মুফতি হাসান আরিফ
বর্তমান সময়ে তরুণ ও কিশোরদের ফ্যাশনে হাফপ্যান্ট বা খাটো পোশাকের ব্যবহার লক্ষণীয়ভাবে বেড়েছে। খেলার মাঠ, জিম, সুইমিং পুল, এমনকি রাস্তাঘাট ও ঘরোয়া আড্ডাতেও অনেককে এমন হাফপ্যান্ট পরে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়- যা হাঁটু থেকে বেশ ওপরে উঠে যায় এবং ঊরুর বড় একটি অংশ খোলা থাকে। বাহ্যিকভাবে একে কেবল সাধারণ এক ধরনের ‘ক্যাজুয়াল ফ্যাশন’ মনে হলেও একজন মুসলিমের জন্য জীবনযাপন ও চলাফেরায় ইসলামের শরিয়তের বিধান মেনে চলা আবশ্যক। এমতাবস্থায় প্রশ্ন ওঠে- হাফপ্যান্ট পরে প্রকাশ্যে বের হওয়া বা চলাফেরা করার ব্যাপারে ইসলামের নির্দেশনা কী? এটি কি শরিয়তের দৃষ্টিতে জায়েজ নাকি নিষিদ্ধ?
ইসলামে পোশাকের মূল দর্শন ও ‘সতর’-এর সীমানা: ইসলামি শরিয়তে পোশাকের প্রধান উদ্দেশ্য হলো শালীনতা রক্ষা করা এবং শরীরের আবশ্যকীয় অংশ (সতর বা আওরাত) ঢেকে রাখা। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে বলেন- ‘হে বনি আদম! আমি তোমাদের জন্য অবতীর্ণ করেছি পোশাক, যা তোমাদের লজ্জাস্থান আবৃত করে এবং সৌন্দর্যদান করে’ (সুরা আরাফ: ২৬)।
শরিয়তের পরিভাষায় মানুষের শরীরের যে অংশ অন্যের সামনে উন্মুক্ত করা বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ, তাকে ‘আওরাত’ বা ‘সতর’ বলা হয়। ইসলাম পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্যই সতর ঢেকে রাখা ফরজ করেছে।
পুরুষের সতরের সীমানা: অধিকাংশ ফকিহ ও হানাফি ফিকহের সিদ্ধান্ত মতে, একজন পুরুষকে অন্য পুরুষের সামনে বা পরনারীর সামনে নাভি থেকে হাঁটুর নিচ পর্যন্ত অংশ ঢেকে রাখা আবশ্যক।
নারীর সতরের সীমানা: পরপুরুষের সামনে মুখমণ্ডল, হাতের কবজি ও পায়ের পাতা ছাড়া পুরো শরীর ঢেকে রাখা আবশ্যক। তবে অনেক ফকিহ নারীদের মুখমণ্ডলও সতরের অন্তর্ভুক্ত বলে মত দেন।
ঊরু ও হাঁটু ঢেকে রাখা সংক্রান্ত হাদিস: পুরুষের ঊরু সতরের অন্তর্ভুক্ত কি না এবং তা খোলা রাখা যাবে কি না- এ বিষয়ে একাধিক হাদিসে স্পষ্ট নির্দেশনা এসেছে:
১. রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তুমি তোমার ঊরু উন্মুক্ত করো না এবং কোনো জীবিত বা মৃত ব্যক্তির ঊরুর দিকে দৃষ্টিপাত করো না’ (সুনানে আবু দাউদ: ৩১১৪; সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৪৬০)।
২. সাহাবি জুরহাদ (রা.)-এর ঊরু অনাবৃত দেখে রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেন- ‘হে জুরহাদ! তুমি কি জানো না যে, ঊরু হচ্ছে আওরাত (সতর)?’ (জামে তিরমিজি: ২৭৯৮; মুয়াত্তা মালিক)।
৩. অন্য বর্ণনায় এসেছে, নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত অংশকে সরাসরি ‘আওরাত’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে (সুনানে দারাকুতনি: ৯১৫)।
ইসলামবিষয়ক গবেষকদের মতে, হাঁটু ও ঊরু সতরের অংশ হওয়ায় প্রকাশ্যে তা খোলা রাখা বা অনাবৃত করে চলাফেরা করা শরিয়তে সম্পূর্ণরূপে নাজায়েজ ও হারাম।
হাফপ্যান্ট পরার শরয়ি হুকুম: হাফপ্যান্ট পরার হুকুম মূলত এর গঠন ও দৈর্ঘ্যরে ওপর নির্ভর করে। তা হলো-
নাজায়েজ ও হারাম হাফপ্যান্ট: যে হাফপ্যান্ট পরা অবস্থায় ঊরু বা হাঁটুর কোনো অংশ অনাবৃত থাকে, তা পরিধান করে অন্য মানুষের সামনে বের হওয়া বা জনসম্মুখে চলাফেরা করা শরিয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
শর্তসাপেক্ষে জায়েজ হাফপ্যান্ট: হাফপ্যান্ট বা শর্টস যদি যথেষ্ট লম্বা হয় অর্থাৎ যা নাভি থেকে শুরু করে হাঁটু ও হাঁটুর নিচের অংশ পর্যন্ত ঢেকে রাখে এবং তা যদি টাইট না হয়ে ঢিলেঢালা হয়, তাহলে তা পরিধান করা জায়েজ। বর্তমানে রাস্তাঘাটে নানা বয়সি মানুষকে ঊরু ও হাঁটু খোলা রেখে চলাচল করতে দেখা যায়। শরিয়তের দৃষ্টিতে হাঁটু খোলা রাখা এবং ঊরু প্রদর্শন করে লোকসম্মুখে ঘুরে বেড়ানো একটি প্রকাশ্য গুনাহ।
ইসলামি স্কলারদের মতে, গুনাহ যখন গোপনে না হয়ে প্রকাশ্যে জনসম্মুখে হতে থাকে, তখন সমাজ থেকে লজ্জাশীলতা হারিয়ে যায় এবং অপরাধীর ভেতর থেকেও অনুশোচনা লোপ পায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘আমার উম্মতের সবাইকে মাফ করে দেওয়া হবে, কেবল প্রকাশ্য পাপ করা ব্যক্তি ছাড়া’ (সহিহ বুখারি)।
খেলাধুলা, জিম ও সাঁতারের ক্ষেত্রে শরিয়তের ছাড় আছে কি: অনেকে মনে করেন খেলাধুলা, ব্যায়াম বা শরীরচর্চার সময় খাটো প্যান্ট পরা ছাড়প্রাপ্ত। তবে শরিয়তের নিয়ম হলো- অবস্থান যেটাই হোক, সতরের বিধান থেকে মুক্ত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। খেলাধুলা বা জিমের সময় ঢিলেঢালা ট্রাউজার, থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট বা হাঁটু অতিক্রমকারী লম্বা শর্টস পরিধান করা উচিত, যাতে শরীরের আকৃতি অতিরিক্ত ফুটে না ওঠে এবং হাঁটু ও ঊরু ঢাকা থাকে।
হাফপ্যান্ট পরে নামাজ ও অজুর বিধান-
১. নামাজ: নামাজ বিশুদ্ধ হওয়ার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো সতর আবৃত রাখা। যদি প্যান্ট এত খাটো হয় যে, ঊরু বা হাঁটু খুলে যায়, তাহলে ওই পোশাকে নামাজ আদায় হবে না; বিশেষ করে রুকু ও সিজদার সময় প্যান্ট নিচে নেমে যদি সতর অনাবৃত হয়ে পড়ে, তবে নামাজ বাতিল হয়ে যাবে। এ ছাড়া পবিত্র কোরআনে নামাজের সময় সুন্দর ও পরিপাটি পোশাক পরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে (সুরা আরাফ: ৩১)।
২. অজু: অজু করার সময়েও সতর ঢেকে রাখা উত্তম ও শালীনতার অংশ। হাদিসে একান্ত ব্যক্তিগত সময়েও অযথা নগ্ন হওয়া থেকে বিরত থাকতে এবং ফেরেশতাদের প্রতি অনুগত ও লজ্জাশীল থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে (জামে তিরমিজি: ২৮০০)। তবে কেউ যদি ঊরু উন্মুক্ত থাকা অবস্থায় হাফপ্যান্ট পরে অজু করে ফেলে, তবে তার অজু হয়ে যাবে, কিন্তু সতর খোলা রাখার কারণে কাজটি অনুচিত ও গুনাহের কারণ হবে।
পোশাক নির্বাচনের ক্ষেত্রে একজন মুসলিমের করণীয়: একজন মুসলিম পুরুষ ও নারীর পোশাক কেমন হওয়া উচিত, এর মূলনীতিগুলো নিচে উল্লেখ করা হলো-
পূর্ণ সতর আবৃত করা: পোশাককে অবশ্যই সতরের অংশ ঢেকে রাখতে হবে।
পাতলা বা অতিরিক্ত আঁটসাঁট (স্কিন টাইট) না হওয়া: পোশাক এমন আঁটসাঁট বা স্কিন টাইট হওয়া যাবে না, যাতে কাপড়ের ওপর দিয়ে সতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আকৃতি ফুটে ওঠে (দরসে তিরমিজি: ৫/৩৩২)।
অহঙ্কার প্রকাশ না পাওয়া: অহঙ্কারবশত টাখনুর নিচে প্যান্ট বা পায়জামা ঝুলিয়ে পরা এবং অপচয় বা লোকদেখানো পোশাক পরিধান করা নিষিদ্ধ (সুনানে আবু দাউদ: ২/৫৬৪)।
মোট কথা, হাফপ্যান্ট নিজে কোনো স্বতন্ত্র সমস্যা নয়; মূল বিষয় হলো শরিয়ত নির্ধারিত সতর ঢাকা থাকছে কি না। ঊরু ও হাঁটু অনাবৃত থাকে- এমন যে কোনো খাটো হাফপ্যান্ট পরে রাস্তাঘাটে বের হওয়া বা লোকসমক্ষে আসা ইসলামে স্পষ্টত নিষিদ্ধ ও নাজায়েজ।
লেখক: ইসলামি আইন বিশেষজ্ঞ
কেএমএএ/আপ্র/০২.১০.২০২৬