(২)
(সেকেন্ড লিড)
লাইফস্টাইল ডেস্ক: সকালের কাঁচাবাজার হোক কিংবা সন্ধ্যার সুপারশপ, মাংসের কাউন্টারে সবচেয়ে বেশি ভিড় দেখা যায় ব্রয়লার মুরগির সামনে। পরিবারের মাসিক বাজারের হিসাব মেলাতে গিয়ে অনেকেই গরু বা খাসির মাংসের বদলে বেছে নেন ব্রয়লার। আবার ছাত্রাবাস, হোটেল-রেস্তোরাঁ, অফিসপাড়ার খাবারের দোকান কিংবা বাসার রান্নাঘর- সবখানেই যেন এটি এখন প্রতিদিনের খাবারের একটি পরিচিত নাম। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের মানুষ এত বেশি ব্রয়লার মুরগি খায় কেন? এর সবচেয়ে বড় কারণ হলো দাম।
দেশের অধিকাংশ পরিবারের জন্য প্রতিদিন পর্যাপ্ত প্রাণিজ প্রোটিন নিশ্চিত করা সহজ নয়। গরু বা খাসির মাংসের তুলনায় ব্রয়লার মুরগির দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় এটি মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের নাগালের মধ্যে থাকে। এক কেজি মুরগি কিনেই একটি পরিবার সহজে একাধিক বেলা রান্না করতে পারে। ফলে সংসারের বাজেট সামলে পুষ্টির চাহিদা মেটানোর একটি বাস্তবসম্মত উপায় হয়ে উঠেছে ব্রয়লার।
শুধু দামই নয়, সহজলভ্যতাও এর জনপ্রিয়তার আরেকটি কারণ। এখন দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা, উপজেলা এমনকি গ্রামীণ বাজারেও ব্রয়লার মুরগি নিয়মিত পাওয়া যায়। বছরের নির্দিষ্ট কোনো মৌসুমের অপেক্ষা করতে হয় না। চাহিদা থাকলে সরবরাহও থাকে। এই ধারাবাহিক প্রাপ্যতা ভোক্তাদের কাছে ব্রয়লারকে আরও নির্ভরযোগ্য করে তুলেছে।
সময়ের হিসাবও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। শহুরে ব্যস্ত জীবনে অনেকেই এমন খাবার চান, যা অল্প সময়ে রান্না করা যায়। ব্রয়লার মুরগির মাংস তুলনামূলক নরম হওয়ায় দ্রুত সেদ্ধ হয় এবং নানা ধরনের রান্নায় সহজে ব্যবহার করা যায়। ভুনা, ঝোল, রোস্ট, গ্রিল, বারবিকিউ, স্যুপ কিংবা বিরিয়ানি, প্রায় সব ধরনের পদেই এটি মানিয়ে যায়। কর্মজীবী মানুষ কিংবা ছোট পরিবারের কাছে এ কারণেও এটি একটি সুবিধাজনক পছন্দ।
পুষ্টির দিক থেকেও ব্রয়লার মুরগির গুরুত্ব কম নয়। পুষ্টিবিদদের মতে, মুরগির মাংস উচ্চমানের প্রোটিনের একটি ভালো উৎস। এতে শরীরের পেশি গঠন ও ক্ষয়পূরণে সহায়ক অ্যামিনো অ্যাসিড থাকে। বিশেষ করে চামড়া ছাড়া মুরগির মাংসে তুলনামূলক কম চর্বি থাকায় অনেকেই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে এটি বেছে নেন। তাই নিয়ন্ত্রিত পরিমাণে ও সঠিকভাবে রান্না করা ব্রয়লার মুরগি একটি সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে।
বাংলাদেশে ফাস্টফুড সংস্কৃতির বিস্তারও ব্রয়লারের চাহিদা বাড়িয়েছে। বার্গার, ফ্রাইড চিকেন, স্যান্ডউইচ কিংবা নানা ধরনের চিকেনভিত্তিক খাবারের মূল উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয় ব্রয়লার। বড় বড় রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে রাস্তার পাশের ছোট খাবারের দোকান পর্যন্ত এই মুরগির ওপরই অনেকাংশে নির্ভরশীল। ফলে শুধু পরিবারের রান্নাঘর নয়, বাইরে খাওয়ার অভ্যাসও এর জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছে। তবে জনপ্রিয়তার সঙ্গে কিছু বিতর্কও রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই শোনা যায়, ব্রয়লার মুরগিকে দ্রুত বড় করতে নাকি হরমোন দেওয়া হয়, কিংবা এর মাংস স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থা, খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা যায়, দ্রুত বেড়ে ওঠার প্রধান কারণ আধুনিক জাত উন্নয়ন, উন্নত খাদ্যব্যবস্থা এবং বৈজ্ঞানিক খামার ব্যবস্থাপনা। তবে যে কোনো খাবারের মতোই নিরাপদ উৎপাদন, স্বাস্থ্যসম্মত প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সঠিকভাবে রান্না করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দেন, শুধু ব্রয়লার নয়, যেকোনো মাংসই নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে কিনতে হবে। কাঁচা মাংস পরিষ্কারভাবে সংরক্ষণ করা, ভালোভাবে সিদ্ধ বা রান্না করা এবং রান্নাঘরে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা খাদ্যবাহিত রোগের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশে মানুষের খাদ্যাভ্যাস, আয়, বাজারব্যবস্থা এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্রয়লার মুরগি আজ একটি বাস্তবতার নাম। এটি শুধু কম দামের একটি মাংস নয়, বরং কোটি মানুষের দৈনন্দিন প্রোটিনের অন্যতম প্রধান উৎস। তাই গুজব বা অর্ধসত্য তথ্যের বদলে নির্ভরযোগ্য গবেষণা ও বিশেষজ্ঞের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। সচেতন ভোক্তা, নিরাপদ উৎপাদন এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস একসঙ্গে নিশ্চিত করা গেলে ব্রয়লার মুরগি ভবিষ্যতেও বাংলাদেশের মানুষের খাবারের টেবিলে গুরুত্বপূর্ণ স্থান ধরে রাখবে।
কেএমএএ/আপ্র/২০.০৭.২০২৬