আগের সরকারের মতোই জনস্বার্থ, পরিবেশ ও প্রাণ-প্রকৃতিকে অগ্রাহ্য করার বিপজ্জনক প্রবণতা বর্তমান সরকারের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। গত সাত মাসে সরকারের বিভিন্ন কথাবার্তা, ভূমিকা ও কর্মকাণ্ডে এ প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘অপরিকল্পিত উন্নয়নে বিপন্ন কক্সবাজার: পরিবেশবাদীদের উদ্বেগ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। কক্সবাজারের সৈকতের বালিয়াড়িতে সড়ক নির্মাণ, মহেশখালীর সংরক্ষিত পাহাড়ি বনের ভেতর দিয়ে সড়ক নির্মাণ এবং সোনাদিয়া দ্বীপে প্যারাবন ধ্বংস করে চিংড়িঘের নির্মাণের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।
আনু মুহাম্মদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। উষ্ণতা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, বাড়ছে লবণাক্ততার বিস্তার; ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জনবসতি। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুরো উপকূলজুড়ে এমন ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, যাতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়লেও ক্ষয়ক্ষতি কম রাখা যায়। কিন্তু সুন্দরবন থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত এমন সব উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, যা উপকূলের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
কক্সবাজারের বালিয়াড়িতে সড়ক নির্মাণের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘কাণ্ডজ্ঞান বলে সমুদ্রের স্রোত ও তীব্রতার কারণে এ রাস্তা টিকবে না।’ অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে ভাঙন হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এ রাস্তাটা কিছু লোকের টাকা বানানোর প্রকল্প।’
মহেশখালীর উদাহরণ তুলে ধরে আনু মুহাম্মদ বলেন, পাহাড়ি বনের মধ্য দিয়ে রাস্তা নির্মাণের ফলে গাছপালা ও পাহাড় কাটা পড়বে এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একইভাবে সোনাদিয়া দ্বীপেও প্যারাবন ধ্বংস করে পরিবেশের ক্ষতি করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, সরকারের প্রতিনিধিরা আন্তর্জাতিক ফোরামে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় অর্থ চান এবং কিছু অর্থও পান। কিন্তু সেই অর্থ দিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি আরো বাড়বে এমন কাজ করা হচ্ছে। চকরিয়া সুন্দরবনের অস্তিত্ব এখন নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওই বনটি ছিল অঞ্চলের প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে শক্তিশালী রক্ষাকবচ।
পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘পরিবেশ মন্ত্রণালয় বলে একটা মন্ত্রণালয় আছে, সেটা টেরই পাওয়া যায় না।’ সরকারের অর্থমন্ত্রী পরিবেশ আইন রক্ষা করে উন্নয়ন করা যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন এবং কয়েক দিন আগে মীর শাহে আলম আদালতের সড়ক নির্মাণে স্থগিতাদেশে বিরক্তি প্রকাশ করেছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
আনু মুহাম্মদ বলেন, গত সাত মাসে সরকারের ভূমিকা, কর্মসূচি ও কথাবার্তায় জনস্বার্থ, পরিবেশ ও প্রাণ-প্রকৃতিকে অগ্রাহ্য করে আগের সরকারের সময়ে নেওয়া কর্মসূচি আরো জোরদার করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এ প্রবণতা থেকে সরকারকে সরে আসার আহ্বান জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে বাপার সহসভাপতি জাকির হোসেন মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। এতে কক্সবাজারের প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকায় অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে পরিবেশের ক্ষতির চিত্র তুলে ধরা হয়।
বাপার পক্ষ থেকে সুগন্ধা সৈকতের বালিয়াড়িতে চলমান সড়ক নির্মাণ অবিলম্বে বন্ধ, হাইকোর্টের মামলা নম্বর ২২৬/২০১১-এর রায় ও নির্দেশনা পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন এবং ২০২৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী অবৈধ স্থাপনা ও দখল উচ্ছেদের দাবি জানানো হয়। বালিয়াড়িতে প্রকল্প নেওয়ার আগে পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা ও বিশেষজ্ঞ মতামত বাধ্যতামূলক করার দাবিও জানানো হয়। এ ছাড়া মহেশখালীর সংরক্ষিত বনের ভেতরে সড়ক নির্মাণ বন্ধ এবং সোনাদিয়া দ্বীপের অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারে সরকারি উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
বাপার কক্সবাজার জেলার সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ কলিম বলেন, গুটিকয়েক মানুষের স্বার্থে প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকায় সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। সমুদ্রের জায়গা দখল করে প্লট বাণিজ্যের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। বালিয়াড়ি সৈকতের সুরক্ষাকবচ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি নষ্ট হলে সামুদ্রিক প্রতিবেশব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বাপার সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে দেওয়া ২০ মিনিটের ভাষণের মধ্যে ১০ মিনিট পরিবেশ ও জলবায়ু নিয়ে কথা বলেছেন। অথচ তাঁর নির্দেশ অমান্য করে পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড চলছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে মেরিন ড্রাইভের ৩ হাজার গাছ রক্ষা পেলেও বনের ভেতরে গাছ ও পাহাড় কাটার আয়োজন কীভাবে হয়, সে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাপার সভাপতি অধ্যাপক নুর মোহাম্মদ তালুকদার। তিনি বলেন, পরিবেশ রক্ষায় সরকারের যে প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তার প্রতিফলন কথা ও কাজে রাখতে হবে।
সানা/কেএমএএ/আপ্র/২৮/৯/২০২৬