কাজটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। রাজারহাট উপজেলার ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের গতিয়াশাম এলাকায় ৪৭০ মিটার, বুড়িরহাট এলাকায় ৪০০ মিটার, বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের রামহরি এলাকায় ৭০০ মিটার, ডারিয়ার পাড় এলাকায় ৭০০ মিটার এবং ডাংরারহাট এলাকায় ৬০০ ও ৫১০ মিটার নদীতীর সংরক্ষণের কাজ রয়েছে।
এ ছাড়া বিদ্যানন্দ ও ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের প্রান্তের গাবুর হেলান এলাকায় ৭২০ মিটার এবং ঘড়িয়ালডাঙ্গা ও নাজিমখান ইউনিয়নের মধ্যবর্তী তৈয়ব খাঁ এলাকায় ৪০০ মিটার নদীতীর সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
উলিপুর উপজেলার ঠুটা পাইকড় এলাকায় ৪০০ মিটার, কুরপুড়া এলাকায় ৫০০ মিটার, দরিকিশোরপুর এলাকায় ২৫০ মিটার এবং বজরা এলাকায় ৩০০ মিটার নদীতীর সংরক্ষণের কাজ করা হয়েছে।
সম্প্রতি প্রকল্পের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, তিস্তার ভাঙনপ্রবণ অংশে নদীতীর সংরক্ষণকাজের দৃশ্যমান অগ্রগতি রয়েছে। এতে নদীপাড়ের মানুষের মধ্যে ভাঙনের আতঙ্ক কিছুটা কমেছে। তবে কাজের মান ও স্থায়িত্ব বজায় রাখতে নিয়মিত তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণের ওপর জোর দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
রাজারহাট উপজেলার ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের বাসিন্দা আবেদ আলী বলেন, ‘তিস্তা নদীর ভাঙনের ভয়াবহতা আমরা দীর্ঘদিন ধরে দেখে আসছি। নদীতীর সংরক্ষণের কাজ হওয়ায় এখন কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরেছে। এ কাজ ভালোভাবে টেকসই হলে নদীভাঙনের ঝুঁকি আরো কমবে বলে আশা করছি।’
উলিপুর উপজেলার বাসিন্দা আব্দুল হোসেন বলেন, ‘তিস্তা নদীর ভাঙনে প্রতিবছর মানুষকে নানা ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। নদীতীর সংরক্ষণের কাজ হওয়ায় এবার মানুষের মধ্যে আশার সৃষ্টি হয়েছে। কাজগুলো নিয়মিত তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হলে নদীভাঙন থেকে মানুষ ও বসতভিটা রক্ষা করা সম্ভব হবে।’
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্যাকেজগুলোর দায়িত্বপ্রাপ্ত উপবিভাগীয় প্রকৌশলী-৩ মো. আব্দুল কাদের বলেন, ৪ হাজার ৮৫৩ দশমিক ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে রাজারহাট ও উলিপুর উপজেলায় ১৬টি প্যাকেজে পূর্ব সতর্কতামূলক তিস্তা নদীর বাম তীর সংরক্ষণকাজ চলছে। এর মধ্যে ১৩টি প্যাকেজের কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে। বাকি তিনটির কাজও শেষের পথে। ভূমি জটিলতা, আবহাওয়া ও বৃষ্টিসহ বিভিন্ন কারণে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। দ্রুতই বাকি কাজ শেষ হবে বলে আশা করছেন তিনি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী-২ মো. মুন্না হক বলেন, জেলার নদীগুলো নিয়মিত জরিপ করা হচ্ছে। যেসব এলাকায় নদীভাঙনের ঝুঁকি রয়েছে, সেসব স্থান চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় প্রস্তাবনা করা হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে রাজারহাট ও উলিপুরে তিস্তার বাম তীর সংরক্ষণকাজ শুরু হয়েছে। ১৬টি প্যাকেজের মধ্যে ১৩টির কাজ শেষ হয়েছে এবং বাকি তিনটির কাজও শেষের পথে। নদীর পরিস্থিতির ওপর নিয়মিত নজর রাখা হচ্ছে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নবাগত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিবুল হাসান বলেন, তিনি কুড়িগ্রামে নতুন দায়িত্ব নিয়েছেন এবং পূর্বের কাজগুলোর অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত প্রতিবেদন নিচ্ছেন। নদীবর্তী জেলা হিসেবে কুড়িগ্রামে নদীভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। রাজারহাট ও উলিপুর উপজেলার তিস্তা নদীর বাম তীর সংরক্ষণকাজের ১৩টি প্যাকেজ শেষ হয়েছে। বাকি তিনটি প্যাকেজ দ্রুত শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বাকি তিনটি প্যাকেজের কাজ শেষ হলে তিস্তার ভাঙনপ্রবণ এলাকায় নদীতীর সংরক্ষণ কার্যক্রম আরো বিস্তৃত হবে। এতে নদীপাড়ের মানুষের বসতভিটা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় ঝুঁকি কমার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের ভাঙন-আতঙ্কও আরো কমবে বলে আশা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সানা/আপ্র/১/৯/২০২৬